ভাবেন তো, কয়েক দশকের পুরনো এক ভয়ঙ্কর শত্রুতা মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ধুলোয় মিশে গেল যখন তেহরানের এক বাঙ্কারে আছড়ে পড়ল ৩০টি শক্তিশালী বোমা।
যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না, তাদের জন্য সহজ করে বললে, ইরান হলো এমন এক দেশ যেখানে ধর্মগুরুরা দেশ চালান, আর আমেরিকা ও ইসরায়েল হলো তাদের চিরশত্রু। এই শত্রুতার মূলে ছিলেন ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গত কয়েক দশক ধরে তিনি ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার ফতোয়া দিচ্ছিলেন, আর আমেরিকা তাকে বলছিল সন্ত্রাসের গডফাদার। এই কাদা ছোড়াছুড়ি যখন চরমে, তখনই ঘটল সেই নাটকীয় ঘটনা। তেহরানের এক অতি-সুরক্ষিত বাঙ্কারে খামেনি যখন তার রণকৌশল সাজাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আকাশ থেকে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বাহিনীর প্রায় ৩০টি বাঙ্কার-বাস্টার বোমা এসে সরাসরি তার ড্রয়িংরুমে আছড়ে পড়ল। ব্যস, কয়েক দশকের প্রতিরোধের অক্ষ এক নিমেষেই ধুলোয় মিশে গেল। সাথে মারা গেলেন ইরানের প্রতাপশালী পাঁচজন জেনারেলও। একদিকে হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ের হাসি হাসছেন, অন্যদিকে ইরানের রাজপথে সাধারণ মানুষ (বিশেষ করে নারীরা) হিজাব উড়িয়ে আনন্দ করছে।কারণ তাদের কাছে এই মৃত্যুই হয়তো মুক্তির নতুন নাম।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটাও বেশ কুৎসিত। একদিকে খামেনি যেমন ধর্মের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর নিজের দেশের মানুষকে দমিয়ে রেখেছিলেন, অন্যদিকে পশ্চিমের এই ডেক্যাপিশন স্ট্রাইক (দেশের প্রধানের মাথা কেটে দেয়া) কোনো শান্তির পায়রা উড়িয়ে আনেনি। খামেনির পতনের পর এখন ইরানে শুরু হবে সিংহাসনের লড়াই। সংবিধান অনুযায়ী ৮৮ জন বৃদ্ধ ধর্মগুরু এখন বসে মাথা চুলকাচ্ছেন যে, পরবর্তী ছায়া ঈশ্বর কে হবেন? খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি কি বাবার গদিতে বসবেন? যদি বসেন, তবে সেটা হবে এক বিশাল পরিহাস। কারণ যে বিপ্লব হয়েছিল রাজতন্ত্র হঠাতে, সেই বিপ্লবই এখন বংশগত রাজতন্ত্র কায়েম করবে। এদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী অলরেডি 'অপারেশন ট্রুথফুল প্রমিজ ৪' শুরু করে দিয়েছে, যার মানে হলো এখন সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি রকেটগুলো কোনো লক্ষ্য ছাড়াই এদিক-সেদিক উড়বে।
ভবিষ্যৎটা এখন ধোঁয়াটে। একদিকে আরবে নির্বাসিত রাজপরিবারের উত্তরসূরি রেজা পাহলভী নিজেকে রাজা হিসেবে ভাবছেন, অন্যদিকে বিরোধী নেত্রী মারিয়াম রাজাভি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু সাধারণ ইরানিদের অবস্থা সেই একনায়ক গেল তো আরেক নায়ক এল টাইপের। খামেনি তার শাসনামলে ইরানকে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বানিয়ে রেখেছিলেন, আর আমেরিকা-ইসরায়েল এখন সেই দ্বীপটিকে পুরোদস্তুর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে চাইছে। যুদ্ধের এই খেলায় মাঝখান থেকে মরছে সাধারণ মানুষ আর বাড়ছে তেলের দাম। শেষমেশ দেখা যাচ্ছে, খামেনি সাহেব হয়তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন, কিন্তু তিনি পেছনে রেখে গেছেন এক ছন্নছাড়া ইরান, যেখানে গণতন্ত্র আসার চেয়ে সামরিক শাসন আসার সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি প্রবল।



পাঠকের মন্তব্য