কল্যাণরাষ্ট্রের আকাংক্ষা আর আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিকশিত হবার আকাংক্ষা; জেনজিকে আগের প্রজন্মগুলো থেকে আলাদা করেছে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর যারা শিক্ষিত হলেন; তাদের রাষ্ট্রের আকাংক্ষা ছিলো; কিন্তু কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণাটা তাদের কাছে স্পষ্ট ছিলো না। তাদের জাতি গঠনের স্বপ্ন ছিল; কিন্তু আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনের ব্যাপারটা তারা কল্পনা করতে পারেননি। শিক্ষিতদের আকৃষ্ট করেছে বৃটিশ সাহেবদের ঠাঁটবাট, হিন্দু জমিদারদের খেলনা আভিজাত্যের অহম। ফলে শিক্ষিতরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। পূর্ববাংলার স্বশিক্ষিত নীরব জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আকাংক্ষা তাই গুরুত্ব পায়নি শিক্ষিতদের কাছে।
বৃটিশের চাকরি করে ও পরে পাকিস্তানের চাকরি করে কল্পনার সাহেব ও জমিদারের খেলনা আভিজাত্য অর্জনের পেছনে ছুটেছে পূর্ব বাংলার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। ১৯৪৭ সালে বৃটিশের কাছ থেকে পাওয়া স্বাধীনতা তাই অর্থবহ হতে পারেনি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকশিত হয়; ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত চূড়ান্ত স্বাধীনতার পরেও সেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিবেশী ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঠেকাতে পারেনি। ফলে ভারত ছায়া উপনিবেশ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। আর শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবনে স্বাধীনতা যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, তা স্বশিক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অধিকার বঞ্চিতদের জীবনে আনেনি।
শিক্ষিত মানুষের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাষ্ট্রের এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। ফলে বৃটিশ রাজকে নিয়ে কবিতা রচনা, পাকিস্তান রাজকে নিয়ে কবিতা রচনার পর, স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা রচনা পুরোদমে চলেছে শিক্ষিত লোকেদের কলমে। সবসময়েই এই স্তবসংকীর্তন রচনা করেছে যারা; তাদের পূর্ব বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তেমন জানাশোনা নেই। তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য পাঠ ঊনিশ শতকের বৃটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় বেঙ্গল রেনেসাঁর কবি সাহিত্যিকদের চিন্তাজগত উতসারিত; যে চিন্তাজগতে পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা বাঙ্গালিই নয়।
ফলে নিজেকে বাঙালি প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠে বাংলাদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। বেঙ্গল রেনেসাঁর সংজ্ঞা অনুসারে একজন হিন্দু তার ধর্মচর্চা করেও বাঙালি হতে পারে; কিন্তু একজন মুসলমানকে বাঙালি হতে গেলে নিজেকে ধর্ম নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে হবে। জন্মাষ্টমীর মিছিলে কপালে চন্দন চর্চিত হয়ে অংশ নিলে একজন হিন্দু প্রগতিশীল থাকতে পারছেন; কিন্তু ঈদে মিলাদুন্নবীর মিছিলে টুপি পরে অংশ নিলে একজন মুসলমান তার বাঙালি সনদ হারাচ্ছেন। এরকম কালচারাল হেজিমনির কারণে বাংলাদেশে ইসলাম আত্মপরিচয় আঁকড়ে ধরার প্রবণতা বেড়েছে।
এই সুবর্ণ সুযোগটি গ্রহণ করেছে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী জামায়াতে ইসলামি। লক্ষ্য করুন, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্কে জামায়াতের কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু কোথাও তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি গড়ে ওঠেনি। যে জামায়াতের সদর দপ্তর লাহোরে; সেই পাঞ্জাবে তাদের কোন ভোট ব্যাংক নেই। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে একটি দুটি আসন পাওয়াই তাদের জন্য কষ্টকর। যেহেতু মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কে প্রতিবেশী কোন দেশের কালচারাল হেজিমনি নেই; তাই আত্মপরিচয়ের সংকটে জামায়াত ইসলামকে আঁকড়ে ধরার কোন প্রবণতা সেখানে নেই।
