জন্মেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামে ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। কিন্তু শেষের নামটুকু একটা সময় বদলে হয়ে যায় ‘বিদ্যাসাগর’। পুরো বাংলায় সবাই তাঁকে এই এক নামে চিনে। তাঁর জীবন কেটেছে বেশ উত্তাল সময়ে। পুরো বাংলার সমাজ ব্যবস্থাই তখন খুব টালমাটাল। বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের মাঝ দিয়ে যাচ্ছিল ভারতবর্ষ।
সেই সময়টায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষাকে করে তুলেছিলেন সহজবোধ্য, সহজ গদ্যরীতির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যটাকেও আরও একটু জনমানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। বাংলায় শিক্ষা বিস্তারে, বিশেষত নারী শিক্ষার বিস্তারে, আমৃত্যু কাজ করে গেছেন শত অভাব অনটনের মাঝেও।
বিধবা বিবাহ প্রচলনে কাজ করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষের রসিকতা আর নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। নিজ পুত্রসন্তানকে একজন বিধবার সাথে বিয়ে করিয়ে, স্থাপন করেছেন উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত। সহজ সরল গদ্য রচনার কারণে তাঁকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক গদ্যকার। ঈশপের গল্প অবলম্বনে বাংলায় লিখেছিলেন ‘বিদ্যাসাগরের কথামালা’ নামক একটি বই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে সেই বইটি থেকে ছয়টি মজার এবং শিক্ষামূলক গল্প থাকছে আজ আপনাদের জন্য।
কুকুরদ্রংষ্ট মনুষ্য

এক ব্যক্তিকে কুকুরে কামড়াইয়াছিল। সে অতিশয় ভয় পাইয়া যাহাকে সম্মুখে দেখে তাহাকেই বলে ভাই! আমারে কুকুর কামড়াইয়াছে যদি কিছু ঔষধ জান, আমায় দাও। তাহার এই কথা শুনিয়া কোন ব্যক্তি কহিল, যদি ভাল হইতে চাও, আমি যা বলি তা কর। সে কহিল, যদি ভাল হইত পারি, তুমি যা বলিবে তাহাই করিতে প্রস্তুত আছি। তখন ঐ ব্যক্তি বলিল, কুকুরে কামড়ে যে ক্ষত হইয়াছে, ঐ ক্ষতের রক্তে রুটি টুকরা ডুবাইয়া যে কুকুর কামড়াইয়াছে তাহাকে খাইতে দাও? তাহা হইলেই , তুমি নিঃসন্দেহ ভাল হইবে। কুক্কুরদ্রংষ্ট ব্যক্তি শুনিয়া, ঈষৎ হাসিয়া কহিল, ভাই! যদি তোমার এই পরামর্শ অনুসারে চলি, তাহা হইলে এই নগরে যত কুকুর আছে তাহারা সকলে রক্তমাখা রুটির লোভে, আমায় কামড়াইতে আরম্ভ করিবেক।
সারসী ও তাহার শিশুসন্তান

