সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে এই ভূখণ্ডের প্রতীক

৯১ পঠিত ... ১৭:৩৬, জুলাই ০৭, ২০২৪

28

[ব্রিটিশ শাসন থেকে বাংলাদেশ এই ভূখণ্ডের তিনটি সময়ই দেখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তার ৮৯তম জন্মদিন ছিল ২৩ জুন। জন্মদিন উপলক্ষে ২৯ জুন তিনি শিশু একাডেমি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে আত্মজীবনীমূলক বক্তব্য দেন। সেখানে এই তিন সময়ে নিজের দেখা নানান প্রতীকের কথা বলেছেন তিনি। পুরো বক্তব্য পড়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দেখা এই ভূখণ্ডের প্রতীকগুলো একসাথে করেছেন আন নাসের নাবিল]

একদিন শুনলাম, একজন ফাঁসি নিয়েছেন। আমাদের কৌতূহল হলো। ফাঁসি জিনিসটা কী, জানি না। আমরা গিয়ে দেখি গাছের সঙ্গে মানুষটি যেন পুতুলের মতো ঝুলছেন। নড়ছেন বাতাসে। সেটিই ফাঁসির প্রথম অভিজ্ঞতা। তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি, মানুষটি বেকার ছিলেন। অনাহারে অসহায় অবস্থায় হতাশ হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

আমার কাছে ব্রিটিশ আমলের ছবি হলো ওই আত্মহত্যার ছবি। যদি ব্রিটিশ শাসনের কোনো প্রতীক দিতে চাই, তাহলে ফাঁসিতে ঝোলা আমাদের গ্রামের এই মানুষটির কথাই বলতে হয়। আমার কাছে ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক যেমন ছিল ফাঁসিতে ঝোলা মানুষটি, পাকিস্তানের ২৩টি বছরের প্রতীক হিসেবে দুটি ঘটনা আমার মনে খুব দাগ কেটে আছে।

একটি ঘটনা ছিল আমাদের প্রতিবেশী কৃষক পরিবারের সন্তান হায়াত আলী আর জমত আলীকে নিয়ে। হায়াত আলীকে আমার বাবা রাজশাহীতে পিয়নের চাকরি জোগাড় করে দিয়েছিলেন। হায়াত আলীর অবস্থা সে কারণে খুব খারাপ হয়নি। জমত আলী ছিলেন নৌকার মাঝি। তাকে আমরা বলতাম তুফানি। তুফানি এই অর্থে যে তিনি তুফানের বিরুদ্ধে নৌকা চালাতে পারতেন এবং তুফানের বেগে চালাতে পারতেন। তার নিজের নৌকা ছিল না, অন্যের নৌকা বাইতেন। আমি তখন এমএ পরীক্ষা দিয়ে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজের প্রভাষক হয়েছি। কলেজের যেখানে আমি থাকি, এক বিকেলে সেখানে জমত আলী এসে উপস্থিত। চেহারা অত্যন্ত মলিন ও বিধ্বস্ত। তাকে আমরা চাচা বলতাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, চাচা, আপনি হঠাৎ এখানে?

তিনি বললেন, আমি শুনলাম তুমি এখানে পড়াও। সে জন্য দেখা করতে আসলাম।

আমি বললাম, কী জন্য এসেছিলেন?

তিনি বললেন, আমাকে ডাকাতির মামলায় আসামি করা হয়েছে।

ডাকাতির মামলার আসামি হয়ে এসেছেন তুফানি। ঘটনাটা আমাকে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিল। মনে হলো, হতেই পারে যে তিনি ডাকাতিতেই যুক্ত ছিলেন। কারণ, তার তো কোনো দিশা নেই, কোনো জমিজমা নেই। পাকিস্তান রাষ্ট্র তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। ওই তুফানি চাচার সেই চেহারাও আমার কাছে পাকিস্তানের প্রতীক হয়ে আছে।

