২০০৯ সালে ফেসবুকে যারা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে জাস্টিফিকেশন লীগ গড়ে তুলেছিল; তারাই ক্রমান্বয়ে দলটিকে ফ্যাসিস্টের রুপ দিয়েছিল। শুধু আওয়ামী লীগের ভূমি বাস্তবতার পুরোনো নেতা-কর্মীরা দলটির সঙ্গে থাকলে দলটি এভাবে গণঘৃণার মুখে পড়ত না। কারণ যারা তৃণমূলের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করেন; তারা মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে জানেন। কিন্তু ফেসবুকের ভূইফোঁড় আওয়ামী লীগ জানতো মানুষকে কিভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে হয়; তাদের তৈরি করা গণ আক্রোশ দলটিকে নিশ্চিহ্ন করেছে।
বিএনপি ২০০১-০৬ সুশাসন দিতে ব্যর্থ হলেও; বিএনপির নেতা মির্জা ফখরুল, রুহুল কবির রিজভী, নজরুল ইসলাম খান, মঈন খানের মতো নেতারা আওয়ামী লীগের নির্যাতন সয়েও তাদের শিষ্ট আচরণ ও পলিটিক্যালি কারেক্ট কথাবার্তার কারণে দলটি জনসমর্থন ফিরে পেয়েছিল। আমরা সাধারণ মানুষ বিএনপির কর্মীদের ক্রসফায়ার, গুম, নির্যাতন, কারারুদ্ধ হবার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির পাশে দাঁড়িয়েছি।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শক্তি হিসেবে ধরে নেয়া হয়; সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-কালচারাল উইং-এর অন্ধ সমর্থন। কিন্তু এখন বোঝা যায় ঐ সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-কালচারাল উইং-এর জনমানুষকে তুচ্ছ করে কথা বলার প্রবণতা আওয়ামী লীগকে সমাজচ্যুত করেছে। বিএনপির জনপ্রিয়তার মূল কারণ এর কোন সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-কালচারাল উইং নেই।
সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-কালচারাল উইং-ফেসবুক এক্টিভিস্ট; এরা আসলে ‘জাতে ওঠার’ চেষ্টায় প্রাণান্ত একদল লোক। ফর্সা জামাকাপড় পরেছে; কুঁড়ে ঘর থেকে দালানে উঠেছে; দুটি বইপুস্তক পড়েছে; দুটি কবিতার লাইন উদ্ধৃত করতে শিখেছে; অমনি তারা নিজেদের ব্রাহ্মণ দাবি করে দেশের জনগণকে নিম্নবর্গের মানুষ ঠাউরে তাদেরকে তুচ্ছ করতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ ও বামের একাংশের সমর্থক এই রকমের লোক যে কোন রাজনৈতিক দলের জন্য অভিশাপ। কারণ মানুষকে মর্যাদা না দিলে কখনো মর্যাদাবান হওয়া যায় না।
অনেককেই বলতে শুনতাম, বিএনপির বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল উইং নাই; তাই সে ন্যারেটিভ নির্মাণে লীগের থেকে পিছিয়ে পড়ে। তা আওয়ামী লীগ কি এমন ন্যারেটিভ নির্মাণ করেছে যা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়নি। যাদের মাথায় সাম্য চিন্তা, মানবিক মর্যাদার কমনসেন্স নাই; সে আবার কি করে ন্যারেটিভ নির্মাণ করবে!
