যে কারণে ডাক্তারি পড়ে সময় ও মেধা নষ্ট করবেন না

১২২ পঠিত ... ১৭:৩৮, জুন ২২, ২০২৫

লেখা: সাজিদ বিন আজাদ 

ক্যারিয়ার সম্পর্কিত, বিশেষ করে ডাক্তারি সম্পর্কিত কথাবার্তা লিখি না আমি। কিন্তু যেহেতু আমি বাংলাদেশের ঢাকাস্থ একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়েছি, আমাকে প্রায়শই এই টপিক নিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কথা বলতে হয়। বিশেষ করে মফস্বলে গেলে। সুতরাং আমি কয়েকটা সিরিজ লেখাতে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যক্তিগত অভিমত তুলে ধরবো এই ইন্ডাস্ট্রি ঘিরে।

১. ডাক্তারি কোনো মানবসেবা না। এটাকে বিদেশে হেলথকেয়ার ইন্ডাস্ট্রি বলা হয়। বঙ্গদেশের মানুষ পেশাকে চ্যারিটি বানাতে ওস্তাদ, তাই তারা এসব গালভরা নামে ডাকে। এই প্রচলিত শব্দটি আমাদের বাচ্চাকাচ্চাদের মাথায় ঢুকে যায়, এবং তারাও মনে করা শুরু করে যে ডাক্তারি পড়লে দুটো বিষয় চ্যালচ্যালিয়ে নিশ্চিত:

টাকা

বেহেশত

দুটোই একটা ভাঁওতাবাজি। সুতরাং এসব প্রিফিক্সড নোশন বা সমাজের চাপিয়ে দেওয়া ভাঁওতাবাজি কনসেপ্ট মাথা থেকে দূর করে ফেলতে হবে।

যারা ডাক্তারি পড়তে চাও খুব শখ করে, তাদেরকে তাই "মানবসেবা করতেছি" এই ধরণের কুসুম কুসুম ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তুমি বরং পেশাদার হবার চেষ্টা করবে। সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের বাইপ্রোডাক্টই হচ্ছে মানবসেবা।

দুনিয়াতে সব পেশার আন্তরিক মানুষই মূলত মানবসেবক। একটা মুদি দোকানিও মানবসেবা করে। এখানে ডাক্তারদের কোনো সুপিরিয়রিটি নাই।

এ ধরণের সুপিরিয়রিটি মানুষ হিসেবে তোমাকে অহংকারী, অতৃপ্ত ও দিনশেষে হতাশই করবে।

 

২. "ডাক্তাররা সর্বোচ্চ মেধাবী"—এই বহুল প্রচলিত বাক্যটা মূলত একটি বহুল প্রচলিত মিথ্যা। আমি আশপাশে যত ছোটোবড়ো ডাক্তার দেখেছি, অধিকাংশই আঁতেল, পড়ুয়া

কিন্তু হাতেগোণা দুই-চারজন ঐ অর্থে মেধাবী। পড়ুয়া, প্রখর স্মৃতিশক্তি—এসব মেধার নগণ্য মাপকাঠি।

ইউনিভার্সিটিতে পড়া অধিকাংশ ছেলেমেয়েই ডাক্তারি পড়া ছেলে মেয়েদের থেকে 'জ্ঞানী', চৌকস, রুচিশীল ও ভার্সেটাইল। আমার পরিচিত অধিকাংশ ডাক্তার বোকাচোদা ধরণের, রসকষহীন ও কূপমণ্ডূক।

দুনিয়ার সমস্ত আনফানি চিপায় থাকা গান্ডু-কিসিমের পোলাপানের কেন্দ্রীয় প্রবণতা কেন জানি মেডিকেল কলেজের দিকে।

আমিও তাদের মধ্যে একজন। সুতরাং তুমি এ ধরণের কেউ হয়ে থাকলে তোমার অবশ্যই উচিত হবে টেবিলে পশ্চাৎদেশ ঘষতে ঘষতে ডাক্তারি নামক অখাদ্য অপাচ্য বস্তুটি পড়া।

এবং সারাজীবন সেটা জনসাধারণের সামনে উগরাতে থাকা।

 

