আল জাজিরার সাথে জামায়াত আমিরের সাক্ষাতকারের 'বয়ান'

১৩৫৬ পঠিত ... ১৭:৫০, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

লেখা: রাজু নূরুল 

সংবাদ এজেন্সি আল জাজিরা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যেখানে প্রথম ১১ মিনিট তিনি জামাত ক্ষমতায় আসলে দেশে ইসলামি আইন জারি হবে কিনা, তাদের দলে নারীদের কি অবস্থান—এসব নিয়ে কথা বলেছেন। আমি সেসব কথার বাংলায় অনুবাদ করেছি। চলুন ওনার উত্তর দেখা যাক।

: আপনারা জিতলে কি বাংলাদেশে ইসলামিক আইন জারি হবে?

: ভবিষ্যতে মানুষ যা ভাল মনে করে তাই করবে। ওটা মানুষের ব্যাপার।

: কিন্তু অন্যরা তো, মানে আপনার দলের নেতারা তো বিভিন্ন জায়গায় এসব বলছে?

: আপনি শুধু পার্টির প্রধানের কথা শুনুন। অন্যরা কী বলছে সেটা ব্যাপার না। পার্টির প্রধান কী বলে ওটাই আসল। ওতে যদি দেশের উপকারে আসে, তাহলে সংসদ সেটা ঠিক করবে।

: আপনি বলেছেন যে, আপনি নারীদেরকে সম্মান করেন। তাহলে একটু বলুন যে, আপনারা এবারের ইলেকশনে কয়জন নারীকে নমিনেশন দিয়েছেন?

: একজনও না। কিন্তু আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি এবং তারা জিতেছেও।

: মানে এই নির্বাচনে আপনারা একজন নারীকেও নমিনেশন দেননি?

: না একজনও না। অন্য দলও যে খুব বেশি দিয়েছে সেটা আপনি দেখাতে পারবেন না। কারণ এটা বাংলাদেশের কালচার। আমরা এরজন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।

: কিন্তু তারা তো অল্প কিছু হলেও দিয়েছে। আপনাদের মতো শূন্য না। আপনারা একজনকেও দিলেন না কেন?

: আমি অলরেডি উত্তর দিয়েছি। আমরা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি! এটা তো একদিনে হয়ে যাবে না! আমরা এ বিষয়ে নারীকে অসম্মান করি না।

: যদি কখনও কোনো নারী চায় যে সে জামাতের প্রধান হবে, আপনার পদে বসবে, সেটা কি সম্ভব?

: না। এটা সম্ভব না। কারণ আল্লাহ প্রত্যেককে আলাদাভাবে বানিয়েছে। আমরা পুরুষরা কখনোই বাচ্চা পালতে পারবে না। আমরা বাচ্চাদেরকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারব না। এটা আল্লাহর দান। যেটা আল্লাহ বানাইছে ওটা আমরা পাল্টাতে পারব না।

: আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। নারী যদি পরিবার চালাতে পারে, সে যদি বাচ্চা পালতে পারে, তাহলে জামাতের প্রধান হতে পারবে না কেন?

: এমন কিছু জিনিস আছে যেখানে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আপনি জানেন সেটা।

: না আমি আসলে জানি না...

: কেন জানেন না সেটা আপনি? মা বাচ্চা পয়দা করার পর যে দায়িত্ব পালন করে সেটা কি আপনি পারবেন? নেভার। আল্লাহ সব ভাল জানেন।

: কিন্তু গত তিন দশক তো দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিল। তারা কি দেশ চালায়নি?

: আমরা তাদেরকে অসম্মান করছি না। আমাদের তাতে অসুবিধা নাই।

: মেয়েরা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে না? তারা কত প্রতিষ্ঠানের প্রধান না? তাহলে দেশ চালাতে পারবে না কেন?

: পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ নারীদেরকে এ পদে যোগ্য মনে করে না। শারীরিকভাবেই এটা সম্ভব না। এটাই সত্য।

: নানা দেশের প্রধানই তো নারী!

: অল্প কয়েকটা দেশে।

: মজার তো! আপনি বিএনপির পার্ট ছিলেন আগে, যেখানে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিল। আপনি কি মনে করেন না যে উনি ভাল কাজ করেছে?

: ইয়েস। এটা আমাদের সিদ্ধান্ত না। ওটা ওদের পার্টির সিদ্ধান্ত।

প্রিয় পাঠক, বিশেষ করে নারী পাঠকগণ, যে দেশে জনসংখ্যার ৫১% নারী, যে দেশের স্কুলে এখন ৫০% এর বেশি মেয়েরা ভর্তি হয়, যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সমান সংখ্যক শিক্ষার্থী নারী, যে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টস থেকে দেশের ৮০ ভাগ রপ্তানি আয় আসে, টাকার অংকে যেটি বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার এবং ৬০ ভাগ স্টাফ নারী, যে দেশের কৃষিখাতের আত্মা নারী, সেই দেশের একটা রাজনৈতিক দলের প্রধানের এই হলো নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। আমি অবশ্য অবাক হইনি। আমি জানি যে, নারী বিষয়ে জামায়াতের পরিকল্পনা এরচেয়ে অনেক বেশি ভয়ানক।

আপনি একজন আফগান মন্ত্রীর সাক্ষাৎকার পড়ুন, এরপর জামাত প্রধানের বক্তব্য শুনুন, প্রতিটি অক্ষরে মিল খুঁজে পাবেন।

আপনার যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, যারা জামাত-শিবিরকে ভোট দেন, কিংবা আগামী ইলেকশনে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন, আমি পুরুষদের কথা বাদই দিলাম, শুধু নারীদেরকে জিজ্ঞেস করি, জামাত যেই বাংলাদেশটা চায়, ওই দেশ কি আপনাদেরও স্বপ্ন? ঘরে আবদ্ধ হয়ে, কাজকর্মহীন, শিক্ষাহীন, পুরুষের অধীনে একটা নির্জীব জেনারেশন হয়ে বেঁচে থাকা?

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন। নিজের আত্মাকে, নিজের বিবেককে একবার জিজ্ঞেস করুন।

শুধু শারীরিকভাবে, নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার কারণে এই অসম্মান যদি আপনার প্রাপ্য হয়, সেটা যদি ঠিক মনে করেন, তাহলে আমার কিছু বলার নেই। আপনাদের জন্য শুভ কামনা।

১৩৫৬ পঠিত ... ১৭:৫০, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top