অভিধান থেকে বেশ্যা শব্দটি মুছে ফেলতে হবে

১০১ পঠিত ... ১৬:২২, জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
38
 
আমাদের সমাজে পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট শব্দ ব্যবহার সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বেঙ্গল রেনেসাঁর লেখক ও সাহিত্যিকদের লেখায় ব্যবহৃত পতিতা, বেশ্যা, বেবুশ্যা এই শব্দগুলো পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট। সমাজের নানাস্তরের লোক সেটা না জেনে; এই শব্দগুলো অবলীলায় ব্যবহার করে। বিশ্বব্যাপী সেক্স ওয়ার্কার বা যৌনকর্মী শব্দটি প্রচলিত। কিন্তু সেখবর গোবরডাঙ্গা ও শিয়ালনগরে পৌঁছায়নি।
 
আমাদের সমাজে সম্মানজনক পেশা হিসেবে যেগুলো স্বীকৃত; যেমন রাজনীতিক, সরকারি চাকুরে, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, এনজিও কর্মী; অর্থাৎ যে পেশাগুলো নতুন কাস্ট সিস্টেম তৈরি করে স্বঘোষিত উচ্চবর্গ হয়েছে; স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরে তাদের বেশিরভাগই পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে পারেনি।
যৌনকর্মীর দায়িত্ব তার ক্লায়েন্টকে জৈবিক প্রেমসেবা দেয়া। বরাহমুখো, বেগুনি, পেট মোটা, কুঁজো, চুলে কলপ দেয়া পয়সাওয়ালা বদখত লোকগুলোকে হাসিমুখে প্রেমসেবা দেয় লোলিতলোভনকান্তি যৌনকর্মী। পরিবর্তে সে যে অর্থ উপার্জন করে; তা দিয়ে তার অসুস্থ বাবার ওষুধ কেনে, মায়ের হাতে সংসার খরচ তুলে দেয়, ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ চালায়; কখনো কখনো সন্তানকে একাই পিতা-মাতার স্নেহ দিয়ে বড় করে।
 
জীবন অদ্ভুত এক দৈবচয়নের খেলা। একটি প্রচলিত প্রবচন আছে, অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি ভালো ঘরণী না পায় ঘর। অনেক মিসফিট পারসোনায় ঘষামাজা করা, কর্কশ, অর্থলোলুপ, আত্মকেন্দ্রিক, নিষ্ঠুর নারী জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রের খান আতার মতো অসহায় স্বামীর গানের সুর কেড়ে নেয়; তাকে তার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে; নিজের মায়ের দিকটাতে স্বামীর উপার্জনে এনজিও ওয়ার্ক চালাতে থাকে। পরের ধনে পোদ্দারি করে কত কত বেগম, সোশালাইট আন্টি শপিং আর অরগগলিং করে রাজত্ব করে গেলো। ঠিক শেখ হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট শাসন তাদের গৃহে। কোন যোগ্যতা ছাড়া তারা ঘর ও বর পেয়েছে; মিসেস অমুক বলে এলিট ক্লাবে কীটি পার্টি করেছে; টিভি টকশোতে ফেমিনিজমের ঝান্ডা উড়িয়েছে।
 
কাজেই এই যে বিবাহ নামের প্রতিষ্ঠান; কোমল ও উদার মনের নারী যেখানে পদে পদে স্বামী-শাশুড়ির হাতে নিঃগৃহীত হয়ে শুধু চার লোকে কি বলবে ভেবে ডলস হাউজের নোরার মতো প্রতারিত হয়েছে। ঘুষখোর মদ্যপ লম্পট গায়ে হাত তোলা কথিত স্বামী নামের প্রতিষ্ঠানের ভারী পাথরটাকে সারাজীবন সিসিফাসের মতো বহন করে চলেছে। চাকরিজীবী নারীর সামন্ত মানসিকতার স্বামী সারাদিন অফিস করে আসা স্ত্রীকে ঘরে বাইরে ভারবাহী পশু ভেবে এক্সপ্লয়েট করেছে।
 
খুব অল্প কিছু রুপকথার মতো দাম্পত্য জীবন বাদ দিলে; বেশিরভাগ বিবাহিত জীবনই আপোষের অভিনয়; মানিয়ে চলার বিষাদসিন্ধু। কাজেই কি নিয়ে গর্ব এতো লোকের যে কথায় কথায় 'বেশ্যা' শব্দটি ব্যবহার করে যৌনকর্মীদের অপমান করতে হবে!
 
আমরা তো বরং বঙ্গভবনে, গণভবনে, মন্ত্রীপাড়ায়, সংসদে, সচিবালয়ে, প্রেসক্লাবে, মিডিয়ায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, উন্নয়ন সংস্থায়, বিশিষ্ট লোকেদের বিবৃতিতে, প্রতিবাদ সভায়, প্রগতি ও ধর্মশীলতায়, বাম ও ডানপন্থায়, দুর্নীতি ও লুন্ঠনের বসন্তে, উন্নয়নের কথামালায়, ডিপ স্টেটের হানিট্র্যাপে, সার্বভৌমত্ব আত্মসমর্পণের স্ট্রিপটিজে 'বেশ্যাবৃত্তি' দেখেছি। রাজনীতির মোক্ষদা মাসী ও মেসোকে দেখেছি অল্পবয়েসী ছেলে-মেয়েদের সাজিয়ে গুছিয়ে গ্রুমিং করে সোনাগাছির প্রমিত ভাষায় প্যাঁচের কথা বলা শেখাতে । স্যুডো বুদ্ধিজীবীর আইকনের ফোর প্লে-র চেয়ে অশ্লীল আর কি হতে পারে!
 
সোভিয়েত ভেঙ্গে পড়ার পর ইস্ট ইউরোপের মেয়েদের যেমন সেজেগুজে কোলন ও বার্লিনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ডাকতে দেখেছি; আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কিংবা টকশোতে তাদের বুদ্ধিজীবীর লাস্যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষমতায় আসতে পারে এমন দলের শীর্ষ নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে স্টেটাসে লিপিস্টিক তেলাঞ্জলির শব্দ বাক্যে ফেসিয়াল করে নব নব বুদ্ধিজীবীর 'এসো এসো সুরে করুণ মিনতি মাখা আহবান' কি আমরা দেখতে পাইনা!
 
কাজেই কথায় কথায় বেশ্যা বলে গালি দেয়া আর সিলেক্টিভ প্রতিবাদে নান্দনিক রাজনৈতিক বেশ্যাবৃত্তির বহুব্যবহারে জীর্ণ কৌশল দেখানো বন্ধ করতে হবে। খুবই একঘেয়ে এই গোবরডাঙ্গার কারবার।
 
অভিধান থেকে বেশ্যা শব্দটি মুছে ফেলতে হবে। এই অকল্যাণ রাষ্ট্রের কোন সার্ভিস সেক্টর ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ছাড়া কোন সেবা দেয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে যাওয়া মানে পদে পদে জনগণের ভোগান্তি। সেখানে যৌনকর্মীরা ঐ একটি সার্ভিস সেক্টরে সৎ ও নিষ্ঠাবান থেকেছেন প্রেমসেবা দিতে। বেস্ট ওয়ার্কারের মুকুটটি কেবল তাদের মাথায় শোভা পায়।
 
 
১০১ পঠিত ... ১৬:২২, জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top