৩. সত্তর-আশির দশকের ডাক্তারি পড়ার চিত্র আর এখনকার চিত্র একেবারেই আলাদা। হুমায়ূনের উপন্যাসের ডাক্তার আর বর্তমানের ডাক্তারের মধ্যে বহুত তফাৎ। এ ধরণের রোমান্টিক চিন্তা নিয়ে এদিকে ভুলেও পা বাড়াবে না।

বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের এমবিবিএস-এর মান এখন খুবই সস্তা ধরণের। তুমি ফেসবুকে যেসব দেখো, ডাক্তারি পড়তে পড়তে একেকজনের পাছার রগ ছিঁড়ে যাচ্ছে—ওসব পুরোপুরি সত্যি না। শুধু পাছার রগ ছেঁড়া অংশটাই সত্যি। মান্ধাতার আমলের কারিকুলাম দিয়ে রগড়ে রগড়ে চলা একটা সিস্টেম হচ্ছে বাংলাদেশের এমবিবিএস।

বরং তোমার পূর্ব-অর্জিত জ্ঞান ও বুদ্ধি দুটোই ভয়াবহভাবে কমে যাবার সম্ভাবনা আছে, ডাক্তারি পড়তে এলে। আমার নিজেরই গেছে।

এই অতি-রোমান্টিক ডিগ্রিটি এখন সারবস্তুহীন ছোবড়ার নামান্তর।

 

৪. বাংলাদেশে ডাক্তারি শেষ করতে কমপক্ষে লাগবে ৬.৫ বছর। আমার নিজের লেগেছে সাত বছর।

এই সময়ে প্রাইভেট থেকে দুটো ডিগ্রি নিয়ে ফেলা যায়, বিদেশ গিয়ে মাস্টার্স শেষ করে নাচতে নাচতে ছবি পোস্ট করা যায় রোজ সোশ্যালসে।

সাত বছরে আমি ষাট-সত্তর টাকার টেস্টলেস অখাদ্য, ভাঙাচোরা ক্লাসরুম, গান্ডু বন্ধুবান্ধব ও একটি বিল্ডিংবন্দী জীবন ছাড়া কিছুই পাইনি।

সুতরাং এত দীর্ঘ সময় ইনভেস্ট করে তুমি লাড্ডু ও হতাশা বাদে কিছুই পাবে না।

 

৫. এখানকার অধিকাংশ শিক্ষকই বইপত্র পড়া তথাকথিত ‘মেধাবী’। সুতরাং ধারণা করে নিতেই পারো যে, এখানে কোনো মিসির আলীকে তুমি আবিষ্কার করবে না। চেষ্টা করলেও সম্ভব না।

এই শিক্ষকরা তোমার জান-জীবন ছারখার ও তোমাকে খোঁটা দিতে দিতে তোমার পুটুম্রে দেবার মহানকর্মে কঠিনভাবে নিয়োজিত থাকবে।

তুমি ঢাকার মেডিকেলে পড়লে খোঁটা দেবে, "চান্স পাইসো কেমনে? প্রশ্ন কিনসো?"

বাইরের সরকারি মেডিকেলে পড়লে বলবে, "ঢাকাতে চান্স পাও নাই!"

প্রাইভেটে পড়লে বলবে, "সরকারিতে চান্স পাও নাই। বাপের টাকায় ফুটানি।"

তাদের জীবনের যাবতীয় সকল হীনমন্যতা আর হতাশা, দুর্দশা তোমার সাথে বার্গারের মতো শেয়ার করে নিতে তারা থাকবে সদা প্রস্তুত।

 

৬. এরপরও তুমি যদি পড়তেই চাও, নিচের পয়েন্টগুলো খেয়াল করো, এগুলো গুরুত্বপূর্ণ:

সরকারিতে উপরের দিকে চান্স পেলে চেষ্টা করবে ঢাবি-অধিভুক্ত কোনো মেডিকেলে না পড়ার। সেক্ষেত্রে চমেক, রামেক, সিওমেক এসবকে এগিয়ে রাখবে পছন্দতালিকায়।

সরকারি ও ঢাকার মধ্যে যদি একান্তই পড়তে চাও, ঢামেক বাদে কোথাও পড়া উচিত না। ঢামেকে পড়বে কেবলমাত্র লিগ্যাসি ও কাল্টের জন্য।

ঢামেকে না হলে সলিমুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী, মুগদা—কোনোটাতেই পড়া উচিত হবে না।

