স্লোগানগুলো শুনতে মজার মতো হলেও, সেগুলো বলতে থাকা নারীদের মতোই কাউকে ছাড় দিচ্ছিল না। কেউ বলছিল, "Ek Kachori Do Samosa, In Mardo Ka Kya Bharosa"। আবার কেউ বলছিল, "Thandi Chai Garam Karo, Mard Jaat Sharam Karo"।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একের পর এক ক্যাম্পাসে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দ্রুত ক্যাম্পাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। এলএসআর, মিরান্ডা হাউস, গার্গি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কলেজ ফর উইমেনসহ আরও কয়েকটি কলেজেও বিক্ষোভ হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দিল্লিতে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। এর মধ্যে রয়েছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি পাবলিক পার্কে পুলিশ সেজে আসা তিনজনের বিরুদ্ধে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীকে গণধর্ষণের অভিযোগ।
ঘটনাটি ঘটে ২১ সেপ্টেম্বর, কালকাজি মন্দিরের কাছে আস্থা কুঞ্জ পার্কে, লেডি শ্রীরাম কলেজ (এলএসআর) থেকে মাত্র ৫০ মিটার দূরে। শিক্ষার্থীদের বিবৃতি অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পুলিশ সেজে এসে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বন্দুক ঠেকিয়ে কিশোরীকে নির্যাতন করে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানবাধিকার গবেষণা সংস্থা HRRC-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর উত্তর-পশ্চিম দিল্লির স্বরূপ নগরে চারজনের হাতে ১৬ বছর বয়সী আরেক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অন্তত চারজন নাবালিকার ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যেই সম্প্রতি গ্রেটার নয়ডাগামী একটি বাসে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে গণধর্ষণের অভিযোগ ওঠে।
কিন্তু এবারের আন্দোলনের কথাটা শুধু ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই’ নয়। বরং প্রশ্নটা আরও বেশি অস্বস্তিকর: নিরাপদ থাকতে হলে মেয়েদেরই কেন রাতের রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে?
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ) সূর্যাস্তের পর পার্কে নারীদের প্রবেশ সীমিত করার পথে হেঁটেছে। অর্থাৎ, অপরাধের জবাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে নারীদের ওপরই। এই যুক্তির বিরুদ্ধেই আন্দোলনকারীদের প্রতিবাদ। তাঁদের বক্তব্য, নিরাপত্তার নামে নারীকে ঘরে আটকে রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না।
২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবাদে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী অংশ নেন বলে জানায় The Indian Express। ওই দিন কালকাজির ঘটনার প্রতিবাদে এলএসআরের শতাধিক শিক্ষার্থী মিছিল করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশ এসডিএম অফিসের কাছে মিছিল থামিয়ে দেয় এবং প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
মিছিলের পর তাঁরা ‘Declaration of Demands for Delhi’ নামে একটি দাবিনামা প্রকাশের কথা জানান। দুদিন পর আবারও মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি ছিল, শুধু অভিযুক্তদের শাস্তি দিলেই হবে না। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নিরাপদ গণপরিসর গড়ে তুলতে হবে।
২৮ সেপ্টেম্বর মিরান্ডা হাউসের শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ‘Hum Auratein Aazad Hain’ নামে একটি সংহতি মিছিলের আয়োজন করেন।
প্রথমে ৩০০ থেকে ৪০০ জন আসবেন বলে ধারণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। একের পর এক স্লোগান ওঠে, ‘Naari apne aap ki, nahi kisi ke baap ki।’ অর্থাৎ, নারী নিজের, কারও সম্পত্তি নয়।
