রুমকি যেভাবে আমার 'গ্রুপ প্রেমিকা' হয়ে উঠলো

৭৪৪ পঠিত ... ১৬:৪৯, জুন ০৭, ২০২০

অলংকরণ: তাইসির

রুমকি আমার প্রেমিকা। বাট আমাদের এই প্রেমটা একটু অদ্ভুত। একটু না আসলে, বেশ অনেকটাই অদ্ভুত। সংক্ষেপে বলা যায়, রুমকি আমার গ্রুপ প্রেমিকা।
কি, বুঝলেন না তো? আচ্ছা তাহলে একদম শুরু থেকে শুরু করতে হবে। যেতে হবে বেশ খানিকটা পেছনে।

রুমকির তখন সিয়ামের সাথে প্রেম৷ একেবারে জীবন মরন প্রেম টাইপ। দুইজন দুইজনকে ভীষণ ভালোবাসে। রিলেশনে কোনো ঝামেলা নেই, সব ঠিকঠাক চলছে। নিয়ম করে কথা হয় ফোনে, দেখা হয় ক্যাম্পাসে, মিস করা হয় রাতে, হ্যাং আউট করা হয় রমনায়, চিল করা হয় রোজ ক্যাফেতে, মানে সবকিছুই হয় ঠিকঠাক। একদম আদর্শ কাপল।

তখন, ঠিক তখন, রুমকির সাথে ফেসবুকে আবীরের পরিচয়। আবির খুব ভালো গান করে। বিখ্যাত সব গানের কভার আপ্লোড করে নিজের টাইমলাইনে। মুগ্ধ হয়ে শোনে রুমকি। একদিন আবীরই নক দেয়। দিবেই বা না কেন, মেয়েটা যে অসম্ভব সুন্দরী। আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে ওর জন্ম হলেই পৃথিবীর সবচাইতে বিখ্যাত চিত্রকর্মটির নাম হয়তো মোনালিসার বদলে রুমকিলিসা টাইপ কিছু হতো। ভাবেন, এতো সুন্দরী!

তো যাই হোক, আবীরের সাথে বেশ কিছুদিন কথা হয় রুমকির। আস্তে আস্তে কথা বাড়ে। সারাদিন সারারাত চ্যাট হয়। আবীর প্রেমে পড়ে যায় মেয়েটার। একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করে, 'তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে?'
রুমকি তার রিলেশনের ব্যাপারে খুব সৎ। সত্যিটাই বলে দেয়, 'হ্যাঁ আছে। নাম সিয়াম।'

মন ভেঙে চার টুকরো হয়ে যায় আবীরের। ডিসিশন নেয় আর কথা বলবে না রুমকির সাথে। রুমকি মেসেজ দিলেও আর রিপ্লাই দেয় না। এড়িয়ে যায়। এতোদিনে রুমকিরও অভ্যাস হয়ে গেছে। তারও যে ভালোলাগে আবীরের সঙ্গ। আবীরকে মিস করা শুরু করে ও। কিন্তু আবীর আর আগের মত নেই।

সরাসরিই কল দেয় রুমকি, 'হ্যালো, কী সমস্যা তোমার? তুমি আমার সাথে কথা বলো না কেন?'
আবীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, 'বলে আর লাভ কী। তোমার তো বয়ফ্রেন্ড আছে।'
- ওয়েট, তুমি আমাকে ভালোবাসো?
- জানি না। আর বাসলেও বা কী। তোমার লাইফে অন্য কেউ আছে। বাই, আর ফোন দিও না।