এদের মধ্যে সলিমুল্লাহ আর মুগদাতে পড়তে চাইলে নিজের বুঝ নিয়ে পড়বে।

আর পুটুম্রা খেতে আগ্রহী হলে অবশ্যই সোহরাওয়ার্দীতে ভর্তি হবে।

ঢাকার ভেতরের মেডিকেল একটা প্রচলিত মিথ। বাজারে চলে ভালো। অথচ গান্ডুদের মধ্যে অধিকতর গান্ডুদের চারণভূমি হচ্ছে ঢাকার মেডিকেলগুলো। খাটে ছারপোকা, পলেস্তারা খসা, পুরান ঢাকার প্যা-পু—এসবের মধ্যেও এদের মুখে তিনবার থাকবে ইনস্টিটিউশনাল প্রাইড।

এদের থেকে শতহাত দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়।

ঢাবির মতো চদনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারে পড়ে সিস্টেমেটিক আদুভাই যদি হতেই চাও—ময়মনসিংহ আর বরিশাল ক্যাম্পাস হিসেবে চলনসই।

কোর্স মোটামুটি ঠিক সময়ে শেষ করতে চাইলে অবশ্যই সাস্ট, রামেবি, চমেবি এসবের আন্ডারে ভর্তি হবে। বিশেষ করে যারা দেশে থাকতে চাও।

যাদের বাড়ি দূরে, তারা ঢাকা নাম শুনলেই ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে আসার কোনো দরকার নাই। ঢাকায় তোমার জন্য রসগোল্লা হাতে কেউ বসে নাই।

তুমি কি ভাবছো? ঢাকায় এসে রোজ দুপুরবেলা ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভাত খাবা?

একদিন সোহরাওয়ার্দীর রোজপয়েন্ট নামক ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঘুরে যাওয়ার দাওয়াত। এখানকার ভাতের হোটেলের থেকে ছদরদ্দী মোড়ের ছনের দোকান ভালো।

"ডাক্তারদের বিয়ের বাজার ভালো"—এরকম একটি লাড়েলাপ্পা বাক্য ঘুরে বেড়ায় বাজারে।

অথচ অধিকাংশ ডাক্তারের আজকাল বিয়ে হয় না (স্ট্যাটিসটিকস দেখাতে পারবো)।

স্বামী /স্ত্রী হিসেবে ডাক্তাররা নিচের সারির বলেই আমার ধারণা। কারণ এরা মানুষ হিসেবে সুবিধার না।

সুতরাং এসব আশা বাদ দিয়ে একটি সেক্সুয়ালি ফ্রাস্ট্রেটেড পড়ুয়া গান্ডু হবার শখ থাকলে এদিকে আসতে পারো।

 

৭. অধিকাংশ ডাক্তারের চল্লিশের আগেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ আরও নানাবিধ রোগব্যাধি হয়। এটাও পরিসংখ্যান বলছে। এটা তাদের লাইফস্টাইলের জন্য। জীবনের ১০-১৫ বছর নিষ্ঠার সাথে চেয়ারে পশ্চাৎদেশ লটকিয়ে থাকার কারণে এরা ভূড়িঅলা ও বদখত হয়।

 

৮. অধিকাংশ ডাক্তার ক্ষ্যাত। তোমার একজন মেডিকেল পড়ুয়া বড়ভাই (উদাহরণস্বরূপ আমি) ও একজন ইঞ্জি পড়ুয়া বড়ভাইয়ের দিকেই তাকালে এক লহমায় বুঝে যাবে।

 

৯. বহুব্রীহি উপন্যাসের ডাক্তার বিলুর মত কাউকে আমি ডাক্তারি পড়তে দেখিনি।

সুতরাং বিলুর মতো নারী দেখার আশা থাকলে বিরাট ধোঁকা খাবা। অধিকাংশ ডাক্তার মেয়েই গ্রস ও এক্সপ্রেশনলেস।

 

১০. ডাক্তাররা প্রচুর প্রতিক্রিয়াশীল ও গালিবাজ (উদাহরণস্বরূপ আমি ও আমার পোস্ট)। এই যেমন এই পোস্ট দেখেই অনেকে আমাকে উপর্যুপরি গালি দেবে।

এখন তোমরা দ্যাখো, যা ভালো মনে করো।

১২২ পঠিত ... ১৭:৩৮, জুন ২২, ২০২৫

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top