ধরেন একদিন ঘুম থেকে উঠে আপনি আবিষ্কার করলেন, পুরো পৃথিবীতে আপনার নিজের ভাষায় কথা বলা একমাত্র জীবিত ব্যক্তি আপনিই! তখন আপনার কী মনে হবে? আপনার মৃত্যুর সাথে সাথে আপনার ভাষাটারও মৃত্যু হবে! এ অবস্থায় আপনি কী করবেন?
ঠিক এমন অবস্থাই হয়েছিল মেরি উইলকক্সের। ২৪ নভেম্বর ১৯৩৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার আদিবাসী উকচুমনি (Wukchumni) সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পুরো নাম ছিল মেরি ডেসমা উইলকক্স। বাবা মায়ের সাত সন্তানের মাঝে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোটো। তাদের সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা ছিল উকচুমনি (Wukchumni), যেটা ছিল তুলে-কাওয়াহে নামের একটি ভাষার উপভাষা। মেরি ছোটো থাকতে তার দাদীর কাছ থেকে এই ভাষা শেখেন।
বিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি এসে আমেরিকান সরকার আদিবাসীদেরও ইংরেজি ভাষায় কথা বলা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে। ফলে আস্তে আস্তে এ ধরনের উপভাষাগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। মেরিও ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেন ইংরেজিতেই। তাই তার কথ্য ভাষাও চেঞ্জ হয়ে যায় আস্তে আস্তে।
উকচুমনি ভাষাটি বহু পুরোনো হলেও এর কোনো লিখিত রুপ ছিল না। কথ্যভাষা হিসেবেই এটি প্রচিলত ছিল। একটা সময়ের পর মেরি বুঝতে পারেন পুরোপুরি উকচুমনি ভাষায় কথা বলা, এই ভাষা জানা একমাত্র জীবিত ব্যক্তি তিনিই আছেন। কারণ একসময় জোর করে চাপানো ইংরেজিতেই তিনি আর তার পরবর্তী প্রজন্ম সবাই কথা বলেন। সেসময় তার বয়স ষাটের ঘরে। মৃত্যুচিন্তাও ঢুকেছে মনে। তিনি চিন্তা করলেন আমার মৃত্যুর সাথে সাথে আমার ভাষাটারও মৃত্যু হবে। নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসা কার না থাকে? মেরিরও ছিল। তাই তিনি ঠিক করলেন তার নিজের ভাষাকে কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।
১৯৯০ এর শেষ অথবা ২০০০ এর শুরুর দিকে মেরি তার ভাষার শব্দগুলো লিখে রাখতে শুরু করেন। কখনও ছোটো ছোটো চিরকুটে, কখনও খামে লিখে এই ভাষার শব্দগুলো একত্রিত করতে থাকেন। তার নিজের স্মৃতিই ছিল এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্বল।
কোনো প্রফেশনাল ভাষাবিজ্ঞানের শিক্ষা নেই, অন্য কোনো মানুষও নেই যে এই ভাষা জানে, অথবা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যে সহায়তা করবে... তারপরও মেরি থেমে থাকেননি। সত্তর বছর বয়সে তিনি লিখে ফেলেন উকচুমনি ভাষার কয়েক হাজার শব্দ, ব্যাকরণ, উচ্চারণ। নিজে হাতে লিখে ফেলেন উকচুমনি ইংলিশ ডিকশনারি। এছাড়াও করেছেন শব্দ ও ভাষার রেকর্ড। শুধু শব্দ বা বাক্য নয়, বরং তাদের প্রচলিত স্থানীয় রুপকথা, গল্প এগুলোও রেকর্ড করেন তিনি।
কম্পিউটারের যুগ আসার সাথে সাথে মেরি নিজে নিজেই কম্পিউটার চালানো শেখেন। এটি তার ভাষাকে লিপিবদ্ধ করার কাজে আরেকটু সহযোগিতা করে। তার মেয়ে জেনিফার মালোন একজন ভাষাবিদ। তার সাহায্যে এই কাজ আরও একটু এগিয়ে যায়।
তবে সহজ ছিল না এই ভাষা রক্ষা করা। হাজার হাজার শব্দ কম্পিউটারে তোলা, রেকর্ড করা। দৃষ্টিশক্তিও কমে গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে রেকর্ড করা; অত্যন্ত পরিশ্রমের আর সময়সাপেক্ষ। তবুও থামেওনি মেরি, কাঁপা কাঁপা হাতে টাইপ করেন। ২০১০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় উকচুমনি ভাষার ডিকশনারি। ৬০০ পৃষ্ঠারও বেশি এই ডিকশনারি ছিল উকচুমনি ভাষার প্রথম লিখিত দলিল।
এরপরই আর থেমে থাকেননি মেরি। উকচুমনি ভাষা প্রথমে পরিবার এবং পরে আশেপাশের কমিউনিটিতে শেখাতে শুরু করেন। ৮০ বছর বয়সেও নিয়মিত ক্লাস নিতেন, সকলকে হাতে ধরে শেখাতেন তার ভাষা। আস্তে আস্তে উকচুমনি ভাষা শেখার মানুষ বাড়ে। বর্তমানে কয়েকজন মানুষ আছে যারা উকচুমনি ভাষায় পুরোপুরি কথা বলতে পারেন। ২০১৪ সালে তার কাজ ও উকচুমনি ভাষা নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি ছড়িয়ে পড়লে মেরির ঘটনা মিডিয়াতেও আসে। ফলে এই ভাষা শেখার ক্ষেত্রে আগ্রহ তৈরী হয় মানুষের।
মেরি ২০২১ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার সাথে তার ভাষা হারিয়ে যায়নি। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজে হাতে তিনি তার ভাষাকে সংরক্ষণ করেছেন আর রেখে গিয়েছেন তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। কোনো উচ্চশিক্ষা না থাকার পরও শুধু দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দিয়ে একটি ভাষার কাণ্ডারী হয়ে উঠেছিলেন মেরি।
ভাষার এই মাসে এই ভাষার যোদ্ধাকেও আমরা শ্রদ্ধা জানাই। বিশ্বে প্রতি কয়েক সপ্তাহে একটি করে ভাষা হারিয়ে যায় আর ভাষা হারানো মানে শুধু শব্দ হারানো না, হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতিও। শুধুমাত্র মেরির জন্যই উকচুমনি ভাষা এই বিলুপ্তদের লিস্টে পড়েনি। যতদিন পৃথিবীর মানুষ জানবে উকচুমনি ভাষার কথা ততদিন মেরিকে তাদের শ্রদ্ধা জানাতেই হবে।
মেরি উইলকক্সের ডকুমেন্টারিটি গ্লোবাল ওয়াননেস প্রোজেক্টের অফিসিয়াল সাইটে দেখা যাবে।
তথ্যসূত্র: গ্লোবাল ওয়য়াননেস প্রোজেক্ট: মেরিস ডিকশনারি, ইউনেস্কো অ্যাটলাস, দ্য নিউইউর্ক টাইমস



পাঠকের মন্তব্য