এই ২৫ মার্চেই মেহেরুন্নেসাদের বাড়ি আক্রমণ করল অবাঙালিরা। বাড়িতে ছিলেন মেহেরুন্নেসা আর তার মা ও ভাই। মা কোরআন শরিফ নিয়ে এসে দাঁড়ালেন। আক্রমণকারীদের বললেন, আমরা তো মুসলমান। অবাঙালিরা তখন পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদে উন্মত্ত। তারা তিনজনকেই হত্যা করল। এরপর ভাইয়ের মাথা কেটে নিয়ে চলে গেল। আর মেহেরুন্নেসাকে যা করল, সেটা আরও ভয়ংকর। তাকে তো

মারলই। মেরে পাখার সঙ্গে ঝুলিয়ে পাখা ছেড়ে দিল। সে ঘুরতে থাকল। আমার কাছে এই হলো পাকিস্তানের আরেকটি প্রতীক।

এখন বাংলাদেশে আমরা কোন প্রতীকের কথা বলব? কাকে প্রতীক হিসেবে ধরব? ঘটনা তো অনেক। কোনটা বলব? বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো, তখনও তেলের জন্য, কাপড়ের জন্য আমাদের রেশন কার্ড খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছে। আর পাকিস্তান যখন স্বাধীন হয়েছিল, তখনও দুর্ভিক্ষের অবস্থা ছিল।

আবার আমি সেই আত্মহত্যার কথাই বলি। ছয়-সাত বছর আগে আমাদের গ্রামে একই পরিবারের তিনজন আত্মহত্যা করেন। মাছের ব্যবসা করবেন বলে ওই পরিবারের প্রধান ব্যক্তি বাবা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই ঋণ আর শোধ করতে পারেননি। সেটা নিয়ে যখন তাগাদা এসেছে, অসহায় বাবা ভাতের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিয়েছেন। তা খেয়ে বাবা নিজে মরেছেন, মা মরেছেন এবং তাদের মেয়েটাও মরেছে। এই যে ব্রিটিশ আমলের সেই একজনের জায়গায় তিনজনের আত্মহত্যা, একেও কি আমি প্রতীক বলব?

আমরা প্রতিদিন আত্মহত্যার কথা শুনছি। কয়েক দিন আগে নোয়াখালীর সেনবাগে কামাল উদ্দিন মজুমদার নামের একজনের আত্মহত্যার কথা শুনলাম। খবর অনুযায়ী, তার বয়স ছিল ৬৫ বছর। তিনি আত্মহত্যা করেছেন নিজের বাড়ির কাঁঠালগাছে ঝুলে। আত্মহত্যার আগে ছোটো ছোটো কাগজে ছয় পৃষ্ঠার একটা চিরকুট লিখে গেছেন। সেখানে তিনি তার দুঃখের কথা বলেছেন, এই দুঃখ ঋণের দুঃখ, অভাবের দুঃখ। তিনি সামান্য লোক নন, সম্ভ্রান্ত লোক। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার পরিবারে কোনো উপার্জনের মানুষ নেই, কিন্তু ঋণ আছে। একে আমি কীসের প্রতীক বলব?

অথবা ধরুন, সাম্প্রতিক কালে এক জল্লাদের মৃত্যুর খবর। তিনি কোনো পেশাগত জল্লাদ নন, একজন আসামি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। তাকে দিয়ে ফাঁসির আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করানো হতো। অনেক লোকের ফাঁসি দেওয়ার কারণে তার শাস্তি লাঘব করা হয়েছে। তিনি মুক্ত হয়েছেন।

মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেন। বিয়ে করেছিলেন। এর কয়েক দিন পরে থানায় গিয়ে তিনি ডায়েরি করলেন যে তার স্ত্রী ও শাশুড়ি স্বর্ণালংকার ও টাকাপয়সা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। জল্লাদ বলেছেন, আমি জেলখানাতে বরং ভালো ছিলাম, বাইরে এসে দেখি আমার এ রকম জীবন।

কয় দিন আগে পড়লাম, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ওই জল্লাদ মারা গেছেন, সম্ভবত সেই শোকেই। একে কী প্রতীক বলব?

