আর আমরা আজও বসে আছি, ক্রেডিট রোলের অপেক্ষায়

২০০ পঠিত ... ১৭:১০, জানুয়ারি ৩১, ২০২৬

লেখা: ইশতিয়াক আহমেদ শোভন 

৩০ জানুয়ারি, ১৯৭২। শহরটা তখনও নতুন স্বাধীন, কিন্তু বাতাসে বারুদের গন্ধ ছিল। যুদ্ধ শেষ হইছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ, পতাকা উড়তেছে, কিন্তু মিরপুর তখনও অর্ধেক অন্ধকার। পাকিস্তানি সমর্থক বিহারি  আর কিছু লুকানো মিলিশিয়া ছুরি-বন্দুক নিয়া ঘাপটি মাইরা বসা। স্বাধীন দেশ, কিন্তু পুরোপুরি মুক্ত না।

এই সময়েই জহির যান ভাই শহীদুল্লাহ কায়সাররে খুঁজতে। শহীদুল্লাহ কায়সাররে যুদ্ধের শেষ দিকে ধইরা নিয়া গেছিল, আর ফেরত আসে নাই। লাশও পাওয়া যায় নাই। এর মধ্যে কয়েকটা রহস্যময় ফোন। ‘মিরপুরে আসেন, উনি বেঁচে আছেন।’  সকালে উনি পরিবার-সহকর্মী নিয়া রওনা দেয়, কিন্তু সেকশন ২ এর কাছে কইল, ‘একলা যান।’

তারপর? মানুষটা হাওয়া।

ওইদিনই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট অপারেশন চালায় মিরপুর লিবারেট করতে। ৪০ জন সৈন্য মারা যায়। অনেকের লাশই নাই।  জহির রায়হান-ও হয়ত ওইখানেই পড়ে গেছে। কেউ কয় ক্যাম্প থেইকাই তুলে নেওয়া হইছে। কেউ কয় কলোনির ভিতরে ঢুকছিল। কেউ নিশ্চিত কিছু বলতে পারে না। ঢাকায় তোলপাড়, খোঁজাখুঁজি, তদন্ত। কিন্তু শেষমেশ সব ঠান্ডা। ফাইল ঘুমায়া পড়ে থাকে। যেন ইচ্ছা কইরাই রহস্যটা চাপা দিয়া রাখা হইছে।

আর এই জায়গাটাতেই কষ্টটা বেশি লাগে। কারণ উনি শুধু একজন ডিরেক্টর না, একজন পলিম্যাথ টাইপ মানুষ ছিলেন। যেইখানে হাত দিছে, সোনা বানাইছেন।

যুদ্ধের টাইমে কলকাতায় গিয়া বানাইল ‘স্টপ জেনোসাইড’। মাত্র ২০ মিনিট। কিন্তু ওই ২০ মিনিটই দুনিয়ার বিবেক ঝাঁকাইয়া দিছিল। পাকিস্তানির হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, লাশের স্তূপ। একদম কাঁচা ফুটেজ। দেখতে গেলে মনে হয় না সিনেমা, মনে হয় ইতিহাসের রক্তাক্ত ডায়েরি। কিউবার স্যান্তিয়াগো আলভারেজের স্টাইল, কাট-কাট মন্তাজ, নিউজরিলের মতো গতি দেখলেই বুক ধড়ফড় করে। তারপর ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’। নতুন দেশের জন্ম, রক্তের ভিতর থেইকা।

আর কত প্রজেক্ট অসমাপ্ত। ‘লেট দেয়ার বি লাইট’  নামটাই কেমন কবিতার মতো। ইংরেজি ফিল্ম, যুদ্ধের আগে শুরু করছিলো। কিছু ফুটেজ আছে, পুরোটা নাই। যেন হারায়া যাওয়া ট্রেজার। আরও ডকুমেন্টারি, ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’, কত ফুটেজ, কত রেকর্ড সব ইতিহাসের ধুলায় চাপা।

ভাবি মাঝে মাঝে, মানুষটা বাঁচলে আজকে বাংলাদেশের সিনেমা কই যাইত! হয়তো আমরা অনেক আগেই ইন্টারন্যাশনাল ম্যাপে থাকতাম।

লেখক হিসাবেও তো একেকটা আগুন। ‘সূর্যগ্রহণ’ থেইকা শুরু। ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ পড়লেই বুক হালকা ব্যথা করে। ‘হাজার বছর ধরে’ গ্রামের জীবন এমন রিয়েল যে মনে হয় নিজের দাদার গল্প পড়তেছি। ‘আরেক ফাল্গুন’ ভাষা আন্দোলনের স্পিরিট, ‘বরফ গলা নদী’, ‘তৃষ্ণা’ সবখানেই মানুষ, দুঃখ, প্রেম, সংগ্রাম। উনার লেখা মানে বই না, জীবনের কাঁচা রক্ত।

আর ‘জীবন থেকে নেওয়া’? এইটা তো সিনেমা না, একদম রাজনৈতিক কবিতা। ভাষা আন্দোলনের গল্প কইরা এমনভাবে ফ্যামিলি ড্রামা বানাইছে যেন ঘরের ভিতরেই রেভল্যুশন। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক পর্যন্ত প্রশংসা করছেন। তখনই বুঝেন, লেভেলটা কই।

‘কাচের দেয়াল’, ‘বেহুলা’, ‘অনোয়ারা’, ‘দুই ভাই’, ‘সোনার কাজল’, ‘সংগম’ পাকিস্তানের প্রথম কালার ফিল্ম! ভাবা যায়? একটা বাঙালি লোক ওই সময় এইসব করতেছে। উর্দুতেও বানাইছে ‘জলতে সুরজ কে নিচে’। মানে মানুষটা লিমিট মানতই না।

তার সিনেমায় থার্ড সিনেমা মুভমেন্টের প্রভাব, ব্রেখটিয়ান ডিস্ট্যান্স, পলিটিক্যাল স্যাটায়ার সব মিশায়া এক অদ্ভুত ভাষা বানাইছিলো। দেখলে মনে হয় ফ্যামিলি ড্রামা, কিন্তু ভিতরে আগুন জ্বলতেছে।

আজকে ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হইতেছিল, এই শহরটাই উনারে গিলে ফেলছে। একটা শহর, যেইটা উনার ক্যামেরায় এতবার ধরা পড়ছে, সেই শহরই উনার লাশটাও ফেরত দিল না।

উনার গল্পের শেষ সিন নাই। কোনো ক্লোজিং শট নাই। শুধু ফ্রিজ ফ্রেম। একটা মানুষ মিরপুরের দিকে হাঁটতেছে… তারপর স্ক্রিন ব্ল্যাক।

আর আমরা আজও বসে আছি, ক্রেডিট রোলের অপেক্ষায়।

২০০ পঠিত ... ১৭:১০, জানুয়ারি ৩১, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top