রুমকি লাইফে কখনো নিজের মনের সাথে প্রতারণা করে নাই। এবারো করলো না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, 'আমি বুঝতে পারছি আবীর। আসলে আমিও তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। প্লিজ আমার সাথে কথা বলো আগের মত।'
- হোয়াট! সিয়াম? ওর কি হবে? ওকে ভালোবাসো না?
- হ্যা ওকেও বাসি, বাট একই সাথে তোমাকেও বাসি। আমি সরাসরিই বললাম তোমাকে। চাইলে মিথ্যা বলতে পারতাম, লুকাতে পারতাম অনেক কিছু। কিন্তু ওসব আমার পছন্দ না। যা মনে আসে তাই বলে দেই। সিয়ামের সাথে আমি ব্রেকাপ করতে পারব না। বাট কখনো অটোমেটিক ব্রেকাপ যদি হয় তখন তুমিই একমাত্র প্রেমিক হবা। তার আগে পর্যন্ত দুই নাম্বার প্রেমিক হিসাবে থাকতে চাইলে থাকো। না চাইলে তাও বলতে পারো। ইচ্ছা তোমার। বাট আমি তোমাকে ভালোবাসি। এখন ভেবেচিন্তে ডিসিশন নাও।

আবীর সারারাত ভাবে। কয়েক মুহুর্তের জন্য মনে হয়, রুমকিকে ব্লক দিয়ে সব শেষ করে দিবে। পরক্ষণেই মাথায় আসে, রুমকির মত মেয়েকে সারাজীবন সাধনা করলেও আর পাবেনা আবীর। সুতরাং সেকেন্ড বয়ফ্রেন্ডই সই। রাজি হয় আবীর।

গল্প এখানে শেষ হলে তো কথাই ছিল না কোনো। কিন্তু ঘটনা আরো বহুদূর গড়াবে বলেই আজকের কাহিনী। কয়েক মাস দুই বয়ফ্রেন্ডের সাথে প্রেম ভালোভাবে চলার পর রুমকির ইউটিউবে একটা ছেলের ফানি ভিডিও দেখে অনেক পছন্দ হয়। মন খুলে হাসে। তারপর ছেলেটার ফেসবুক আইডি খুজে বের করে। রাহাত রহমান। নক দেয়। একদিন পর আসে রিপ্লাই। নর্মাল কথাবার্তা হতে থাকে। কথা হতে হতে হয়ে যায় প্রেমও। সিয়াম আর আবীরের ব্যাপারে রাহাতকে সব খুলে বলে রুমকি। বলে, তিন নাম্বার প্রেমিক হিসাবে থাকতে চাইলে থাকো। নাহয় চলে যাও। আমি জোর করব না তোমায়। কিন্তু ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকেও। কখনো ওদের সাথে ব্রেকাপ হলে তুমিই পাবা আমাকে।

রাজি হয় রাহাত৷ অবশ্য রাজি না হয়ে উপায়ও ছিলো না। রুমকিকে একবার দেখলে, একবার জানলে, একবার ওর সাথে সময় কাটালে, ওকে ছাড়া থাকা কোনো ছেলের পক্ষে সম্ভব হয় না।

এভাবেই রাহাতের পরে আসে সুমন। ছেলেটা ফটোগ্রাফার। নিজেও ভীষণ হ্যান্ডসাম। সিক্স প্যাক বডি। যথারীতি প্রেমে পড়ে রুমকি৷ প্রেমিক নাম্বার ফোর।

তারপর গিটারিস্ট আমজাদ, ক্রিকেটার তন্ময়, কার্টুনিস্ট আশিক, বুয়েটিয়ান শাদমান, সোশ্যাল ওয়ার্কার মিজান, রাইটার সোহাইল।

হ্যাঁ, আমি। আমিই রুমকির দশ নাম্বার প্রেমিক। আমার লেখা পড়ে মুগ্ধ হয় মেয়েটা। ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। সে কখনো ভাবেনাই আমি একসেপ্ট করবো৷ কিন্তু আপনারা তো জানেনই আমার স্বভাব। মেয়ে, তার ওপর সেইরকম সুন্দরী। আহা!

