ভায়রা ভাই যেভাবে দার্শনিক হলেন

৫২৬ পঠিত ... ২২:১০, জুলাই ০৫, ২০২১

bhayra bhai darshonik

জাতীয় বুদ্ধিজীবি দেখা কমিটির প্রধান জনাব যাযাবর মাসুদ দরদর করে ঘামছেন।

ওনার রুমে এসি ১৬ তে দেয়া। ১৬ পাওয়ারফুল। তিনি দু’বার চেক করেছেন। তৃতীয়বার আর করলেন না, কারণ এভাবে কেন ঘামছেন উনি নিজে তা বেশ ভালমত জানেন।

কমিটির জরুরি সভা ডাকতে হবে। মন্ত্রী নিজে ফোন করেছেন, ওনার ভায়রা ভাইকে বুদ্ধিজীবী ঘোষণা দিতে হবে। ব্যাপারটা মন্ত্রী সরাসরি বলেন নাই, খালি বলেছেন —“সামনে তো দেখি কবি দেখা কমিটির নির্বাচন, মাসুদ সাহেব। এদিকে আমার ভায়রা ভাই নেপাল থেকে পিএইচডি করল। ইয়ে আপনাদের নেক্সট মিটিং কবে?”

এখানে নতুন বুদ্ধিজীবী নির্বাচন করা যাচ্ছে না। কারণ পুরানো বুদ্ধিজীবি মারা না গেলে নতুন কাউকে বুদ্ধিজীবী বানানো যাবে না। এটা কিছুটা দালাই লামা নির্বাচনের মতো।
এর মধ্যে নিয়ম ভেঙ্গে পিনাকী ও রাইসু বুদ্ধিজীবিতে পরিণত হয়েছেন। ফলে, দেশে নতুন বুদ্ধিজীবীর ওভারফ্লো হচ্ছে রীতিমতা। যাযাবর মাসুদ সাহেবের জন্য তাই কবি দেখা কমিটির প্রাধান হওয়াটা অনেক বড় একটা ব্যাপার।

কবি হওয়া বুদ্ধিজীবী হওয়ার মতো না। কবি হতে হলে কিছু হওয়া লাগে না। কবি দেখা কমিটির প্রধান মহাকবি চেংটু শাহ সারাদিন কিছুই করতেন না। হুদাই কিছু ফেসবুক স্ট্যটাস দিয়ে এরে ওরে খোঁচাইতেন এবং জাতিকে বিনোদিত করতেন।

বাঙালি যখন ওনার ফাও স্ট্যটাস নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় ব্যস্ত, জনাব চেংটু তখন একটা কাগজে কয়েক ফোটা দুধ আর এডিবেল রঙ গুলিয়ে ওনার বিড়ালকে খেতে দিতেন। বিড়ালের চাটাচাটির পর যা থাকত তার ছবি তিনি বাহারী নাম দিয়ে ফেসবুকে আপলোড দিতেন। দাম রাখতেন কয়েক লাখ টাকা।

বাঙালি আবার প্রবল পরাক্রমে ছবির নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কথা বলা শুরু করত। এক ক্রিটিক তো বিড়ালের চাটাচাটির মধ্যে ওয়াসিলি ক্যান্ডিনিসকির প্রভাবও পেয়েছেন।

মহাকবি চেংটু শাহের সব কবিতা দুই লাইনের। জনাব যাযাবর মাসুদ তেমন একটি কবিতা, ‘বিস্মরণরে সন্তরণ’, মনে করলেন:
নদীর ধারে গিয়েছিলুম বেড়াতে
সেথায় গিয়ে দেখি এতলা এতলা প্যাক।

