যে কারণে আমি আর এখন হাত দেখি না

১৫৯৬ পঠিত ... ২০:৪৫, আগস্ট ২৯, ২০১৯

আমি যখন থার্ড ইয়ারের ছাত্র তখন থেকে হাতের রেখা দেখে ভাগ্য বলতে শুরু করি।

ফোর্থ ইয়ারে ওঠার পর ক্যাম্পাসে, বিশেষত মেয়েদের কাছে আমি এতোটাই জনপ্রিয় যে, এক ছাত্রনেতা আমাকে ডেকে নিয়ে শাসিয়ে দিয়েছিলেন। এসব ‘বুজরুকি’ বন্ধ না করলে মেডিকেল কলেজ থেকে বিতাড়নের পাকা ব্যবস্থার কথা জানানো হলো আমাকে। তখন চিকিত্সক হওয়ার পরিবর্তে ফুটপাথে সাইনবোর্ড লাগিয়ে টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্য গণনার ব্যবসা করতে হবে বলে জানিয়ে বাংলা ছবির ভিলেনের ভঙ্গিতে হেসেছিলেন ছাত্রনেতা। আমি খপ্ করে তাঁর ডান হাত ধরে ফেলেছিলাম। সেই হাতের মুঠো খুলে এক নজর তাকিয়ে, ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে এমনই এক আশার বাণী শুনিয়েছি মুহূর্তে বরফের চাঙ গলে পানি। ছাত্রনেতা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেই থেকে কলেজ কেন্টিনে আমার চা-সিঙারা ফ্রি।

কিন্তু হস্তরেখাবিদ হিসেবে আমরা এমন উজ্জ্বল ক্যারিয়ার এখন হুমকির মুখে। পঁচা শামুকে পা কাটার মতো। লীলা নামের ফার্স্ট ইয়ারের এক পুঁচকে মেয়ে আমার পাঁচ/ছজন ভক্ত-অনুরাগীর সামনে বলে বসলো, হাত দেখার ব্যাপারটা নাকি পুরোটাই একটা ভাওতাবাজি। শুনে মেজাজটা খিঁচড়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিজের জ্যোতিষীসুলভ ইমেজের কথা ভেবে আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করেছি। একটা বানানো হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললাম, ‘আমি তো বিজ্ঞাপন দিই নি, যারা আসে নিজের ইচ্ছাতেই আসে, আপনাকে ও ডেকে আনিনি।’

লীলা এবার আরো আক্রমণাত্মক, ‘আমি হাত দেখাতে আসি নি, আপনার প্রতারণার কথা সবার সামনে বলতে এসেছি।’
প্রতারনা! শব্দটা শুনে যেন পুলিশের সামনে হাতকড়া পরে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের চেহারাটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। কষে একটা চড় দিয়ে ওর গালটা আরো লাল করে দিতে ইচ্ছে করছিল আমার। কিন্তু পারা যায় না দুটো কারণে — এক. আমার ইমেজ রক্ষার দায়, দুই. মেয়েটির ভয়াবহ সুন্দর চেহারা। মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা বোধ করি সুন্দরীদের জন্মগত অধিকার। এরকম একটি মেয়েকে চড় মারা দূরে থাক, চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকতেও হিম্মত্ লাগে। স্বীকার করি, সেই মুরোদ আমার অন্তত নেই।

বললাম, ‘প্রতারণা মানে? আমি কি কারো কাছ থেকে টাকা পয়সা নিয়েছি?’

আমার গলায় বোধ হয় একটু উত্তেজনা ছিল। লীলা হাসলো। অপূর্ব সেই হাসি। রাগের মাথায়ও সেই হাসিতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।

লীলা ঠাণ্ডা গলায় বললো, ‘আপনি রেগে যাচ্ছেন, আচ্ছা সত্যি করে বলুনতো আপনার ভাগ্য গণনা কতটা ঠিক?
‘আমি কিরোর বই পড়ে হাতের রেখার বিশ্লেষণ শিখেছি, কিরো যদি ঠিক হয় তাহলে আমিও ঠিক।’
আবার সেই মোম গলানো হাসি, বললো, ‘হাতের রেখা দেখে ভাগ্য বলতে কিরো পড়ার দরকার হয় না, একটু কমনসেন্স থাকলেই হয়, আপনার কমনসেন্সেটা ভালো, তাই...।’
‘আপনি পারবেন?’
‘নিশ্চয়ই। দেখতে চান?’
‘দেখান।’ সরাসরি যুদ্ধে আহ্বান করলাম আমি।

