পুরো সোশ্যাল মিডিয়া বর্তমানে দখল করে নিয়েছে জেফরি এপস্টেইন ফাইলস। বিশ্বের বাঘা বাঘা নেতাদের নাম উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত এই নথিপত্রে। মূলত মাইনর সেক্স ট্রাফিকিং-এর সাথে জড়িত বিকৃত রুচির এই জেফরি এপস্টেইন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য আয়োজন করত পার্টি, যেখানে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও বিকৃত যৌনাচার করা হতো। এগুলো ভিডিও ও ছবি গোপনে ধারণ করে পরবর্তীতে এসব ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করার কথাও উঠে এসেছে।
কে ছিল জেফরি এপস্টেইন?
সবার প্রথমে এই প্রশ্ন আমাদের মাথায় আসবেই। জেফরি এপস্টেইন ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহন করেন। কনি আইল্যান্ডে তার বেড়ে ওঠা। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালে ডালটন স্কুলে ক্যালকুলাস ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকতা করছিলেন। ডালটন স্কুলে পড়ানোর সময় এক ছাত্রের ওয়ালস্ট্রিটে কাজ করা অভিভাবক এপস্টেইনের মেধায় মুগ্ধ হন। তিনি তাকে স্কুল ছেড়ে ওয়ালস্ট্রিটে আসার পরামর্শ দেন এবং বিয়ার স্টিয়ার্নসের সিনিয়র অংশীদার এইস গ্রিনবার্গের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। ১৯৭৬ সালে এপস্টেইন শিক্ষকতা ছেড়ে বিয়ার স্টিয়ার্নসে জুনিয়র ট্রেডার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখান থেকেই তার আর্থিক ক্যারিয়ারের উত্থান শুরু হয়।
এপস্টেইনের অন্ধকার জগৎ
এপস্টেইন নিজেকে দাবী করত বিলিয়নিয়ারদের অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ের আর্কিটেকচার। বিল ক্লিনটনের সাথে পরিচয় হলে তার খ্যাতি ছড়িয়ে যায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাঝে। আস্তে আস্তে পরিচয় হতে থাকে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ইলন মাস্ক, স্টিফেন হকিং, মাইকেল জ্যাকসন এরকম নাম করা সব ব্যক্তি, মডেল, তারকা, গায়ক এবং সব ক্ষেত্রের ধনী ব্যক্তিদের সাথে।
করের কাজ করার সুবিধার জন্য ১৯৯৬ সাল থেকে এপস্টেইন সেন্ট টমাস দ্বীপ থেকে তার ব্যবসা চালাতেন। এক সময় এই দ্বীপের কাছের কাছের লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপ কিনে সেখানে ‘জেফরি এপস্টেইন সিক্স ফাউন্ডেশন’-এর কার্যক্রম পরিচালনা করা শুরু করেন। এই ফাউন্ডেশন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে ৬.৫ মিলিয়ন ডলার অনুদানও দিয়েছিল।
এসব সোশ্যাল ফাউন্ডেশনের পেছনে এপস্টেইন গড়ে তোলে এক বিশাল সাম্রাজ্য। তার আইল্যান্ডে গড়ে তোলে বিশাল ম্যানশন আর আমোদ-প্রমোদের নানা আয়োজন। নারীসঙ্গ তার বিশেষ প্রিয়—বিশেষত ১৮ বছরের কম বয়সীদের সঙ্গ। এই কথাগুলো সবাই জানত, কিন্তু এপস্টেইন সকলের সাথে এই কানেকশনের জেরে অভিযোগগুলো থেকে পালিয়ে যেতে থাকে। আর এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্যও আয়োজন হতে থাকে নানা ‘ওয়াইল্ড পার্টি’ যেখানে চক্ত মাইনরদের সাথে নানা বিকৃত যৌনাচরণ, রেপসহ নানারকম অনৈতিক, মস্তিষ্কবিকৃত কর্মকাণ্ড। এপস্টেইনের এই ম্যানশনে এবং আয়োজিত পার্টিগুলোতে লুকানো ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও ও গোপন ছবি তোলারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে কোনো কাজ চরিতার্থ করার জন্য এসকল প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ব্যাকমেইল করারও অভিযোগ উঠেছে।
এপস্টেইন যে শুধু আমেরিকার মেয়েদের নিয়ে যেত এমন না, বরং বিশ্বের নানা দেশের প্রভাবশালীদের সাথে সুসম্পর্ক করে আন্তর্জাতিক শিশু পাচারের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
কীভাবে জানল সবাই?