সেই রাতে ভীষণ খুশি হয়েছিলো রুমকি। ভেবেছিলো নক দিবে। কিন্তু আমি যদি রিপ্লাই না দেই? এত ফলোয়ার আমার। এটা ভেবেই নাকি নক দেয় নাই।

অথচ কে জানতো নকটা আমিই দিব৷ নক না ঠিক, ডে'র রিপ্লাই। মজা করেই দিয়েছিলাম। বিইউপিতে পড়তো। তাই লিখেছিলাম, 'বিইউপি প্রাইভেট না পাবলিক?'
- ওয়াও, আপনার মেসেজ। আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না। আমার এতো সৌভাগ্য।

তারপর নিয়মিত কথা হতে থাকে। এতো সুন্দর করে কথা বলে ও, উফ! আর এতো সুন্দরী। কিভাবে রাত পার হয়ে যায় টেরও পাইনা। মাঝে মাঝে কথার মধ্যেই কল আসে। রুমকি কেটে দেয়। আমি জিজ্ঞেস করি না।
তারপর একদিন জিজ্ঞেস করি, 'এতো কল কে দেয়, বয়ফ্রেন্ড?'
- ইয়ে মানে হ্যাঁ।

আমি ফোন রেখে দেই। রুমকি কল দেয়, আমি ধরি না। রুমকি মেসেজ পাঠায়, 'লাস্ট কিছু কথা বলি প্লিজ। আজই শেষ। আর বিরক্ত করব না আপনাকে।'

রুমকি চাইলে লুকাতে পারতো, কিন্তু লুকায়নি। সব খুলেই বলে। জানায়, আরো নয়টা প্রেমিক আছে ওর।

আমি ডিসিশন নেই, আর কথা বলব না৷ জীবনেও না। রিলেশন তো দূরের ব্যাপার।

কিন্তু পরের এক সপ্তাহ আমার কিভাবে যে কাটে আমি জানি না। খেতে পারি না, ঘুমাতে পারি না, কিচ্ছু করতে ভালো লাগে না। সারাদিন সারারাত মাথার মধ্যে রুমকি ঘুরে বেঁড়ায়। চোখের সামনে ভাসে ওর সুন্দর মুখটা। এভাবে চললে হয় আমি পাগল হয়ে পাবনা যাবো, নাহয় সুইসাইড করে পরপারে।

একসপ্তাহ পর কল দিই, 'হ্যালো রুমকি, আমি পারবো না তোমাকে ছাড়া থাকতে। তোমার কয়টা বিএফ আছে আমি জানিনা। হাজারটা থাকলেও আই ডোন্ট কেয়ার। আমি শুধু তোমার সাথে থাকতে চাই। আই লাভ ইউ জান।'
ওপাশ থেকে তীব্র কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে, 'আমিও ভীষণ মিস করেছি বাবু। ভীষণ। খুব ভালোবাসি সোহাইল। প্রমিজ করো, আমাকে ছেড়ে কোনোদিন যাবা না?'
- কোনোদিন না। প্রমিজ।

কান্না থামে রুমকির। কিছুক্ষণ পর আমতা আমতা করে বলে, 'সোহাইল, তোমাকে একটা মেসেঞ্জার গ্রুপে এড করি?'
- কিসের গ্রুপ?
- এড করলেই দেখতে পাবা।
- আচ্ছা করো।

গ্রুপে ঢুকে আমি যারপরনাই অবাক। গ্রুপের নাম, 'আমরা রুমকি লাভার্স পোলাপাইন'।
হোয়াট দ্যা ফুচকা। এখানে হচ্ছেটা কী! আমিসহ গ্রুপে ছেলের সংখ্যা দশ।
রুমকি লিখেছে, 'সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই, গ্রুপের নিউ মেম্বার সোহাইল রহমান। আমার লাস্ট ভালোবাসা।'
সাথে সাথে, ওয়েলকাম সোহাইল ভাই, ওয়েলকাম সোহাইল ভাই' লেখা শুরু করেছে সবাই একযোগে।
শাদমান লিখেছে, 'সোহাইল ভাই, বিগ ফ্যান৷ আপনাকে গ্রুপে পাবো ভাবিনি। আপনার সব লেখা পড়ি। স্বাগতম ব্রো।'
আশিক লিখেছে, 'ওয়েলকাম টু ফ্যামিলি সোহাইল ভাই। আইডিয়া দেন ভালো কোনো কার্টুনের। আপনার তো আইডিয়ার অভাব নাই।'