বাংলাদেশ রাজনীতির আরেকটি সংকটের জায়গা কটুক্তি ও ভাবমূর্তি রক্ষার কোন্দল। আমার ধারণা দীর্ঘ নিপীড়নের ইতিহাস লোকজনের মুখের আগল কেড়ে নিয়েছে। ফলে মুখে যা এলো তা বলে দিতে কোন সংকোচ নেই কারো। সাম্প্রতিক সময়ে একজন বাউল তার কবি গানের সময়ে আল্লাহ সম্পর্কে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেন; অমনি আল্লাহ'র ম্যানেজাররা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবার একটি টকশোতে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলেন একজন জামায়াত নেতা; অমনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যানেজারেরা। রোকেয়া দিবসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বেগম রোকেয়া সম্পর্কে আপত্তিকর কথা লেখেন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে। অমনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন রোকেয়ার ম্যানেজারেরা। এইভাবে ইসলাম ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার ম্যানেজারি ভাগ করে নিয়েছে দুই দল লোক। এদের পোশাক-আশাকে পার্থক্য থাকলেও ম্যানেজারির ক্ষেত্রে একই রকমের পশ্চাদপদ চিন্তা।
আল্লাহ ও রসুলের গোটা বিশ্বে যে প্রভাব তাতে বাংলাদেশের কয়েকজন মুসলমানের তার ভাবমূর্তি পাহারা দেবার দরকার নেই। বৃটিশ বিরোধী মুক্তি সংগ্রাম ও পাকিস্তান বিরোধী মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর যে সক্রিয়তা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি সেখানে তার ভাবমূর্তির ম্যানেজার হিসেবে কয়েকজন ধর্ম নিরপেক্ষ লোক দরকার নেই। নারী জাগরণের প্রতীক হিসেবে বেগম রোকেয়ার যে সুকৃতি তাতে মালিন্য আসবে না কখনোই। কাজেই রোকেয়ার ভাবমূর্তির ম্যানেজার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশের বুমারস, জেনেক্স আর মিলেনিয়ালরা এই বিমূর্ত ভাবমূর্তি রক্ষার রাজনীতি করে সমাজে প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা করে। সবচেয়ে মুশকিলের বিষয় হচ্ছে; এরা জেনজি'দের কাউকে কাউকে কোলে নিয়ে ব্যাপ্টিজম করে ভাবমূর্তি পাহারা দেয়া শেখায়। তাদের বস্তাপচা অভিধান থেকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার ভাষাগুলো শেখায়। জেনজি'রা যদি পুরোনো বন্দোবস্তের এইসব ভাবমূর্তি পাহারাদারদের সঙ্গনিরোধ না করতে পারে; তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছর যেভাবে নষ্ট হয়েছে বিমূর্ত সব কলহে; আগামী ৫০ বছর ধরে ঠিক তা-ই ঘটবে। ফলে কল্যাণরাষ্ট্র ও আত্মমর্যাদাশীল জাতিগঠনের প্রশ্নটি অধরা রয়ে যাবে।
গত ৫৪ বছরে কোটি কোটি মানুষ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছে; ইসলামের ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রাণপাত করেছে; ৫৪ বছরে কোটি কোটি মানুষ শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে দেশপ্রেম রক্ষায় সচেষ্ট হয়েছে; কিন্তু সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের সমাজ কি আমরা পেয়েছি। ধর্মপ্রেম ও দেশপ্রেমের ঝান্ডা উড়িয়ে পদ-পদবী-পদক, চাঁদাবাজি, ব্যাংক-ব্যবসা, দেশলুন্ঠন ও সম্পদ পাচারের মাঝ দিয়ে দেশটাকে বৈষম্যের আর নিপীড়নের বিষাদসিন্ধু করে ফেলেছে। কাজেই এসব লিপসার্ভিসে আর দেশের মানুষ আকৃষ্ট হবে, এ বড্ড দুরাশা। ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সেটেলড ব্যাপারগুলো নিয়ে অযথা বিতর্ক তুলে কেউ-ই কোথাও পৌঁছাতে পারবে না।
বাংলাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যে জমিদারী প্রথা প্রচলিত হয়েছে রাজনীতি-ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চার নামে; ঐ বন্দোবস্তের গজদন্তের মিনার গুঁড়িয়ে দিয়ে সার্বভৌমত্ব, বৈষম্যহীন সমাজ, আইনের শাসন, মানবাধিকার, নাগরিকের মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে; বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ আর জুলাই বিপ্লবে যারা প্রাণ দিয়েছেন; তাদের প্রতি অমর্যাদা করা হয়। পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হবার পর থেকে যে জনগোষ্ঠী স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জনের স্বপ্ন দেখেছে; সে স্বাধীনতার অর্থ দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনে অনুদিত হতে দেখতে চেয়েছে; সেই স্বপ্ন ও আকাংক্ষাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে দেশের জুলাই প্রজন্ম। আমি তাদেরকেই বাংলাদেশ সংকল্পের শেষ সম্ভাবনা বলে মনে করি।



পাঠকের মন্তব্য