যেভাবে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো (প্রথম পর্ব)

১৫৭ পঠিত ... ১৬:১৮, জানুয়ারি ২৪, ২০২৬

লেখা: আফসানা বেগম 

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংষ্কার, সম্ভাবনা ও পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে একটা সেমিনার করার কথা ছিল আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি, সিডাপে সেজন্য হল বুকিংও দেয়া হলো, কক্সবাজারে ট্রেনিংয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিনারের পরে এ নিয়ে তুমুল মিটিংয়ের এক পর্যায়ে গেজেট দেখা গেল, আমাকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। মিটিং পণ্ড হলো।

২০২৪ গণঅভ্যূত্থানের পরে ৫ সেপ্টেম্বর আকস্মিক আমাকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে পরিচালক হিসেবে লেখক/বুদ্ধিজীবীদের নিয়োগ দেওয়ার চল আছে। তবে কেবল লেখক হবার জন্য নয়, কিছু রাজনৈতিক কলাম লেখা, মত প্রকাশের অধিকার কিংবা ভোটের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে সভাসমিতিতে উপস্থিতির কারণে আমাকে এরকম একটা কাজের জন্য মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল বলে ধারণা করি। তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফোন করে আমাকে প্রস্তাব দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না এ কাজের জন্য আমি উপযুক্ত কিনা। কিন্তু আসিফ ভাই অভয় দেন। তাঁর কথায় এমন কিছু একটা ছিল যেজন্য আমার মনে হয় শুধু লেখাই যথেষ্ট নয়, সুযোগ পেলে দেশের জন্য উপযুক্ত কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।

গত জানুয়ারি ২০ তারিখে রাতের অন্ধকারে দুটো প্রজ্ঞাপন জারি হয়, পরপর ১৬ আর ১৭। মাঝখানে কোনো গ্যাপ নেই। অর্থাৎ, প্রথমটা যে দ্বিতীয়টার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে তা ঢাকার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও নেই। হয়ত ভাবা হয়েছে, আমাকে কেবল বাতিল বলে ছেড়ে দিলে আমি তা বদলানোর চেষ্টা করব। একদিন আমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ওখানে কাজ করতে বলা হয়েছিল। লক্ষ করুন, ওখানে নিয়ে গিয়ে আমাকে নতুন পরিচয় দেয়ার জন্য নেয়া হয়েছিল মনে হতে পারে। তবে প্রকৃতপক্ষে, আমার আগে থেকেই একটি প্রতিষ্ঠিত পরিচয় ছিল, সে কারণেই আমাকে সেখানে ডাকা হয়েছে। সুতরাং নিজস্ব পরিচয় ও আত্মসম্মানবোধের জায়গা থেকে অব্যহতি দেওয়ার পরে সেই দায়িত্বের জন্য উঠেপড়ে লাগার প্রশ্ন নেই।

গতকালের ঢাকা স্ট্রিমের একটি রিপোর্টমতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়োগ শাখার সিনিয়র সহকারি সচিব মামুন শিবলী স্ট্রিমকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এসেছে আফসানা বেগমকে অব্যহতি দিয়ে নতুন একজনকে নিয়োগ দেয়া জন্য আমরা শুধু আদেশ বাস্তবায়ন করেছি।’ সংস্কৃতি উপদেষ্টার চাওয়া তারা বাস্তবায়ন করেছেন জানিয়ে মামুন শিবলী বলেন, উপদেষ্টার চাওয়া থাকে, দরকার থাকে, সেটা তো আমরা জানি না। উপদেষ্টার ইচ্ছাতেই মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এসেছে।