এখন একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা বলা যাক। তাকেও প্রতীক বলতে পারি। সিদ্দিক সালিকের উইটনেস টু সারেন্ডার বইটিতে এ ঘটনার উল্লেখ আছে। পাকিস্তানিরা এক তরুণকে ধরে নিয়ে এসেছে। কারণ, তরুণটি মুক্তিযোদ্ধা। তার সঙ্গে অস্ত্র পাওয়া গেছে। ধরে আনার পর পাকিস্তানিরা ওই তরুণকে প্রশ্ন করেছে, তোর সঙ্গে কে কে ছিল, নাম বল। তরুণ মুক্তিযোদ্ধাটি কারও নামই বলেননি। এরপর পাকিস্তানিরা তার বুকে বন্দুক চেপে ধরে বলেছে, নাম না বললে গুলি করা হবে। তবু তিনি বলেছেন, বলব না। এরপর তিনি জয় বাংলা বলে চিৎকার করে মাটি ছুঁয়ে দাঁড়ালেন। আর পাকিস্তানিরা তাকে গুলি করল। এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকেও আমরা বাংলাদেশের প্রতীক বলতে পারি।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রাণ দেওয়া নূর হোসেনকে আমরা প্রতীক বলতে পারি। প্রতীক বলতে পারি ডাক্তার মিলনকে।

তবে আমার কাছে প্রতীক বলতে একজনের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। সে একটি মেয়ে। একসময় আমাদের গ্রামে মেয়েদের কোনো বিদ্যালয় ছিল না। আমাদের মায়েদের প্রজন্মে, যাদের বাবারা সরকারি চাকরি করতেন, তারাই কিছু লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছেন। যারা গ্রামে থাকতেন, তারা লেখাপড়ার সুযোগই পাননি। আমাদের গ্রামে মেয়েদের স্কুল হয়েছে, উন্নতি হয়েছে। সেই মেয়েদের স্কুল থেকে একটা মিছিলের ছবি বেরিয়েছিল কাগজে। মিছিলে লেখা ছিল, বখাটেদের রুখতে হবে।

গ্রামে বখাটেরা খুব উত্ত্যক্ত করে মেয়েদের। মেয়েরা তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে। যে মেয়েটি সামনে ছিল, সে ক্লাস টেনে পড়ে। প্রতিবাদে সেই সবচেয়ে মুখর। সবচেয়ে ভালো ছাত্রীও সে। সেই মেয়ে প্রতিবাদ করেছিল। পরে একদিন তারই চেনা এক যুবক তাকে এমন নোংরা কথা বলেছে যে সে নিজেদের বাড়িতে গাছের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে। এই মেয়েকেও আমরা প্রতীক বলতে পারি। মেয়েটি কিন্তু তার নিজের কারণে আত্মহত্যা করেনি। আত্মহত্যা করেছে সমষ্টির হয়ে প্রতিবাদ হিসেবে। তাকে উত্ত্যক্ত করছে যে ছেলে, যে ব্যবস্থা, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সে আগেও প্রতিবাদ করেছিল। শেষ প্রতিবাদটা করল নিজের প্রাণ দিয়ে।

এত কিছুর পরও আমি আশাবাদী। কেন আশাবাদী, সেই কথাটা বলে শেষ করি। আশার কারণ হলো, মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন না দেখলে মানুষ মানুষ থাকে না। আমার একটা বই বের হয়েছে কিছুদিন আগে, নাম—স্বপ্ন ছিল, থাকবে। স্বপ্ন আছে বলেই আমরা এখনও আছি। স্বপ্নই টিকে থাকবে আজীবন। স্বপ্ন বলে যে মানুষের মনুষ্যত্ব অপরাজেয়।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো

৯১ পঠিত ... ১৭:৩৬, জুলাই ০৭, ২০২৪

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top