লেখা: আরিফ রহমান
প্রতিবছর মহররম মাসের দশ তারিখ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম বিশ্বের ২৫ কোটির বেশি মানুষ এক শোকমিছিল বের করে, যা ‘তাজিয়া মিছিল’ নামে পরিচিত। তারা নিজেদের ‘শিয়াতুল আলী’ বা ‘আলীর অনুসারী দল’ হিসেবে পরিচয় দেয়। আজকের রক্ষণশীল সালাফি মতাদর্শীরা এই চর্চাকে কেবল বিদআত বা হারাম বলেই ক্ষান্ত হয় না, সুযোগ পেলে শিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম আখ্যা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।
কিন্তু কেন এই মিছিল? এর পেছনের ইতিহাস কী? আর কেনই বা একে দমনের এত চেষ্টা?
এই তাজিয়া মিছিলে কিছু প্রতীকী মোটিফ বা স্মৃতিচিহ্ন ঘুরেফিরে আসে, যা কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে তোলে। এর মধ্যে একটি অন্যতম মর্মস্পর্শী মোটিফ হলো বিবি সখিনার বিয়ের পালকি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৬১ হিজরির কারবালা প্রান্তরে। নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা, নারী-শিশুসহ মোট ৭২ জন, ফোরাত নদীর তীরে অবরুদ্ধ। তাঁদের অবরোধ করে রেখেছে উমাইয়া খলিফা এজিদের বিশাল সেনাবাহিনী। উদ্দেশ্য—একটাই। এজিদের স্বৈরাচারী শাসনের প্রতি ইমাম হোসাইনের আনুগত্য আদায় করা, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এই প্রত্যাখ্যানের শাস্তি হিসেবে ফোরাতের পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেন নবীর বংশধরেরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন বা মৃত্যুবরণ করেন। দশ দিন ধরে চলা এই অবরোধে পানির জন্য শিশুদের হাহাকার আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছিল। শিয়ারা এই দশ দিনের নারকীয় যন্ত্রণা ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই আশুরা পালন করে।
ক্ষমতালোভী খিলাফতের এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইনের সপরিবারে শাহাদাত বরণ ছিল এক সচেতন সিদ্ধান্ত। তিনি জানতেন, সংখ্যা বা অস্ত্রে এজিদের বাহিনীর সাথে পেরে ওঠা অসম্ভব। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন তাঁর এই আত্মত্যাগ যেন ইতিহাসের পাতায় এক চিরস্থায়ী ‘সাক্ষ্য’ বা ‘শাহাদাত’ হয়ে থাকে।
তিনি বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিলেন, কীভাবে ইসলাম ও নবীর আদর্শের নামে ক্ষমতা দখলকারী তথাকথিত খলিফা ও তাদের অনুসারীরা নবীরই রক্তসম্পর্কের মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে। আরবিতে ‘শাহাদাত’ শব্দের অর্থ সাক্ষ্য দেওয়া এবং শহীদ হওয়া—দুটোই। কারবালার পর থেকে এই দুটি অর্থ এক হয়ে গেছে। শহীদ তিনিই, যিনি নিজের জীবন দিয়ে সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেন।
এই বিভীষিকাময় অবরোধের মধ্যেই একটি বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ইমাম হোসাইনের কন্যা বিবি সখিনার (অনেক বর্ণনামতে ফাতেমা কুবরা) সাথে তাঁর চাচাতো ভাই, ইমাম হাসানের পুত্র কাসিমের বিয়ে দেওয়া হয়। সেই বিয়েতে কোনো উৎসব ছিল না, ছিল না কোনো আনন্দ বা দাম্পত্য মিলনের সুযোগ।
তৃষ্ণার্ত, মৃত্যুপথযাত্রী কাসিম বিয়ের পরপরই চাচা ইমাম হোসাইনের কাছে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার অনুমতি চান। অনুমতি পেয়ে নববিবাহিত কাসিম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বীরের মতো যুদ্ধ করে শহীদ হন।
সখিনার পালকি তাই শুধু একটি পালকি নয়; এটি এক বিয়োগান্তক প্রেমের সাক্ষী, এক মুহূর্তের জন্য ফুটে ঝরে যাওয়া একটি স্বপ্নের প্রতীক। এটি সেই ইতিহাসের চিহ্ন, যা মনে করিয়ে দেয়, কারবালায় শুধু যোদ্ধারাই নন, নববধূর সিঁথির সিঁদুরও রক্তের বন্যায় ভেসে গিয়েছিল।
একইভাবে তাজিয়ায় ব্যবহৃত দুলদুল ঘোড়াটিও কেবল একটি ঘোড়া নয়। এটি ইমাম হোসাইনের বাহন জুলজানাহ-এর প্রতীক। এই ঘোড়াটিই ইমামের একাকী, রক্তাক্ত দেহের পাশে দাঁড়িয়ে হ্রেষারব করে তাঁর শাহাদাতের খবর শিবিরে পৌঁছে দিয়েছিল। এই ঘোড়া নবীর বংশের রক্তের সাক্ষী, জুলুমের বিরুদ্ধে অন্তিম লড়াইয়ের সাক্ষী।
কিন্তু কেন এই ইতিহাসকে মুছে ফেলার এত চেষ্টা?