রুমকি কাচুমাচু গলায় আমাকে মেনশন দিয়ে বললো, 'আসলে সোহাইল সবার সাথে আলাদাভাবে চ্যাট করতে গেলে একজনের সাথে বেশি কথা হয় আরেকজনের সাথে হয়তো কথা হয় ই না, এজন্যই এই গ্রুপ। সবার সাথে যাতে কথা বলতে পারি একসাথে। আশাকরি কিছু মনে করবা না।'
- নাহ, ইটস ওকে, মনে করার কি আছে।
- এই তোমরা সবাই সোহাইলকে অগ্রাধিকার দিবা৷ ও যেহেতু নতুন। আর মিলেমিশে থাকবা। আমি খেয়ে আসি। থাকো সবাই। আই লাভ ইউ অল। উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ!

কিছুক্ষণ পর জানতে পারি সামনেই নাকি গ্রুপের গেট টুগেদার। চাদা ধরা হয়েছে ছয়শো টাকা৷ সবাই টিশার্ট পাবে, কেক কাটা হবে, বিরিয়ানি আর কোক থাকবে মেন্যুতে আর বাকি টাকা দিয়ে রুমকির জন্য ভালো কোনো গিফট কেনা হবে।
প্রথম প্রেমিক হিসাবে সিয়াম ভাই গ্রুপ এডমিন৷ উনার কাছেই টাকা জমা দিতে হবে৷ দিলাম, কি আর করা৷ প্রেম যখন করছিই, তখন ভালোবাসার প্রমাণও দিতে হবে।

টিএসসিতে প্রোগ্রাম হলো। খুব মজা করলাম সবাই৷ হাসি আনন্দ গান খাওয়াদাওয়া সব হলো। টিশার্ট পেলাম। টিশার্টের বুকে লেখা, 'রুমকি তোমার মুখের হাসি, জীবন দিয়ে ভালোবাসি।'
পিঠে লেখা, 'মোদের স্বপ্ন মোদের আশা, রুমকি মোদের ভালোবাসা।'
তার নীচে ছোট ছোট করে লেখা, 'আমরা রুমকি লাভার পোলাপাইন।'
ভাইরেভাই, রুমকি কোনো মানুষ নাকি কোনো দেশ? নাকি কোনো সংগঠন? নাকি কোনো ফুটবল টিম?

তবে যাই হোক না কেন, আমরা রুমকিকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, তোমার প্রেমিকা আছে?
আমরা দশজনই উত্তর দেই, হ্যাঁ আছে। রুমকি নাম৷ অনেকের কভার ফটোতে রুমকির সাথে কাপল ফটো লাগানো।

এর মাঝে মিজান একটু বেকে বসেছিলো। গ্রুপ থেকে লিভ নিয়েছে। রুমকির ফোন ধরে না। রুমকি তো প্রায় পাগলের মত হয়ে গেছে৷ মিজানের জন্য একটু পরপর কান্নাকাটি করে৷ খাওয়াদাওয়াও বাদ দিছে।
পরে একদিন শুনি মিজান নাকি কোন মেয়ের সাথে রেস্টুরেন্টে গেছে। খবর শুনে রুমকি তেলাপোকা মারার চক খেয়ে সুইসাইড করার ট্রাই করেছে।

বাধ্য হয়ে আমরা সবাই গিয়ে মিজানকে বোঝালাম যে, রুমকি ওকে কত ভালোবাসে। রুমকির সাথেও দেখা করলাম। ঐ মেয়ে মিজানের ফ্রেন্ড শুধু এটাও বললাম।