এত বড় বড় শক্তিশালী মানুষদের সাথে বেলায় বেলায় যার ওঠাবসা তার এসব তথ্য যে চাইলেই কেউ ফাঁস করে দেবে—এমন নয় ব্যপারটা তা সবাই বুঝতে পারছে। ২০০০ সালের শুরুর দিক থেকে এপস্টেইনের এইসব কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ উঠতে শুরু করে যে সে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরকে লোভ দেখিয়ে যৌনকর্মে বাধ্য করত। দরিদ্র ও অসহায় কিশোরীদের শরীর ম্যাসাজ বা মডেলিংয়ের সুযোগ ইত্যাদির লোভ দেখিয়ে তার দ্বীপে কিংবা ম্যানহাটনের বাড়িতে নিত। এরপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো।
তবে সে সংশ্লিষ্ট তরুণীদের ৩০০ থেকে ১,০০০ ডলার পর্যন্ত দিত। তদন্তে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকেও অল্পবয়সী মেয়েদের আনা হতো আর তাদের আরও মেয়েকে যুক্ত করতে বলা হতো। প্রসিকিউটররা একে একটি ‘সেক্সুয়াল পিরামিড স্কিম’ হিসেবে বর্ণনা করেন। অভিযোগ আছে, কেউ মুখ খুলতে চাইলে প্রভাবশালী আইনজীবী ও বেসরকারি গোয়েন্দাদের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো।
২০০৫ সালে ফ্লোরিডা পুলিশে একজন মা অভিযোগ করেন তার অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে একজন মধ্যবয়সী লোক ম্যাসাজের নাম করে বাড়িতে নিয়ে যৌন হয়রানি করেছে। এসময়ই প্রথম এপস্টেইনের বিরুদ্ধে প্রথম কেস ফাইল হয়। এই মেয়েটির জবানবন্দিতে আরও দুটি মেয়ের নাম জানা যায়। তারাও ছিল আশেপাশের স্কুলের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে। তাদেরকে ইনভেস্টিট করলে আরও দুইজনের নাম পাওয়া যায়। এভাবে পুলিশ আবিষ্কার করে যে পুরো এলাকা জুড়ে প্রচুর এরকম অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরকে যৌন হয়রানি করছে এপস্টেইন। এই কেস পরে FBI এর হাতে চলে যায় এবং মামলা হয়। অপরদিকে এপস্টেইনের আইনজীবি মায়ামির তখনকার অ্যাটর্নি আলেকজান্ডার অ্যাকোস্তার সাথে চুক্তি করেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে হাত থাকায় সে যাত্রায় বলতে গেলে কিছুই হয় না এপস্টেইনের। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার এই মামলায় এপস্টেইন দোষ স্বীকার করলেও অবিশ্বাস্যভাবে হালকা সাজা পান। মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড ছিল। তাও ভিআইপি সেলে ছিল তার বাস। ১২ ঘণ্টার জন্য সে যেত তার অফিসে কাজ করতে। সোজা কোথায় শুধু রাতে ঘুমাতে যেত সেলে। আবার এই সাজা পুরো হওয়ারও আগেই, মাত্র ১৩ মাস পরেই সে জেলের বাইরে বের হয়ে যায়।
তবে এসব দেখে চুপ থাকোতে পারেননি মায়ামি হেরাল্ডের সাংবাদিক জুলি ব্রাউন। তিনি এপস্টেইনের কেস ফাইল নিয়ে ঘাঁটাতে থাকেন। ভিকটিমদের সাক্ষাতকার নেন এবং আরও ৮০ জন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ও প্রমাণ পান। এফবিআইও ৪০ জনের প্রমাণ পেয়েছিল।
ফলে ২০১৯ সালে আবার কেস ফাইল হয়। তবে এবার বেশ শক্তপোক্ত কেস হয়, যেখান থেকে এপস্টেইনের বেরিয়ে আসা শক্ত হয়ে পড়ে। বিশ্বের সব প্রভাবশালী মানুশজন যারা একবার হলেও তার সাথে যোগাযোগ করেছেন সবাই নড়েচড়ে বসে। আশঙ্কা শুরু হয় এই নিয়ে শুনানি শুরু হলে পুরো বিশ্বে তোলপাড় হয়ে যাবে। কিন্তু ১০ আগস্ট, ২০১৯ সালে এপস্টেইনকে তার সেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারি ভাষ্য ছিল, আত্মহত্যা। কিন্তু সিসিটিভি সময়মতো নষ্ট হয়ে যাওইয়া, গার্ডদের নানা গাফিলতি এই মৃত্যুকে প্রশ্ন তোলে।
নথি প্রকাশ হলো কীভাবে?
এপস্টেইনের এই মামলা, গ্রেফতারের পর ভিক্টিমরা এগিয়ে আসতে থাকে। তারা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে নানা প্রমাণ দিতে থাকে। রাস্তায় আন্দোলনে নামে যেন এপস্টেইনের এই গোনপন ক্যামেরায় ধারণ করা এসব ভিডিও, ছবি, অ্যালবাম, চিঠি এসব প্রকাশ করা হয়। ট্রাম্প সরকার নানাভাবে এগুলো প্রকাশ না করার চেষ্টা করলেও জনগণের চাপে এগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এই নথিগুলো প্রকাশের পর পরই তোলপাড় হয়ে যায়। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সাথে যৌনসম্পর্ক, বিকৃত কর্মকান্ডসহ প্রচুর ডিস্টার্বিং ছবি, ভিডিও, চিঠি, কার্ড ইত্যাদি এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
১৯ নভেম্বরের মাঝে প্রকাশের কথা থাকলেও US Department of Justice ভিক্টিমদের পরিচয় গোপন করে সম্পাদনা করে প্রকাশ করতে করতে দেরি হয়ে যায়। গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) লাখ লাখ নথির পাশাপাশি ২ হাজার ভিডিও এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি প্রকাশ করে এই সাইটটি। বর্তমানে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত আছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস



পাঠকের মন্তব্য