মাসুদ সাহেব নিজেই এ কবিতার একটি সমালোচনা লিখেছিলেন। এখানে মহাকবি কিভাবে এলিট কাব্যভবনা থেকে বের হয়ে সাব অল্টার্ন হতে চাছেন তা নিয়ে প্রায় তিন হাজার শব্দের একটা লেখা। গুগল করে ম্যাক্স ভেবার আর হবারমাসের কোট নিয়ে নিয়েছিলেন কয়েকটা। আর গায়ত্রী স্পিভাকের একটা রেফারেন্স ফরহাদ মাজহার থেকে নেয়া। উনি তো এখন বিএনপি করেন। বিএনপি জিনিসটাই তো সাবঅল্টার্ন।

চেংটু শাহের মৃত্যু জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রায় সবাই বিবৃতিতে এটাই বলেছেন। ওনার কবি দেখা কমিটির পোস্টটা এখন খালি। মাসুদ সাহেবের নজর সেদিকে। মন্ত্রীও এটা জানেন।

 

*
মাসুদ সাহেব খুব খুশি হলেন মন্ত্রীর ভায়রা ভাই যখন মিটিংয়ে সময়মত আসলেন। মাসুদ সাহেব খুব মধু মেখে ওনাকে বললেন, স্যার, অভিনন্দন। আপনি তো মাত্র পিএইচডি করলেন। কী বিষয়ে করলেন স্যার?

ভায়রা ভাই জানালেন ওনার পিএইচডির বিষয় ছিল কলা ভবনে গাধার চাষ।

মাসুদ সাহেব একটু দমে গেলেন। পরক্ষণেই তার মনে হলো উনি নিজে যদি বাথটাবে ব্যাঙের প্রজনন নিয়ে ডক্টরেট করে থাকেন, কলা ভবনে গাধার খোঁজ পাওয়া কোন কঠিন কোন বিষয় না।
উনি ভায়রা ভাইকে বললেন— অসাধারণ, স্যার! মুশকিল হচ্ছে আমাদের বুদ্ধিজীবী পোস্টটা খালি নাই। দার্শনিক আছে। আপনি দূরে দেখেন কেমন? মানে দর্শন করেন কেমন?
ভায়রা ভাই চশমাটা খুলে চোখ কুচকে জানালেন তিনি ভালই দেখেন।

মাসুদ সাহেব একটু দূরে গিয়ে ভায়রা ভাইকে চশমা খুলতে বলে নিজের দুটো আঙ্গুল তুলে জিজ্ঞেস করলেন, বলেন তো স্যার আমার হাতে কয়টা আঙ্গুল?
ভায়রা ভাই বললেন, আপনার হাতে তো দশটা আঙ্গুলই আছে মনে হচ্ছে।
মাসুদ সাহেব বললেন, না মানে আমি জানতে চাচ্ছিলাম আমি যে দুটো আঙ্গুল তুলেছি এটা কি আপনি দেখেছেন?
'কিন্তু আপনি তো এটা বলেননি', ভায়রা ভাইয়ের কন্ঠে বিরক্তির ছাপ।
: আচ্ছা ঠিক আছে। মার্কসকে আপনি কিভাবে দেখেন?
: ওই যে যার স্ত্রীর অনেক জুতা ছিল? ভায়রা ভাইয়ের গলায় বিস্ময়।
: না, না, না। সেটা তো মার্কোস। অসুবিধা নাই। এটা করি— একটা গাছের ডালে তিনটা পাখি ছিল। আমি যদি গুলি করে একটা পাখি মেরে ফেলি তাহলে কয়টা পাখি থাকবে?
: তিনটা পাখিই থাকবে। একটা মরে পরে থাকবে, বাকি দুটা থাকবে অন্য কোথাও। মরা পাখি তো পাখিই তো না কি? আবার আপনি যদি আপনার আঙ্গুলের মতো পৃথিবীর সব পাখির সংখ্যা...

মাসুদ সাহেব আর আগাতে দিলেন না— বটে, বটে, স্যার। আপনার মধ্যে ক্রিটাকাল চিন্তা আছে। আমি মুদ্ধ।

সেদিন থেকে ভায়রা ভাই একজন দার্শনিক।

৫২৬ পঠিত ... ২২:১০, জুলাই ০৫, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top