সিয়াম ভাই আমাদের সবার বড়। উনি তো রেগেমেগে অস্থির। আজকালকার ছেলেমেয়েরা প্রেমের প্রকৃত অর্থই জানে না। তাদের কাছে ভালোবাসার মূল্য নেই কোনো। এতো অল্পতে ব্রেকাপ করে, আবার সুইসাইড করতে যায়। আমাকে দেখ, রুমকির সাথে তোমাদের সবার আগে আমার প্রেম। আমি ওকে যত বুঝি, যত ভালোবাসি, তোমরা কেউ ভাবতেও পারবা না। আর দুইদিন এসে তোমাদের ঢং দেখে বাঁচি না। আর রুমকি তোমাকেও বলি, মিজান কী করেছে তুমি আমাদের বলবা না? কী মনে করে সুইসাইড করতে গেলে? তোমার কিছু হয়ে গেলে আমরা এতোগুলো মানুষ কিভাবে বাঁচতাম?

রুমকি আর মিজানকে সামনে বসিয়ে প্রায় আধাঘন্টা ঝাড়লেন সিয়াম ভাই। কেউ কোনো কথা বললো না। মাথা নীচু করে আছে।
আধাঘন্টা পর একটু শান্ত হলেন সিয়াম ভাই। বললেন, 'যা হইছে হইছে, দুইজন দুইজনকে স্যরি বলো।'
- স্যরি বাবু।
মিজান, তুমিও বলো। কী ব্যাপার? বলো!
- স্যরি জান।
ঠিক আছে, এবার দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাও। উহু গালে না, ঠোঁটে খাও। খাও বলছি।

চুমু হলো। আমরা সবাই হাততালি দিলাম। মিজানকে গ্রুপে আনা হলো। আবার সব স্বাভাবিক।

ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি। এর মধ্যে গ্রুপে আরো তিনটা ছেলে এড হয়েছে। তৌসিফ, শাহিন আর পীযুষ। রুমকির নতুন প্রেমিকেরা। নতুন ছেলে এড হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে থেকেই আমরা বুঝতে পারি। গ্রুপে রুমকি আসে না তেমন। মেসেজের রিপ্লাই দেয় না। ফোন ওয়েটিং থাকে। বুঝি, আবারো নতুন কাউকে ভালোলেগে গেছে রুমকির।

আমরা গ্রুপে বাজি ধরি। এবারের বয়ফ্রেন্ডের কী বিষয়ে প্রতিভা থাকবে? উল্লেখ্য, ট্যালেন্টেড ছেলে ছাড়া রুমকি কখনোই প্রেমে পড়ে না৷ রুমকির রুচি অনেক ভালো।

তৌসিফের টাইমে আমি বাজিতে সুমনের কাছে এক হাজার টাকা হেরেছিলাম। আমি বলছিলাম আর্টিস্ট হবে, বাট ট্রাভেলার ছিলো।
কিন্তু পীযুষের বেলায় সাড়ে তিন হাজার টাকা জিতে আগের লস কাটিয়ে ফেলেছি। রুবিক কিউব এক্সপার্ট বলছিলাম, মিলে গেছে।

তবে আমাদের গ্রুপের সবচাইতে বড় কোয়ালিটি হলো আমরা সবাই বন্ধু। কোনো ঝগড়া নেই, মারামারি নেই। একসাথে আড্ডা দেই সারাদিন। লুডু খেলি, পাবজি খেলি৷ রুমকিকে ভালোবাসি। সাপোর্ট দেই।

এইতো সেদিন রুমকি মিথিলার পোস্টে কমেন্ট করেছে, 'এইসব বারোভাতারি মহিলার জন্যই দেশটা ধ্বংস হয়ে গেল।'
সেই কমেন্টে মোট তেরোটা লাভ রিয়্যাক্ট পড়েছে। আমাদের গ্রুপ মেম্বার যে এখন তেরো, তাই।