‘উপদেষ্টার চাওয়া বা ইচ্ছা’ নিয়ে ভাবতে গেলে গত একদেড় বছরের অনেক কথা মনে পড়ে। এই মন্ত্রণালয়ের প্রথম উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ইচ্ছা ছিল বই নির্বাচন নীতিমালাটা এমন হবে যেন ভালো ভালো বই নেয়া যায় আর অযোগ্য বই প্রত্যাহার করা যায়। দায়িত্ব নিয়েই প্রথম কাজ হিসেবে পাঠাগারে বই বিতরণ তখন সামনে। হাজার হাজার চাটুকারিতাসমৃদ্ধ বই সরিয়ে ফেলার বা বিতরণে বাতিল ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আসিফ ভাই। সে কাজটা করতে গিয়ে ভারাক্রান্ত লাগত, লাখ লাখ সুন্দর কাগজ আর দামি প্রচ্ছদে মোড়ানো বইয়ের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ওইসব বই মূলত নেয়া হয়েছিল মন্ত্রী সচিব কোটার মাধ্যমে। আসিফ ভাই বললেন, নীতিমালাটা সংশোধন করতে হবে। শুরুতেই কঠিন কাজ। খুব মনোযোগ দিই আমরা। কয়েক দিনে শেষ হয়। আসিফ ভাইকে মেইলে পাঠালে তিনি রিভাইস করে দেন। বলেন, ভালো হয়েছে। সেই নীতিমালায় তার সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে আমরা সচিব ও মন্ত্রী কোটা ২০% তুলে দিই ও ১০০% কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে বলে উল্লেখ থাকে। এ ছাড়া, তিন বছরের জায়গায় যে কোনো সময়ের বই (যেহেতু বহু বছর অনেক বিষয়ের বই উপস্থাপিত হবারই সুযোগ পায়নি, রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় অনেক প্রকাশক বই জমাই দেননি।) ও সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়।

নীতিমালা শুধুমাত্র অনুমোদনের কাজ বাকি থাকে। নীতিমালাটি মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে দিতে উপদেষ্টা পরিবর্তন হয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী চলে আসেন। আসিফ ভাই জানান বাকিটা ফারুকী ভাই দেখবেন। নীতিমালার পুরো বিষয়টা উনাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, আসিফ ভাইয়ের মেইলগুলো পাঠাই, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পাই না। শেষে অনেক অনুরোধের পরে একদিন একটা বড় কমিটি বসে। উপকমিটি সরাসরি নীতিমালা অনুমোদনের কাজ করবে বলে জানায়। তখন সমস্যা হয় ওই মন্ত্রী সচিব ২০% কোটায়। এটা থাকবে কি থাকবে না সে নিয়ে ফারুকী ভাই আমার সাথে বসতে চান কিন্তু কোনোভাবেই তার সময় পাওয়া যায় না। এ নিয়ে দিনের পর দিন সময় দিয়ে, অফিসে বসিয়ে রেখে উনি মিটিং বাতিল করেন। শেষে একদিন ঘর ভরা লোকের মাঝখানে উনি আমাকে কথা বলতে দেন। অপেক্ষা করার সময়ে আমার পরপর পিএসের ঘরে ইউনেস্কো থেকে লেখক কিজি তাহনিন ও তার সঙ্গে সেখানে কর্মরত একজন বিদেশি নারী এসে বসেন। ফারুকী ভাই ডাকলে গিয়ে দেখি সেখানে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সচিব মফিদুর রহমান, খালিদ সাহেবসহ অন্তত দুজন উপসচিব, অতিরিক্ত সচিব নাজরিফা শ্যামা উপস্থিত আছেন। আমার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের একজন অফিসার। আমি বলা শুরু করি, কোটা না থাকলে কার্যকর লাইব্রেরি অনেক বেশি টাকা পাবে। তাদের খুব উপকার হবে। অন্যদিকে খারাপ বইয়ের বোঝা কমবে। কারণ নীতিমালা অনুযায়ী কোটায় কোনো বই নির্বাচন পদ্ধতি (ক্যাটালগ জমা নেয়া, বই বেছে নেয়া) অনুসরণ করা হয় না। আবার কোটায় আসা লাইব্রেরিরও কোনো পরিদর্শন রিপোর্ট লাগে না। যারাই সচিব বা মন্ত্রীকে পটাতে পারেন, তাদেরই লাইব্রেরি নির্বাচিত হয়। সাধারণ তালিকায় হিসাবের নিয়ম থাকলেও কোটার অধীনে যত ইচ্ছা তত কপি বই, যত ইচ্ছা তত টাকা অনুদান যায় লাইব্রেরিতে। অযোগ্য অপাঠ্য বইগুলো তখন সাধারণ লাইব্রেরিকে জোর করে নিতে হয়। দিনের পর দিন আগের আমলের কোটার বই ফেলতে গিয়ে আমার কাহিল লাগত।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তো বটেই, বহু সরকারি কর্মকর্তার বই নেয়া হতো। যেমন, একজন অতিরিক্ত সচিবের লেখা, ‘আমার স্ত্রীর জন্মদিনে লেখা ৫০ কবিতা’ বইটি, প্রচ্ছদে স্ত্রীর ছবি। এই বই গ্রন্থকেন্দ্র এক হাজার কপি কিনেছিল। মুজিব, হাসিনা, এমনকি পুতুলের ছবি দেয়া বইও হাজারে হাজার। মুজিব শতবর্ষে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত লাখ বই। মাঝখানে একটি ‘ও’ দিয়ে কত যে বই, যেমন, মুজিব ও লোককাহিনি, আবার, লোকসাহিত্য ও মুজিব। এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে জুলাই নিয়ে লেখা বইয়ের বিষয়ে আমি শুরু থেকেই সতর্ক ছিলাম। বেছে বেছে জুলাইয়ের ভালো বইগুলো নিয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে, বিভাগীয় বইমেলায় প্রদর্শনী করেছি বা কিনেছি। লাইব্রেরিগুলো যেন জুলাইয়ের সবচেয়ে ভালো বইগুলো পায়, সেদিকে নজর রেখেছি। কেবলমাত্র এলামেলোভাবে পেপার কাটিং, শহীদের ভুলভাল তালিকাসম্বলিত বই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। আগের আওয়ামী আমলের মতো একটি পেপার কাটিংসম্বলিত একটি বইয়ের দাম ১৫,০০০টাকা, অনেক চাপ আসার পরেও সেই বই আমি নিতে বাধা দিয়েছি। আগে হাসিনার লেখা বই একেকটি ৭,০০০-৩০,০০০ টাকায় পর্যন্ত কিনেছে গ্রন্থকেন্দ্র। বিশেষ কোটায়। যে কোনো মূল্যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও মানহীন বইয়ের বিপক্ষে আমার অবস্থান ছিল। যেমন, একজন নারী মন্ত্রণালয় থেকে ফরওয়ার্ড করা একটি চিঠি হাতে এসেছিলেন তার জুলাই সম্পর্কিত বই নেয়ার জন্য। বইটির মধ্যে অসঙ্গতি, ভুল তথ্য, বাক্যেও চরম দুর্বলতা, তথ্যের ঘাটতি ইত্যাদির কারণে কমিটি বইটি নিতে চায়নি। আমি কখনোই চাইনি জুলাইয়ের স্পিরিট নিম্নমানের বই-ব্যবসার পিছনে নিভে যাক।