সারসী ও তাহার শিশু সন্তান এক সারসী, শিশু সন্তানগুলি লইয়া, কোনও ক্ষেত্রে বাস করিত। ঐ ক্ষেত্রের শস্য সকল পাকিয়া উঠিলে, সারসী বুঝিতে পারিল, অতঃপর, কৃষকেরা শস্ত কাটিতে আরম্ভ করিবেক। এই নিমিত্ত, প্রতিদিন, আহারের অন্বেষণে বাহিরে যাইবার সময়, সে শিশু সন্তানদিগকে বলিয়া যাইত, তোমরা, আমার আসিবার পূর্বে, যাহা কিছু শুনিবে, আমি আসিবা মাত্র, সে সমুদয় অবিকল আমায় বলিবে ।
একদিন, সারসী বাসা হইতে বহির্গত হইয়াছে, এমন সময়ে, ক্ষেত্রস্বামী, শস্য কাটিবার সময় হইয়াছে কি না, বিবেচনা করিয়া দেখিবার নিমিত্ত, তথায় উপস্থিত হইল, এবং চারি দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল, শস্য সকল পাকিয়া উঠিয়াছে, আর কাটিতে বিলম্ব করা উচিত নয়। অমুক অমুক প্রতিবেশীর উপর ভার দি, তাহারা কাটিয়া দিবেক । এই বলিয়। সে চলিয়া গেল।
সারসী বাসায় আসিলে, তাহার সন্তানেরা ঐ সকল কথা জানাইল, এবং কহিল, মা ! তুমি আমাদিগকে শীঘ্র স্থানান্তরে লইয়া যাও। আর তুমি, আমাদিগকে এখানে রাখিয়া, বাহিরে যাইও না। যাহারা শস্ত কাটিতে আসিবেক, তাহার, দেখিলেই, আমাদের প্রাণবধ করিবেক। সারসী কহিল, বাছা সকল ! তোমরা এখনই ভয় পাইতেছ কেন । ক্ষেত্রস্বামী যদি, প্রতিবেশীদিগের উপর ভার দিয়া, নিশ্চিন্ত থাকে, তাহা হইলে, শস্য কাটিতে আসিবার অনেক বিলম্ব আছে।
পর দিবস, ক্ষেত্রস্বামী পুনরায় উপস্থিত হইল ; দেখিল, যাহাদের উপর ভার দিয়াছিল, তাহারা শস্ত কাটিতে আইসে নাই। কিন্তু, শস্য সকল সম্পূর্ণ পাকিয়া উঠিয়াছিল ; অতঃপর না কাটিলে, হানি হইতে পারে ; এই নিমিত্ত, সে কহিল, আর সময় নষ্ট করা হয় না ; প্রতিবেশীদিগের উপর ভার দিয়া নিশ্চিন্ত থাকিলে, বিস্তর ক্ষতি হইবেক । আর তাহাদের ভরসায় না থাকিয়া, আপন ভাই বন্ধু দিগকে বলি, তাহারা সত্বর কাটিয়া দিবেক । এই বলিয়, সে আপন পুত্রের দিকে মুখ ফিরাইয়া কহিল, তুমি তোমার খুড়াদিগকে আমার নাম করিয়া বলিবে, যেন তাহার, সকল কৰ্ম রাখিয়া, কাল সকালে আসিয়া, শস্য কাটিতে আরম্ভ করে। এই বলিয়া, ক্ষেত্রস্বামী চলিয়া গেল।
সারসশিশুগণ শুনিয়া অতিশয় ভীত হইল, এবং, সারসী আসিবা মাত্র, কাতর বাক্যে কহিতে লাগিল, মা । আজ ক্ষেত্রস্বামী আসিয়া এই এই কথা বলিয়া গিয়াছে। তুমি আমাদের একটা উপায় কর। কাল তুমি আমাদিগকে ফেলিয়ে যাবিতে পরিবে না। যদি যাও, আসিয়া আর আমদিগকে দেখিতে পাইবে না। সরাসী শুনিয়া ঈষৎ হাস্যে কহিল, যদি এই কথা শুনিয়া থাক, তাহা হইলে ভয়ের বিষয় নাই। যদি ক্ষেত্রস্বামী ভাই- বন্ধুদিগের উপর ভার দিয়া নিশ্চিন্তে থাকে, তাহা হইলে শস্য কাটিতে আসিবার এখনও অনেক বিলম্ব আছে। তাহাদেরও শস্য পাকিয়া উঠিয়াছে। তাহারা আগে আপনাদের শস্য না কাটিয়া, কখনও ইহার শস্য কাটিতে আসিবেক না। কিন্তু ক্ষেত্রস্বামী কাল সকালে আসিয়া. যাহা কহিবেক, তাহা মন দিয়া শুনিও, এবং আমি আসিলে বলিতে ভুলিও না।
পরদিন, প্রত্যূষে সারসী আহারে অন্বেষণে বহির্গত হইলে, ক্ষেত্রস্বামী তথায় উপস্থিত হইল; দেখিল কেহই শস্য কাটিতে আইসে নাই; আর শস্য সকল অধিক পকিয়াছিল, এজন্য ঝরিয়া ভূমিতে পরিতেছে। তখস সে, বিরক্ত হইয়া আপন পুত্রকে কহিল দেখ, আর প্রতিবেশীর, অথবা ভাই-বন্ধুর মুখে চাহিয়ে থাকা উচিত নহে। আজ রাত্রিতে তুমি, যতজন পাও, ঠিকা লোক স্থিল করিয়া রাখিবে। কাল সকালে তাহাদিগকে লইয়া আপনরাই কাটিতে আরম্ভ করিব, নতুবা বিস্তর ক্ষতি হইবেক।
সারসী বাসায় আসিয়া, এই সমস্ত কথা শুনিয়া কহিল, অতঃপর আর এখানে থাকা উচিত হয় না; এখন অন্যত্র যাওয়া কর্তব্য। যখন কেহ অন্যের উপর ভার দিয়া, নিশ্চিন্ত না থাকিয়া, স্বয়ং আপন কর্মে মন দেয়, তখন ইহা স্থির জানা উচিত যে, সে যথার্থই ঐ কর্ম সম্পূর্ণ করা মনস্থ করিয়াছে।
ঈগল ও দাঁড়কাক