এর মধ্যেই নতুন গেট টুগেদারের টাইম চলে আসলো। এই গেট টুগেদার দুইটা কারণে স্পেশাল। এক হলো, সিয়াম ভাই কুয়েত চলে যাচ্ছে। উনার ফেয়ারওয়েল হবে। উনি ওখানে বিজি থাকবেন, গ্রুপে আর আগের মত টাইম দিতে পারবেন না। তাই সবার সম্মতিক্রমে লাস্ট এক সপ্তাহ উনি একা রুমকিকে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরেও এসেছেন।

আর দুইনাম্বার কারণ হলো, রুমকি স্পেশাল কি যেন বলবে আমাদেরকে। ওর মন খারাপ বেশ কিছুদিন ধরেই। কিন্তু কি হয়েছে কিচ্ছু খুলে বলে না। শুধু বলে গেট টুগেদারের শেষে বলবে। খুব চিন্তা হয় আমাদের। কী এমন হতে পারে!

এবারের অনুষ্ঠান গাজীপুরের এক রিসোর্টে। সারাদিন খুব এনজয় হয়। গান বাজনা খাওয়াদাওয়া গেম শো সব হয়। রাতের বেলা ক্যাম্পফায়ার৷ সাথে বারবিকিউ পার্টি। রুমকি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, 'আমার বাসা থেকে বিয়ে ঠিক করেছে। ছেলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। সামনের শুক্রবার বিয়ে।'
বলতে বলতে রুমকির চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়ে।

কেঁদে ফেলি আমরাও। একজন আরেকজনকে জড়াজড়ি করে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। সিয়াম ভাই ভিসা পাসপোর্ট ছিড়ে ফেলে দিয়ে বলেন, 'এই অবস্থায় আমি আমার ভাইদের ছেড়ে কোথাও যাবো না৷ কোথাও না।'
রাহাত কাঁদতে কাঁদতে বলে, 'আর কয়দিন আগে কেন বললা না বাবু? এখন কেন বলছ?'
রুমকি বলে, 'আমি জানতাম আগে বললে তোমরা অনেক পাগলামি করবা৷ এজন্য বলি নাই। কারণ এই বিয়ে কোনোভাবে থামানো যাবে না৷ আব্বু স্ট্রোক করবে কিছু হলে৷ আব্বুর অনেক স্বপ্ন ঐ মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের সাথে বিয়ে দেয়ার। আমি আব্বুর স্বপ্ন ভাঙতে পারবো না।'

সারারাত এভাবেই বসে থাকি আমরা। বারবিকিউ এর চিকেন ঠান্ডা হয়ে যায়। কেউ মুখেও দেয়না। আশিক একবার বলে, 'এই বিয়ে কোনোভাবেই হতে দিব না আমি। সব ভেঙে ফেলব। সবাইকে খুন করে ফেলব। রুমকি অন্য কোনো ছেলের হতে পারে না। কোনোভাবেই পারে না।'
আমরা বুঝাই ওকে, 'পাগল ছেলে৷ ভালোবাসার মানে হলো সেক্রিফাইস। কাউকে না পেয়েও তাকে ভালোবেসে যাওয়ার নামই যে ট্রু লাভ। আমরা তো টাইম পাস করতে রুমকির প্রেমে পড়িনি। জীবন দিয়ে ভালোবাসা রক্ষার শপথ নিয়েছি। রুমকির খুশিই আমাদের খুশি।'

সকালে রুমকি শেষবারের মত সবার হাত ধরে বলে, কথা দাও, আমার বিয়েতে আসবা? আর কেউ কোনো সিনক্রিয়েট করবা না। কথা দাও আমাকে।

আমরা বুকে পাথর চেপে কথা দেই।

রুমকির বিয়ে হয়ে যায়। আমরা সবাই জমানো টাকা দিয়ে ডায়ামন্ড সেট গিফট করি। নীল রঙের পাঞ্জাবি ম্যাচিং করে পরে গায়ে হলুদে কালা চশমা গানে নাচি। রুমকির বিদায়ের সময় মুখে রুমাল চেপে ধরে কান্না ঠেকাই।