যা হোক, ফারুকী ভাই কথা বলা শুরু করেন, কোটা থাকুক। পরবর্তী সরকার এসে ব্যবহার করবে। এটা ওদের লাগবে।

আমি চমকে উঠি, ভাই, কী বলেন, কোটা কেন থাকবে, কোটার জন্যেই না...

আপনি বুঝতে পারছেন না, কোটা না থাকলে পরের সরকার অনুরোধের বইগুলো কীভাবে কিনবে? আর কত লাইব্রেরি অনুরোধ নিয়ে আসে জানেন

ভাই, আমরা কি পরবর্তী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এখানে এসেছি? আমাদের নিজেদের কোনো এজেন্ডা নাই? এই দেখেন আজকে আমি কীরকম বইগুলো পেয়েছি স্টকে। একটা ভালো সাহিত্য নাই। গবেষণা নাই। এদেশে গত চল্লিশ বছরে কত সাহিত্যিক, কবি, গবেষক গড়ে উঠেছে, তার কোনো ছাপ গ্রন্থকেন্দ্রে নাই। কোটাটা তুওে দেন, ভাই, আসিফ ভাই কিন্তু কোটা...

‘আহা আপনি এটাকে শুধু শুধু কোটা বলছেন কেন’, ফারুকী ভাই বিরক্ত হন।

এটা তো কোটাই। নীতিমালায় তো এটাকে কোটা বলা হয়েছে।

‘এটা হলো গিয়ে তাদের জন্য একটা সুবিধা। এটার থাকার দরকার আছে। আমার কাছে তো অনেক অনুরোধ আসে, আপনার কাছে আসে না?’ ফারুকী ভাই সচিব সাহেবের দিকে তাকান। সচিব সাহেব বলেন, ‘জি স্যার। অনেক অনুরোধ আসে।’ ফারুকী ভাই বলেন, ‘তাহলে? জিনিসটা তো ফ্লেক্সিবল রাখতে হবে। পরের সরকারে যারা আসবে তারা আমাকে জিজ্ঞেস করবে। এটা তুলে দিলে তখন আমি কী জবাব দেব? আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন আমি কোনো খারাপ বই কিনতে পারি? কোনো ভুয়া লাইব্রেরিতে টাকা পাঠাতে পারি?’