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কবর রচিত হলে; বিএনপি অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল হিসেবে রয়ে যায়। তখন সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-কালচারাল উইং; যারা ফেসবুকে ও ইউটিউবে হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছে; তারা জুলাই বিপ্লবের সুফল কুড়াতে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানকে ইমপ্রেস করতে নাচানাচি শুরু করে। বিএনপির দরোজায় কড়া নেড়ে বলতে থাকে, আমাকে নেবে ভাই বিএনপির সেবায়; আমি এক্সেল-মিডিয়াম ও স্মল সাইজের ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারি। বলাই বাহুল্য এই বিএনপি হতে চাওয়া বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল উইং-এর সেই একই জাতে ওঠার ব্রাহ্মণ রোগ। সে সাধারণ মানুষকে বাঙ্গু, ছাপড়ি ইত্যাদি বলে জ্ঞান দিতে চেষ্টা করে। ৫ অগাস্টের পর প্রায় এগারো মাসে বিএনপির নব্য বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল উইং সাধারণ মানুষকে অসম্মান করে বিএনপি ক্ষমতায় যাবার আগেই পতনের ব্যবস্থা করেছে।
আওয়ামী লীগের সহিংস ক্যাডারেরা নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করলে; তাদের বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল উইং যেভাবে জাস্টিফিকেশন দিত, একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হত্যার কথা কি ভুলে গেলেন! বিএনপির নতুন বুদ্ধিজীবীরাও দেখলাম বিএনপির ক্যাডারের হত্যাযজ্ঞের জাস্টিফিকেশন দিতে আওয়ামী লীগ-জামায়াতের অপরাধের ফর্দ নিয়ে হাজির হয়েছে। আবার স্টেপ ডাউন ইউনুসও বলছে। এতোদিকে বুমেরাং ছুঁড়ছে যে তা ফিরে এসে নিজেদের মুখেই লাগছে। লীগের সিপি গ্যাং যেরকম সমালোচকদের গালাগালি করতো, বিএনপির নব্য বিপি গ্যাং সেভাবে সমালোচকদের গালাগাল করছে। তার মানে আওয়ামী লীগের কলতলার মহাকাব্য পাঠ শেষে শুরু হলো বিএনপির কলতলার নতুন মহাকাব্য পাঠ।
আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য, গণিমতের মাল বিএনপির সাম্রাজ্য ও গণিমতের মাল হয়ে উঠেছে ৫ অগাস্ট ২০২৪ বিকেল থেকে। বিএনপি কিছু চাঁদাবাজ ও খুনি দল থেকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু তবুও থামানো যায়নি ১৭ বছর চাঁদাবাজি থেকে দূরে থেকে শুকিয়ে যাওয়া লোভী পাকস্থলীগুলোকে।
আবার পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল মেধার ভিত্তিতে পদায়নের সুযোগ তো নেই। আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত শিরোনামে বিএনপির সমর্থকদের গুরুত্বপূর্ণ এসব দায়িত্বে অনেক পদায়ন হয়েছে। ফলে বিএনপির অপরাধীদের ব্যাপারে শৈথিল্য দেখিয়ে দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে সে মহাজনেরা। আর এখন বিএনপির ফেসবুক বিবেকেরা এসে বলছে, হে ইন্টেরিম আপনি ব্যর্থ হয়েছেন আইন শৃংখলা রক্ষায়।
বাংলাদেশের মানুষের মতো দুর্ভাগ্য আর কার; বৃটিশ নিপীড়ন করেছে, বৃটিশের তাঁবেদার হিন্দু জমিদারেরা শোষণ নির্যাতন করেছে, পাকিস্তানি শাসকেরা নির্মম নিগ্রহ চালিয়েছে; স্বাধীন বাংলাদেশে পালা করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্যাডারেরা অকথ্য নির্যাতন করে চলেছে; আর ভারতীয় আগ্রাসনের নির্যাতন তো খাঁড়ার মতো ঝুলে রয়েছে। লাইফ অফ পাইয়ের মতো জলে কুমির ও ডাঙায় বাঘ।
পরাধীনতার শৃংখল ছিঁড়তে এত রক্ত এত ত্যাগ আর কোনো দেশের ইতিহাসে ঘটেছে বলে মনে হয় না। মানুষ রক্ত দিয়ে এক একটা পরিবর্তন ঘটায় আর নতুন একদল রাক্ষস এসে পড়ে লোকালয়ে।
আর অন্ধ অক্ষম লোমওঠা বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক কালচারাল উইং-এর নেকড়েরা সে রাক্ষসের স্তুতি গায়, রাক্ষসবৃত্তির জাস্টিফিকেশন দেয়; রাক্ষসনীতিকে রাজনীতি বলে সম্মানিত করে। শঠতার শব্দ ও বাক্য দিয়ে মিথ্যার প্রাসাদ গড়ে।
এতোটা নৈরাশ্যের জায়গায় এ লেখাটা শেষ করতে চাই না। জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের জনমানুষের মনোজগতে চিরস্থায়ী এক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এ বিপ্লবের কেবল শুরু হয়েছে গত বছর; শাসক-শোষক-পরিতোষক-স্থূল সৌন্দর্য্য ধারক ক্যানিবালদের বিরুদ্ধে পরাজিত মেঘদলের এই বিপ্লব। শোষণের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তী নিয়ে যেসব দেশ ডাকাত ও রক্তপায়ীর দেশ লুন্ঠন ও ভয়ের রাজ্য কায়েম করে শোষণ নির্যাতন চালিয়ে যাবার ক্যানিবালিজম; এর অবসান না ঘটানো পর্যন্ত জুলাই বিপ্লব শেষ হবে না। পরাজিত থেকে যাবার জন্য বাংলাদেশের মানুষের জন্ম হয়নি। বাঁচার অধিকার সে জিতে নেবেই।



পাঠকের মন্তব্য