রাতে সবাই একসাথে সিয়াম ভাইদের আটতলার ছাদে বসে থাকি। অরিজিত সিংয়ের গান বাজে স্পিকারে। চান্না মেরেয়া, মেরেয়া..চান্না মেরেয়া, মেরেয়া...!
পীযুষ বলে, আসেন সবাই সুইসাইড করি ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। প্রেম অমর হয়ে থাকুক আমাদের।
আমজাদ বলে, আমিও একমত। এতো দুঃখ নেয়া যাচ্ছে না। বাট লাফালাফি না করে বিষ খাই সবাই।
রাহাত বলে, সুইসাইড না করে বেটার সবাই দুঃখ ভুলতে বান্দরবান ট্যুর দেই একটা। নাফাখুম, আমিয়াখুম।
মিজান একমত হয়।
ভোটাভুটি চলে। সুইসাইড নাকি ট্যুর?
সাত ছয় ব্যবধানে জিতে যায় ট্যুর৷ আমরা ব্যাগ বোচকা নিয়ে পরদিন রওয়ানা দেই বান্দরবান।

ফিরে এসে আস্তে আস্তে একেকজন নিজেদের লাইফ নিয়ে বিজি হয়ে যাই। রুমকিকেও ভুলতে থাকি। গ্রুপে কথা হয় না আগের মত। সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়। সব ক্ষত মুছে দেয়। ঈদ, বৈশাখ বা পূজাতে উইশ চালাচালি হয় গ্রুপে, এই অব্দিই। আস্তে আস্তে লেফট নেয় অনেকেই। শুনি কেউ কেউ বিয়েও করছে। প্রেমও। সিয়াম ভাই নতুন পাসপোর্ট করে কুয়েত গেছে। শাদমানের নতুন প্রেমিকা মেডিকেলে পড়ে। মিজানের শ্বশুরবাড়ি বরিশাল।

গল্প এখানেই শেষ প্রায়। আর অল্প একটু আছে। হ্যাঁ, দশ বছর পর আমার রুমকির সাথে দেখা হয় উত্তরা বারো নাম্বার সেক্টরে। এক মাঝবয়েসী লোকের গাড়ি থেকে নামছে। সাথে ছোট বাচ্চা।
লোকটা রুমকিকে মানিব্যাগ বের করে কিছু টাকা দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যায়।
আমি সামনে দাঁড়াই, 'চিনছো আমাকে?'
- আরে সোহাইল, কী খবর?
- এইতো ভালো। তোমার কি অবস্থা? গাড়িতে ঐ লোকটাকে ঠিক চিনলাম না।
- ও আমার হাজবেন্ট জামান।
- ওয়েট, তোমার হাজবেন্ড না আরো ফর্সা ছিল। দাড়ি ছিল। এরকম তো দেখতে লাগে না। তাছাড়া নামও র দিয়ে মেবি...
- হ্যা, রফিক। মনে আছে দেখি। ও আমার ফার্স্ট বর। জামান পঞ্চম।
- হোয়াট, রফিকের কি খবর?
- আছে এখনো, উত্তরা ওর কাছেই আসছি।
- ফাক মাই লাইফ৷ শিট, ম্যান শিট, এই বাচ্চা জামানের?
- শিওর না, চোখের দিক দিয়ে লাগে। বাট নাক আবার তওফিকের মত। কনফিউজ আমি৷

'এই সোহাইল কী হলো তোমার? এই ছেলে। এই কে কোথায় আছেন একটু আসেন। ইমার্জেন্সি। সোহাইল, সোহাইল, চোখ খোলো। পানি, পানি...!'

পরিশিষ্ট: রুমকির সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি ওর ৬ষ্ঠ বর। আমাকে একটা ক্লোজ গ্রুপে এড করেছে ও। গ্রুপের নাম, 'আমরা সবাই রুমকির হাজবেন্ড!'
সামনের মাসে গ্রুপের গেট টুগেদার৷ চাঁদা নয়শ টাকা...!

৭৪৪ পঠিত ... ১৬:৪৯, জুন ০৭, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top