জি না। কিন্তু আপনি তো এখানে চিরকাল থাকবেন না। তাই আমি নীতিমালায় পরিবর্তনটা আনার কথা বলছি।

আপনিও তো থাকবেন না। গ্রন্থকেন্দ্রে যদি একজন খারাপ পরিচালক আসে? যদি যা খুশি বই কেনে?

সেটা তো একটা কমিটির মাধ্যমে হয়, পরিচালক চাইলেই পারবে না।

আর পরের সরকার এসে আবার নীতিমালা বদলাতে পারে না?

সেটা নিশ্চয় পারবে। কিন্তু আমরা কি আমাদের ছাপ রেখে যাব না?

ফারুকী ভাই হাত উপরে তুলে আঙুল বিস্তৃত করেন, শোনেন, আমরা যারা উপরে আছি, নতুন সরকার এসে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবে, আপনাকে তো জিজ্ঞেস করবে না।

সেধে এতটা অপমান নেওয়ার পরে আর কথা জুটছিল না আমার মুখে। তবে খুব বলতে ইচ্ছা করছিল যে, আপনি আর আমি এখানে কোটা আন্দোলনের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে এখানে এসেছি। আর এখন আপনি আমাকে কোটা থাকার যুক্তি বোঝাচ্ছেন? ঘরভরা এতগুলো লোকের সামনে ওভাবে বলতে সংকোচ হলো। এমনিতেই আমলাদের সামনে বসে থাকা দেবতার মতো একজন উপদেষ্টার সঙ্গে এতক্ষণ যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের জন্য ঘরের পরিবেশ থমথমে। প্রত্যেকের মুখ বিব্রত। মন্ত্রণালয়ে বিশটা মানুষের একটা মগজ হয়। উপরের পদের একজন ‘হ্যাঁ’ বললে বাকি ঊনিশ জনকে ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়। ভিন্নমতের কোনো চর্চা আমলাতন্ত্রের শিক্ষার মধ্যে নেই। ‘জি স্যার, হ্যাঁ স্যার’ ছাড়া কোনো কথা থাকতে পারে না। ওখানে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘স্যার’ সমার্থক শব্দ। প্রায়ই দেখতাম কেউ কোনো বাক্য ছাড়া কেবল ‘স্যার, স্যার স্যার, স্যার’ এভাবে উত্তর দিচ্ছেন। একজন উপসচিবকে একবার একজন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে কথা বলতে শুনে পরে বললাম, ‘আপনি তো জানেন ওমুক জিনিসটা এরকম হয়েছে, কিন্তু বললেন না যে?’ উনি হেসে জবাব দিলেন, ‘আমি তো শুধু ‘জি স্যার বলি।’    

যা হোক, ফারুকী ভাই একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘এক কাজ করেন, কোটা শব্দটা তুলে দেন। এটা তো ভালোর জন্য, ওটাকে অন্যভাবে বলেন।’

ঘরের মানুষগুলো তখন একটু নড়েচড়ে উঠলেন। ওটাকে কীভাবে বলা যেতে পারে এ নিয়ে আইডিয়া জেনারেশন শুরু হলো। ফারুকী ভাই বললেন, ‘মনে করেন সংরক্ষিত বা এরকম কিছু? কিন্তু এটা রাখতে হবে।’

কথা যেহেতু শেষ হয়ে গেল তাই আমি উঠব ভাবছি, এরই মধ্যে ফারুকী ভাইয়ের পিএস মুক্তাদির সাহেব এসে ইউনেস্কো থেকে দুজনের আসার কথা জানালেন। ফারুকী ভাই চমকে উঠে বললেন, ‘কখন এসেছেন?’