এক পাহাড়ের নিম্নদেশে, কতকগুলি মেষ চরিতেছিল। এক ঈগল পক্ষী, পাহাড়ের উপর হইতে নামিয়া , ছোঁ মারিয়া, এক মেষশাবক লইয়া পুনরায় পাহাড়ের উপর উঠিল, ইহা দেখিয়া এক দাঁড়কাক ভাবিল আমিও কেন, ঐরূপ ছোঁ মারিয়া , একটা মেষ অথবা মেষশাবক লই না। ঈগল যদি পারিল, আমি না পরিব কে? এই স্থির করিয়া, সে যেমন এক মেষের উপর ছোঁ মারিল, অমনি সেই মেষের লোম তাহার পায়ের নখর জড়াইয়া গেল। দাঁড়কাক, এই রূপের বদ্ধ হইয়া, ঝপ্ পট্ ও প্রাণভয়ে কা কা করিতে লাগিল। মেষপালক, আদি অবধি অন্ত পর্যন্ত এই ব্যাপার দেখিয়া, হাসিতে হাসিতে তথায় উপস্থিত হইল, এবয সেই নির্বোধ দাঁড়কাক গৃহে লইয়া গেল। মেষপালকের শিশু সন্তানের দেখিয়া জিজ্ঞাসার করিল, বাবা! তুমি আমাদের জন্যে ও কি পাখী আনিয়াছ? মেষপালক কহি, যদি তোমরা উহাকে জিজ্ঞাসা কর, ও বলিবেক, আমি ঈগল পক্ষী; কিন্তু আমি উহাকে দাঁড়কাক বলিয়া আনিয়াছি।
সিংহ ও নেকড়েবাঘ

একদি এক নেকড়ে বাঘ, খোঁয়াড় হইতে একটি মেষশাবক লইয়া যাইতেছিল। পথিমধ্যে এক সিংহের সহিত সাক্ষাৎ হওয়াতে, সিংহ বলপূর্বক ঐ মেষশাবক কাড়িয়া লইল। নেকড়ে কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল, পরে কিহল, এ অতি অবিচার; তুমি অন্যায় করিয়া, আমার বস্তু কাড়িয়া লইলে। সিংহ শুনিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিল, তুমি যেরূপ কথা কহিতেছ তাহাতে আমার বোধ হইতেছে, তুমি এই মেযশাবক অন্যায় করিয়া আন নাই, মেষপালক তোমায় উপহার দিয়াছিল।
মেষপালক ও নেকড়ে বাঘ

এক মেষপালক, একটি মেষ কাটিয়া পাক করিয়া আত্মীয়দিগের সহিত আহার ও আমোদ-আহলাদ করিতেছে; এমন সময়ে এক নেকড়ে বাঘ, নিকট দিয়া চলিয়া যাইতেছিল। সে মেষপালক, মেষের মাংস ভক্ষণে আমোদ করিতে দেখিয়া কহিল, ভাই হে! যদি আমায় ঐ মেষের মাংস খাইতে দেখিতে, তাহা হইলে তুমি কতই হাঙ্গামা করিতে।
মানুষের স্বভাব এই, অন্যকে যে কর্ম করিতে দেখিলে গালাগালি দিয়া থাকে, আপনারা সেই কর্ম করিয়া দোষ বোধ করে না।
শৃগাল ও কৃষক

ব্যাধগণে ও তাহাদের কুকুরে তাড়াতাড়ি করাতে, এক শৃগাল, অতি দ্রুত দৌড়িয়া গিয়া, কোনও কৃষকের নিকট উপস্থিত হইল, এবং কহিল, ভাই। যদি তুমি কৃপা করিয়া আশ্রয় দাও তবে এ যাত্রা আমার পরিত্রাণ হয়। কৃষক কহিল, তোমার ভয় নাই, আমার কুটীরে লুকাইয়া থাক। এই বলিয়া সে আপন কুটীরে দেখাইয়া দিল। শৃগাল, কুটীরে প্রবেশ করিয়া এক কোণে লুকাইয়া রহিল। ব্যাধেরা, অবিলম্বে তথায় উপস্থিত হইয়া, কৃষককে জিজ্ঞাসিল, ওহে ভাই! এ দিকে একটা শিয়াল আসিয়াছিল, কোন দিকে গেল, বলিতে পার? সে কিছুই না বলিয়া কুটীরে আঙ্গুলি প্রয়োগ করিল। তাহারা কৃষকের সঙ্কেত বুঝিতে না পারিয়া, চলিয়ে গেল।
ব্যাধেরা প্রস্থান করিলে পর, শৃগাল কুটীর হউতে বহির্গত হইয়া চুপে চুপে চলিয়া যাইতে লাগিল। ইহা দেখিয়া কৃষক; ভর্ৎসনা করিয়া শৃগালকে কহিল, যা হউক ভাই। তুমি বড় অভদ্র; আমি বিপদের সময় আশ্রয় দিয়া তোমার প্রাণরক্ষা করিলাম। কিন্তু, তুমি যাইবার সময় আমায় একটা কথার সম্ভাষণও করিলে না। শৃগাল কহিল, ভাই হে! তুমি কথায় যেমন ভদ্রতা করিয়াছিলে, যদি অঙ্গুলিতেও সেইরূপ ভদ্রতা করিতে, তাহা হইলে আমিও তোমার নিকট বিদায় না লইয়া, কদাচ, কুটীর হইতে চলিয়া যাইতাম না।
এক কথায় যত মন্দ হয়, এক ইঙ্গিতেও তত মন্দ হইতে পারে।


পাঠকের মন্তব্য