কারণটা রাজনৈতিক। উমাইয়া এবং পরবর্তী আব্বাসীয় শাসকেরা, যারা নিজেদের ‘সুন্নি’ ইসলামের ধারক-বাহক বলে দাবি করত, তাদের শাসন দাঁড়িয়েছিল এই রক্তের ওপর। নবীর পরিবারকে হত্যার দায় কাঁধে নিয়ে শাসন করা কঠিন। তাই তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কারবালার ইতিহাসকে বিকৃত করতে শুরু করে।
ইমাম হোসাইন ও তাঁর সঙ্গীদের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়, আর এজিদের শাসনকে ‘বৈধ’ প্রমাণের চেষ্টা চলে। সেই সময় মসজিদের মিম্বর থেকে নবীর আরেক প্রিয় সাহাবী ও জামাতা হযরত আলীকে অভিসম্পাত দেওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক প্রথাও চালু করেছিল উমাইয়ারা।
এই ইতিহাসকে লঘু করা, বাতিল করা বা বিকৃত করার রাজনীতি মানে নিজেদের পূর্বসূরিদের হাতের রক্তের দাগ ঢাকার মরিয়া চেষ্টা।
আজ যখন সুন্নি বা সালাফি আলেমরা তাজিয়া মিছিলকে ‘হারাম’ বা ‘বিদআত’ (ধর্মের নামে নতুন উদ্ভাবন) বলে ফতোয়া দেন, তখন তারা মূলত সেই ১৪০০ বছরের পুরনো রাজনৈতিক এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করেন। তারা বলেন, পালকি, ঘোড়া বা নিশান নিয়ে শোক প্রকাশ ইসলামে নেই। কিন্তু তারা ভুলে যান বা স্বীকার করতে চান না যে, এই মোটিফগুলো নিছক কোনো ধর্মীয় আচার নয়, বরং এগুলো এক জীবন্ত প্রতিবাদ, এক চলমান শোকগাথা।
এগুলো ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়ের বিরুদ্ধে শৈল্পিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াইকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই যে ১৪০০ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গণহত্যা আর ক্রমাগত ‘কাফের’ ফতোয়ার পরেও শিয়া মুসলমানরা তাজিয়াকে টিকিয়ে রেখেছে, এর কারণ হল— স্মৃতি। কারণ হল এই সিম্বল। কারণ হল এই মোটিফ।
এবার আমাদের সমসাময়িক বাস্তবতায় আসা যাক। এই যে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত পেঁচা, হাতি বা বিভিন্ন লোকজ মোটিফ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষের এত আপত্তি, এত চুলকানি—এর পেছনের মনস্তত্ত্বও হুবহু এক। আপনারা এসব মোটিফকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে দাগিয়ে দিয়ে আসলে হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে দমন করতে চান।
এই মনস্তত্ত্বের লক্ষ্য একটি একক, আরোপিত আরব-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া, যা এই বাংলার প্রকৃত ইতিহাস ও শেকড়কে অস্বীকার করে।
ঠিক যেমন তাজিয়ার পালকিকে একটি নিছক পালকি হিসেবে দেখিয়ে তার পেছনের রক্তের ইতিহাসকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়, তেমনি মঙ্গল শোভাযাত্রার পেঁচাকে কেবল একটি পাখি বা মূর্তি হিসেবে দেখিয়ে তার পেছনে ফ্যাসিবাদি শক্তির বিনাশ ও মঙ্গলের বার্তার প্রতীকী তাৎপর্যকে অস্বীকার করা হয়। দুটো ক্ষেত্রেই কৌশল এক—প্রতীককে তার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে ধর্মীয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করা।
কিন্তু আমাদের সামনে তাজিয়ার অভিজ্ঞতা আছে। আমরা জানি, সিম্বল মরে না, স্মৃতি মুছে যায় না।
১৪০০ বছর ধরে নবীর বংশধরদের খুনে রঞ্জিত শাসকের উত্তরসূরিরা যেমন তাজিয়াকে মুছে দিতে পারেনি, তেমনি আজকের এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদীরাও বাংলার শেকড়ের সংস্কৃতিকে মুছে ফেলতে পারবে না।
কারণ ইতিহাস কেবল বিজয়ীর কলমে লেখা হয় না; শহীদের রক্তেও লেখা হয়। আর সেই রক্তের দাগ এত সহজে শুকায় না।



পাঠকের মন্তব্য