যেভাবে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো (তৃতীয় পর্ব)

৪৪ পঠিত ... ১৬:৩১, জানুয়ারি ২৪, ২০২৬

লেখা: আফসানা বেগম 

এই প্রতিষ্ঠানে আমার নিয়োগ হয়েছিল চুক্তিভিত্তিক, একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। যেমন একটা গল্প লেখার সময়ে যদি পত্রিকা জানায় ২০০০ শব্দের মধ্যে লিখতে হবে, আমি শব্দসীমাকে ক্যানভাস ধরে প্যারাগুলোর উত্থান মনে মনে সাজিয়ে নিই। ঠিক তেমনই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আমার ক্যানভাসের দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ মাস। আমি কী কী করব, কী পরিবর্তন আনব, কবে কোনটা শেষ হবে তার টাইমলাইন সাজানো ছিল। আমি সেটা করেছিলাম দায়িত্ব পেয়েছিলাম বলেই। প্রতিষ্ঠান দখল করে আমি কিছু করছিলাম না। আমি নিজের লবিং বা পরিকল্পনায় সেখানে যাইনি। যেখানে আমার দখলের কোনো স্পৃহা ছিল না, সেখানে আমার কাছ থেকে বেদখল করে নেওয়ার প্রচেষ্টাটি আমি অশোভন ও হাস্যকর হিসেবে দেখি। আমাকে যেমন সসম্মানে ফোন করে, অনুরোধ করে প্রতিষ্ঠানের হাল ধরতে বলা হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে এই দায়িত্বের শেষ হতে পারত। যদি সময়ের আগেই শেষ করার প্রয়োজনীয়তা উদ্ভূত হয়, তবে কারণ নিয়ে কথা বলেও শেষ করা যেত। একটা মানবিক পরিবেশ চাকরির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সেটা আমলা এবং তাদের নির্দেশনা দেওয়ার লোকদের বোধ করা প্রয়োজন। রক্তক্ষয়ী একটা অভ্যুত্থানের পরে আমাদের মানবিক হবার কথা ছিল। মত প্রকাশের অধিকার পাবার কথা ছিল। আমার মতো একজন অরাজনৈতিক ব্যাক্তিকে ডেকে নিয়ে গিয়ে পরিণতিতে অপমান করার কোনো যোগ্যতা বা অধিকার উপদেষ্টা বা মন্ত্রণালয়ে বসে থাকা আমলাদের আছে বলে আমি মনে করি না। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একমত না হলে অন্য কোনো সাহিত্যসেবীও তাদের কাছে যোগ্য সম্মান পাবেন বলে আমি মনে করি না। সমাজের সাধারণ থেকে গণ্যমান্য অনেকে আমারই মতো আমার আকস্মিক ও নাটকীয় অব্যহতির বিষয়টিকে বিব্রতকর, অপ্রয়োজনীয়, অপমানজনক, হঠকারিতামূলক ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। মানুষের এই অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ও প্রতিষ্ঠানের সংষ্কার ভাবনাকে ব্যর্থ করার প্রচেষ্টা হিসেবে এই ঘটনা দীর্ঘদিন মানুষের মনে থাকবে। এক মুখে গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের কথা ও পরমুহূর্তেই সেই স্পিরিটের বিপক্ষে কাজ করার দ্বিচারিতা হিসেবে এই ঘটনা উল্লেখ করা হবে।

মানুষের সৎ প্রচেষ্টা যে দলগত নির্বুদ্ধিতা ও অসততার কাছে জিম্মি তার প্রমাণ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উত্থানকে ঠেকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। একে স্বাধীনভাবে কাজ না করতে দেওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া। ভালো বই লাইব্রেরিতে যাবে না, কোটায় নিম্নমানের বই কেনা হবে। আমাকে যেমন দিনের একটা সময়ে আগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কুৎসিত বইগুলো বেছে আলাদা করতে হতো, পরের অনেক পরিচালককে সেটাই করতে হবে। একের পর এক আমল আসবে-যাবে, কিন্তু গ্রন্থকেন্দ্র মানুষের করের টাকায় ভালো সাহিত্যের জায়গায় অপ্রয়োজনীয় বইয়ের স্তূপ লাইব্রেরিতে পাঠাবে। আমল গেলেই আবারও তা ওপরের কোনো ঘরে লুকিয়ে রাখতে হবে। কোটায় কাগজের লাইব্রেরিকে লাখ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এটাই ভবিতব্য।

