‘ভালো আছি, ভালো থেকো’--কোন সমসাময়িক কবিতা গান হয়ে এতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তার নজির স্বাধীন বাংলাদেশে খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। ‘তোমাকে চাই’ ছবিতে সালমান শাহ এই গানে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন ‘৯৬ সালে। অথচ তারও অনেক আগেই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতাটি গান হয়ে গিয়েছিল। কবিতাকে গান বানিয়েছিলেন রুদ্র নিজেই, তার গানের দল ‘অন্তর বাঁজাও’কে সাথে নিয়ে।

আশির দশকের শেষ দিকে রুদ্র তার গানের দল নিয়ে গানটি গেয়েছেন অনেক জায়গায়। হুট করে ৯১ সালে রুদ্র চলে গেলেন সবাইকে ছেড়ে। তখনো ‘অন্তর বাঁজাও’ গানটি করত, গাইতেন বিপ্লব চক্রবর্তী। ৯০ এর দশকে যখন বাংলাদেশে ব্যান্ড গানের একরকম জোয়ার শুরু হলো, তখন অন্য অনেকের মতো করে আবু মহসিনও ব্যান্ড দল নিয়ে ভাবনা শুরু করলেন। রুদ্রের এই চমৎকার কবিতার অদ্ভুত সুন্দর গানটি সবার মাঝে নিয়ে আসার ব্যাপারটিতে আবু মহসিন আর তার ব্যান্ডদল ‘তীর্থক’-এর অবদানটাও কম না একেবারে। তীর্থকের অ্যালবাম ‘দুয়ারী’তেই গানটি প্রথম মুক্তি পায়। কিন্তু ব্যাপারটি ভাল-মন্দ সবকিছু মিলিয়ে একেবারে মিশ্র ব্যাপার ছিল। আবু মহসিনের নিজের লেখাতেই এসেছে ব্যাপারটি। খানিকটা পরিমার্জিত রূপে লেখাটি থাকছে eআরকির পাঠকদের জন্য--
গানটা রুদ্রের গলাতেই প্রথম শুনি, বাংলা একাডেমির এক আড্ডায়। গানটির কথা সুর সবই ছিলো অত্যন্ত আধুনিক। গানটি রুদ্র উনার নিজের দল 'অন্তর বাজাঁও'-কে নিয়ে করতে চাইতেন। হঠাৎ রুদ্রের মৃত্যুতে সবকিছু আড়ালে চলে যায়। ৯১ সালের ১৬ই অক্টোবরে রুদ্রের কিছু সুহৃদ মিলে আর্ট কলেজে রুদ্র স্মরণে অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন। বিভিন্ন আলোচনার পর ঐ অনুষ্ঠানে বিপ্লব চক্রবর্তী গাইলেন ‘ভালো আছি, ভালো থেকো’। বিপ্লবের আসাধারন পরিবেশনা এক মূহুর্তেই গানটিকে ঐ সময়ের তরুণরা লুফে নিলেন। আমার আজো বিশ্বাস বিপ্লবের কন্ঠে শুধুমাত্র বাঁশী, ঠোল, দোতারা আর মন্দিরা সহযোগে করা গানটি যারা ঐদিন শুনেছেন, তারা কখনো ঐদিনের ঐ গান ভুলতে পারবেন না।
ঐ সময়ে আমাদের নিয়মিত আড্ডা পাবলিক লাইব্রেরিতে। গানটা পাবার লোভে একসময় চাতুর্য্যের আশ্রয় নিলাম। বিপ্লবদাকে দিয়ে প্রথমে পাবলিক লাইব্রেরির ক্যান্টিনের পিছনে, পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কামালউদ্দীন হলে আমার রুমে আড্ডার ছলে তার কণ্ঠে কয়েকটি গান ক্যাসেটে রেকর্ড করিয়ে রাখি। যার একটি ছিল ‘ভালো আছি, ভালো থেকো’।

৯১ সালের শেষ দিকে অডিও আর্ট স্টুডিওতে গানগুলো রেকর্ডের কাজ শুরু করি এবং পরে ওদের মাধ্যমেই ‘সঙ্গীতা’র কাছে বিক্রি করি। ‘সঙ্গীতা’ ঈদে গানটা মুক্তির বিজ্ঞাপন ছাপে বিভিন্ন পত্রিকা আর ঈদ সংখ্যায়। ঐ ঈদের সময় ব্যান্ডের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে দেখি মনি জামান সিম্ফনী ব্যান্ড নিয়ে গানটা করছে। সময়টা ৯২ সালের জুন মাস। তখন টিভি বলতে বিটিভি। ছুটে গেলাম অডিও আর্টে। ওখানকার ঐ সময়ের কর্মচারী মোস্তফা ভাই আর শামীম (বর্তমানে বিখ্যাত শব্দকৌশলী) জানালেন ‘চোরের উপর বাটপারীর’ এক ইতিহাস। মনি জামান ঈদের ব্যান্ড শোর আগে অডিও আর্ট থেকে আমাদের করা গানটা শুনে ঐ স্টুডিওতেই একটু ভিন্ন সুরে রেকর্ড করে টিভিতে করলো। আমরা সংগ্রহের সময় গানটির কথায় যে ভুলগুলো করেছিলাম, ‘সিম্ফনী’ ভুল আরও বাড়িয়ে অন্য ঢঙে তা পরিবেশন করে। বাণীর এই পরিবর্তন নিয়ে ঐ সময় ‘আনন্দ বিচাত্রা’য় বিস্তারিত আলোচনা হয়। গানটির মূল কথা, তীর্থকের আর ‘সিম্ফনী’র গাওয়া কথা পাশাপাশি ছাপায়। আলোচনায় তীর্থকের করা গানটিকেই গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হয়। (আনন্দ বিচিত্রা, সংখ্যা ১৪১, ১-১৫ অক্টোবর ১৯৯২)।


পাঠকের মন্তব্য