উপস্থিত মেয়েদের মধ্য থেকে শান্তাকে বেছে নেওয়া হলো। লীলা তার হাতের তালুটা নেড়ে চেড়ে দেখে বললো, ‘খুব ছোটবেলায় তোমার একটা কঠিন রোগ হয়েছিল, জীবন-মরণ টানাটানি... ঠিক?’
শান্ত মেয়ের মতো শান্তা বললো, ‘ঠিক।’
লীলা আবার বললো, ‘নবম বা দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় একটা ছেলেকে তোমার খুব ভালো লেগেছিল, কিন্তু ওকে কখনো মুখ ফুটে এ কথা বলতে পারো নি...ঠিক?’
শান্তা মাথা নামিয়ে বললো, ‘না, ক্লাস এইটে পড়ার সময়...।’
লীলা বললো, ‘সময়ের সামান্য হেরফের হতে পারে, কিন্তু কথাটাতো সত্যি, নাকি?’
‘হ্যাঁ।’

অন্য সকলের মতো আমাকেও চমকে দিয়ে বিজয়িনীর ভঙ্গিতে চলে যাচ্ছিলো লীলা। হঠাত্ মুখ ঘুরিয়ে বললো, ‘আপনার হাত দেখেও ভূত-বর্তমান ভবিষ্যত্ বলে দিতে পারবো, প্রয়োজন হলে দেখা করবেন।’

জীবনে আমি এতো অপমান বোধ করি নি আর কখনো। এসব কথা ক্যাম্পাসে চাউর হলে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। দুটি দিন খুব অস্থিরতার মধ্যে কাটলো। প্রায় নির্ঘুম রাত কাটিয়ে তৃতীয় দিন সকালে ফোন করলাম পূরবীকে। পূরবীই লীলাকে নিয়ে এসেছিল আমার কাছে। ওরা হস্টেলে একই কক্ষে থাকে।

‘দেখা করতে চাস? হাত দেখাবি?’ রহস্যময় হাসি শোনা গেল পূরবীর, ‘বিকেলে লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ের নিচে থাকিস, ওকে বলে দেব।’

বিকেলে দেখা হয়ে গেল। ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করতেই হাসিতে জুঁইফুল ছড়িয়ে বললো, ‘ভালো। কিন্তু আপনি দেখছি ভালো নেই!’
‘কি করে বুঝলেন?’
‘সব কথা কি আর হাতে লেখা থাকে?’
‘তাহলে বলুন কেন ভাল নেই’ — বলে ডান হাতের করতল মেলে ধরলাম ওর সামনে।
লীলা বললো, ‘হাত দেখাতে হবে না, আমার চোখের দিকে তাকান চোখ দেখে বলবো।’
চোখের দিকে তাকিয়ে কি একটু কেঁপে উঠেছিলাম? লীলা বললো, ‘আরে, আপনি তো প্রেমে পড়েছেন!’
ঢোঁক গিলে বললাম, ‘কার?’
‘যদি কথা দেন আর কোনোদিন কারো হাত দেখবেন না, তাহলে বলতে পারি।’
অস্থির লাগছিল আমার, বললাম, ‘দেখবো না, কথা দিলাম, বলুন কার?’
সেই বিখ্যাত হাসি লীলার মুখে, সেই হাসি একটু আরক্ত, বললো, ‘আমার’।

আশ্চর্য, হাত না দেখেও এতো কিছু বোঝা যায়! তাহলে আমি কিরোর বই পড়ে হাত দেখি কেন?

সেই থেকে আমি আর কারো হাত দেখি না। ক্লাস শেষে লীলার সাথে কেন্টিনে যাই, বিকেলে অডিটোরিয়ামের সামনে নিরিবিলি জায়গাটাতে দুজনে বসে বাদাম চিবোই। সন্ধ্যায় ও হস্টেলে ফিরে গেলে পরের দিনটার জন্য অপেক্ষা করি।

১৫৯৬ পঠিত ... ২০:৪৫, আগস্ট ২৯, ২০১৯

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top