যদিও জানানো হয়নি কী কারণে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে অন্য ব্যস্ততা ফেলে জরুরি ভিত্তিতে আমাকে বহিষ্কার করা হলো, তবুও আমাকে বলতে হবে যে, জ্ঞানত আমি এমন কিছু করিনি যাতে গ্রন্থকেন্দ্রের তথা সরকারের কোনো ক্ষতি হয়। স্বজনপ্রীতি তো দূরের কথা, গত বছর ১৭৩১ শিরোনামের বইয়ের তালিকায় আমি নিজের কোনো বই রাখতে দিইনি। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কথা ভেবেছি। এবারেও বই নির্বাচন চলছিল, কমিটির অন্য সদস্যেরা আমার বই নেওয়ার পক্ষে একযোগে মত দিয়েছেন। কিন্তু সাইন করার আগে আমি সেসব কেটে দিয়েছি। কাটার অধিকার নেই, কিন্তু নিজের বই বলে কেটেছি। বইয়ের তালিকা আগেরবার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ইতিহাসে প্রথম ওয়েবসাইটে দিয়েছি, এবারেও থাকলে দিতাম। আমি জানতাম বইয়ের তালিকা এমনই হতে হবে যা আমি প্রকাশ করতে পারি। আর এবারে তো সফটওয়ারের মাধ্যমে বাড়িতে বসে মানুষে বই নির্বাচন করবে, সমস্তকিছু স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হবে, এই প্রত্যাশা ছিল। প্রকাশকদের জন্য সফটওয়ারের যে অংশটি চালু হবার কথা সেটি হলে একই বইয়ের ডুপ্লিকেট কপি কেনার জন্য চাপ দেওয়া কমত। লেখককে কেউই টাকা দিতে চান না, সেজন্য এবারে চুক্তি বা অনুমতিপত্রও চেয়েছিলাম। লেখকদের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থেকেই এরকম চিন্তা করেছিলাম।

কাজ করলে সব পক্ষ প্রভাবিত হবে। কাজ না করলে করো আপনাকে নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কাজ করলে মানুষে আপনার ভুল ধরতে পারবে। কাজ না করলে আপনার কোনো ভুল নেই। আমি কাজ করার রাস্তাটা বেছে নিয়েছিলাম। সপ্তাহে সাতদিন কাজ করেছি। আমার বাহিনি অফিসারেরা তো করেছেই। আমার তৃপ্তি হলো অব্যহতি পাওয়ার সংবাদটি পাওয়ার মুহূর্তে আমরা কাজ করছিলাম। দেশের চিন্তাশীল মানুষের সামনে গ্রন্থকেন্দ্রের সম্ভাবনার কথা কী ছবিতে কী ভাষায় তুলে ধরব সে নিয়ে ছক কাটছিলাম। আমার তৃপ্তি হলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি পাঠক সমাজের কল্যাণে কাজ করে গেছি। শুধু চাইতাম এই সরকারের অবদানের মধ্যে যেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংষ্কারটি মানুষে মনে রাখে। মন্ত্রণালয় তুলে ধরেনি বা ধরবে না জেনে নিজেরাই কাজটা করার উদ্যোগ নিচ্ছিলাম। আগের সব অনুষ্ঠানের মতো করেই তাদেরও আমন্ত্রণ করতাম।

আমার প্রশান্তি হলো, আমি এই প্রতিষ্ঠানে থাকাকালীন কোনো দুর্নীতিতে জড়াইনি। আমার বিরুদ্ধে কাজ-প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ করা যাবে বলে আমি মনে করি না। আমার সাথে যে অন্যায় হলো তা আমাকে বলতে হবে না, বহু বছর পরেও আমার কাজগুলো তা বলবে। ভালো করে ভাবলে বলতে পারি, মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বা সচিবের বিরক্ত মুখ আমাকে যতটা কষ্ট দেয়, তার থেকে বহুগুণ আনন্দ দেন প্রান্তিক অঞ্চলের কোনো পাঠাগার-সংগঠক, যখন তিনি বলেন, ‘এবার ইউএনওর সাইন লাগবে না? লাইব্রেরির ঠিকানায় বই চলে আসবে? আসেন আপনারে মিষ্টি খাওয়াবো।’

এই স্মৃতিগুলো আমি দীর্ঘদিন ধরে লালন করব। দায়িত্বশেষে আমার নিজের জীবনেই ফিরে আসার কথা ছিল। আসার অপেক্ষাও ছিল। সেখানে সাহিত্য চর্চায় আমি আবারো নিমজ্জিত হতে পারবো, আপাতত এই আনন্দ নিয়েই আছি। শুধু খারাপ লাগে অফিসের প্রিয়জনদের জন্য, যারা আত্মার খুব কাছের হয়ে উঠেছিলেন, আমার কারণে তাঁরা প্রতিষ্ঠান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, জান দিয়ে সেই স্বপ্নের পিছনে ছুটছিলেন। আমার কারণে যে তাদের সেই  স্বপ্নে হতাশা এল, এই বেদনা ভয়াবহ। তারা যেন আমাকে ক্ষমা করেন। হুট করে টিকেট কেটে আমাকে যখন এয়ারপোর্টে দিতে এসেছিলেন তখন পরিণত বয়সের এতগুলো মানুষ অঝোরে কাঁদছিলেন, দেখে আমি দ্রুত এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকে গেছি।                              

(চলবে)

 

চতুর্থ পর্বের লিংক

দ্বিতীয় পর্বের লিংক

 

৪৪ পঠিত ... ১৬:৩১, জানুয়ারি ২৪, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top