‘স্যার, অনেকক্ষণ হলো।’

ভীষণ বিরক্তসূচক মুখ বা অর্থহীন শব্দ করলেন তিনি, মুক্তাদির সাহেব কাচুমাচু হয়ে বললেন, ‘স্যার এনারা আগে এসেছিলেন তো...’ ফারুকী ভাই প্রচণ্ড বিরক্ত। উনাদের বসিয়ে রেখে আমাকে ডাকা আর এসব অনর্থক কথার জন্য সময় নষ্ট করার জন্য ফারুকী ভাই মুখ বিকৃত করলেন। অনেক বড় প্রতিষ্ঠানের লোক বসিয়ে রেখে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মতো ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের ততোধিক ক্ষুদ্র নীতিমালা নিয়ে আলাপ যে উনার কত সময় নষ্ট করেছে, প্রকাশিত ওই ভাবের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আমাকে অপরাধবোধে ভোগানোর চেষ্টা ছিল। অফিসারসহ উঠে চলে আসতে আসতে সালাম দিলেও উনি আমার দিকে আর লক্ষ করেন না। ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে আগের দুই থেকে তিনবারের দেখা-সাক্ষাৎও বলতে গেলে অনেকটা এভাবেই শেষ হয়েছিল।

একবার আন্তর্জাতিক বইমেলা, আগে গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে ১৫টি আসরের আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরে বোর্ড মিটিংয়ে আলাপ, এবং নতুন করে শুরু করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কয়েকবার মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানোর পর গিয়ে একবার উনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বইমেলা দেশের জন্য কত জরুরি আর সেই আয়োজন দিয়ে প্রকাশনা জগতের উৎকর্ষ সাধন কী করে হতে পারে, এসব নিয়ে আলাপে আমার খুব আগ্রহ ছিল। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে যুক্ত হবার পর থেকেই আমি এ নিয়ে কাজ করতে চাইতাম। সচিব সাহেবকে বোর্ড মিটিংয়ে সেটা বোঝানোর চেষ্টাও আমিসহ উপস্থিত প্রকাশক, শিক্ষক, লেখক করেছেন। আমি একটা পরিকলপনা বলেছিলাম যে কেবল বই বিক্রি নয়, নিজেদের সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বইকে অনুবাদ করিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রকাশনা থেকে প্রকাশের কাজটা আমাদের শুরু করা উচিত। আমি বলেছিলাম প্রকাশকদের ক্যাটালগ বানাতে অনুপ্রেরণা দেয়া, সেখান থেকে গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে একটা ক্যাটালগ প্রস্তুত, তারপর যদি অন্তত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা থেকে ১০ জন এজেন্টকে এনে একটা করে ট্রান্সেশন গ্র্যান্ট সরকারিভাবে দেয়া যায়, তাহলে বছরে দশটি বই ভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে বিশ্বের বাজারে উপস্থাপিত হতে পারে। আমাদের বই ভারতীয় কোনো অনুবাদকের মাধ্যমে অনুদিত হয়ে কেবল ভারত-বাংলাদেশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে, এটা কোনো কাজের কথা নয়। বরং ইউরোপ-আমেরিকা থেকে প্রকাশ হয়ে সেটা টার্গেট ল্যাঙ্গুয়েজ অনুযায়ী পাঠকের কাছে উপস্থাপিত হতে পারত। তখন বোঝা যেত আমাদের সাহিত্যের গভীরতা। বলেছিলাম বাইরের এজেন্টদের সঙ্গে এভাবে জানাশোনা হলে আমাদের প্রকাশকেরা ভারতীয় প্রকাশনার কাছে দ্বিতীয় দফায় গ্রন্থস্বত্ত্ব না কিনে সরাসরি প্রকৃত প্রকাশকের কাছে গ্রন্থস্বত্ত্ব কিনতে পারত। প্রকাশনা শিল্পের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আমাদের সাহিত্যকে যেমন বাইরে নিয়ে যেত, তার ফলশ্রুতিতে দেশীয় প্রকাশনার ক্ষেত্রেও গুণগত পরিবর্তন আসত।

এর মাঝে অবশ্য অনেক ধাপ আছে, এবং সরকারের ইচ্ছা থাকলে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে সেসব কার্যক্রম হাতে নেয়া সম্ভব হতো। একদিকে বই বিক্রি, অন্যদিকে অনুবাদ স্বত্ত্ব বিক্রি ও দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের এক সমগ্র চিন্তা থেকে আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের সম্ভাবনাকে আমি আলোচনায় আনতে চাচ্ছিলাম বারবার। দেশ-বিদেশের লেখক-প্রকাশক-এজেন্টদের উপস্থিতিতে কিছু সেমিনারসহ আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন মন্ত্রণালয় ও দেশের জন্য কতটা সুফল ও পরিচিতি আনতে পারে সে বিষয়টি ফারুকী ভাইকে বোঝানোর ইচ্ছা ছিল আমার। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে যে মানুষটি অনেক বোঝেন তিনি বিষয়টিকে সহজে হৃদয়াঙ্গম করবেন, এমনটাই ধারণা করেছিলাম।  

কিন্তু আমি যখন তাঁর কাছে এসবের একটু ব্যাখ্যা দিলাম, তিনি বললেন, ‘এত কিছু করে বইয়ের অনুবাদ করতে হবে নাকি? মেইল করলেই তো বইয়ের অনুবাদক পাওয়া যায়।’ আমি বললাম, ‘সেটা কীভাবে?’ তিনি বললেন, ‘ওই যে ফাহাম আব্দুস সালামের বইটা? মেইলে যোগাযোগ করেই তো অনুবাদক পেয়ে গেছে।’ আমি বিনয়ের সাথে বললাম, ‘ভাই, রাজনৈতিক হাইপের বই তো সেভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে যেতেই পারে, কিন্তু চাইলেই কি ‘চিলেকোঠার সেপাই’, ‘যে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ কিংবা ‘জীবন আমার বোন’ পেঙ্গুইন থেকে অনুবাদ হয়ে প্রকাশ হতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘চেষ্টা করে দেখেন না!’

আলাপ শেষ। একটা আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যে কোনো একটি অনুষ্ঠানের খরচের চেয়ে কম বা একইরকম। অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছিল মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে। বলতে গেলে মন্ত্রণালয় নিজেই একটি দপ্তরের মতো কাজ করছিল। তবে অধীনস্ত দপ্তর-সংস্থা হিসেবে গ্রন্থকেন্দ্রের উন্নয়ন বা পলিসি লেভেলে কাজ করার কোনো উৎসাহ আমি লক্ষ করিনি। গ্রন্থকেন্দ্রের একেকটা ফাইল দুই থেকে আড়াই মাস করে পড়ে থাকত। বিভিন্ন কার্যক্রমের কমিটি অনুমোদন নেয়ার দেরি হতো বলে অর্থবছরের মধ্যে সব কার্যক্রম শেষ করা এবং সময়ের কাজটা সময়ের মধ্যে ধরতে নাভিশ্বাস উঠে যেত। দীর্ঘসূত্রতার জন্য অফিসারদের রাত দশটা অবধিও অফিসে থাকেতে হতো প্রায়ই। তারপরেও নতুন কিছু করতে হবে, সংষ্কার করতে হবে, এই চিন্তা আমাদের মাথা থেকে কখনো যায়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলো উপদেষ্টা বা সচিব কখনো আমাদের ডেকে জানতে চাননি যে, গ্রন্থকেন্দ্রের আসলে কাজটা কী বলেন তো? গ্রন্থকেন্দ্র নিয়ে কী কী করা যেতে পারে? কীভাবে এই প্রতিষ্ঠান মানুষের উপকারে আসতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা অফিসে বসে বহুবার আলাপে আলাপে মুখস্ত করেছি, কিন্তু কেউ কোনোদিন আমাদের জিজ্ঞেস করেননি। হয়ত তারা আমাদের কাছে কেবল রুটিন কাজই চাইতেন। এরকম প্রতিষ্ঠানে সকালে অফিসে গিয়ে কোনোরকমে কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেও বলার কেউ নেই। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে কাজের যে বিপুল স্পৃহা আমি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের মধ্যে দেখেছি, মন্ত্রণালয় তা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ছিল নিজেদের অর্জন আর সুনাম নিয়ে ব্যস্ত, অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রন্থকেন্দ্রকে কার্যকর করার বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা পরিকল্পনা ছিল না।

(চলবে)

১৫৭ পঠিত ... ১৬:১৮, জানুয়ারি ২৪, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top