আরেকটি স্লোগান ছিল, ‘Raja beta rapist hai।’ মজার ছলে বানানো স্লোগানও বাদ যায়নি।
২৯ সেপ্টেম্বর বৃষ্টির মধ্যেও মিরান্ডা হাউস থেকে ফ্যাকাল্টি অব আর্টস পর্যন্ত মিছিল হয়।
হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড। একটিতে লেখা ছিল, ‘Raaton par bhi haq hai hamara।’ আরেকটিতে, ‘Imagine your behen beti first।’ কেউ আবার লিখেছিলেন, ‘The baddest bitches ain’t in LA, we are here in India fighting for rights।’
আন্দোলনটা শুধু মিছিলের মঞ্চে আটকে নেই। যে শহরে মেয়েরা প্রতিদিন চলাফেরা করেন, সেই শহরের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলনের ভাষা।
পরদিন, বুধবার, স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) সদস্যরা আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিতে দিল্লি সচিবালয় অভিমুখে মিছিল করেন। এর পর লেফটেন্যান্ট গভর্নর মহিলা কলেজগুলোর আশপাশে টহল বাড়ানো, আলো ও সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পরিবহনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, তাঁরা শুধু পুলিশি নজরদারি বাড়ানো নয়, এমন নিরাপত্তা চান, যার বোঝা নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তাঁদের দাবির তালিকায় আরও রয়েছে বেশি সংখ্যায় ডিটিসি বাস ও শাটল সার্ভিস চালু করা, কার্যকর পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করা এবং যাতায়াতের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পরিবহনব্যবস্থার উন্নতি করা।
দিল্লির কুখ্যাত নির্ভয়া ধর্ষণ মামলার পর কেটে গেছে প্রায় ১৪ বছর। সেই ঘটনায় এক তরুণী বাসে গণধর্ষণের শিকার হন এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। এরপর একাধিক আইন পরিবর্তন করা হয়েছে, দেওয়া হয়েছে নানা সরকারি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু নারীদের বক্তব্য, পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। তাঁদের কাছে ভারতের রাস্তাঘাট, বিশেষ করে দিল্লির রাস্তাগুলো, এখনও আগের মতোই অনিরাপদ।
নির্ভয়া-পরবর্তী সময়ে গঠিত বিচারপতি ভার্মা কমিটির সুপারিশের কথা তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা বলছেন, নারীদের চলাচল সীমিত করে যৌন সহিংসতার মূল কারণগুলোর সমাধান করা যায় না।
এত বছর পরও যদি নারীর নিরাপত্তা নিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন উঠতে থাকে, তাহলে এত আইন, এত আলোচনা আর এত প্রতিবাদের পর পরিবর্তনটা ঠিক কোথায়, তা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
১ অক্টোবর রাত। দিল্লির বসন্ত কুঞ্জের রাস্তায় হাঁটছেন প্রায় ৬০ জন নারী। কারও পরনে জিনস, কারও কুর্তা। কারও হাতে ছাতা, কারও হাতে প্ল্যাকার্ড। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আইনজীবী, মনোচিকিৎসক ও লেখকরাও।
এই পদযাত্রার আয়োজন করেছিল ‘Women Walk at Midnight’ নামের একটি উদ্যোগ, যা প্রায় এক দশক আগে শুরু হয়েছিল। নির্ভয়া-পরবর্তী আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত এই উদ্যোগের দিল্লি শাখার সংগঠকদের লক্ষ্য হলো, গভীর রাতে নারীদের বাইরে থাকাকে দৃশ্যমান ও পরিচিত করে তোলা, যাতে একসময় এটি আর অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা বলে মনে না হয়।
দীর্ঘদিনের সংগঠক মল্লিকা তানেজা বলেন, ‘আমরা নির্ভয়া, উন্নাও, আরজি কর দেখেছি, আর এখন শহরে আছড়ে পড়া প্রতিবাদের এই বর্তমান ঢেউ। প্রতিবারই মনে হয়, আমরা এক পা এগোলে হাজার পা পিছিয়ে যাই।’
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘একজন নারী একা হাঁটতে পারবে কি না, এই প্রশ্নটা আমাদের এখনও কেন করতে হচ্ছে?’
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় বসন্ত আর্কেড থেকে পদযাত্রাটি শুরু হয়। বাজারে নারীরা বন্ধ দোকানগুলোর সামনে থামেন। ফুটপাতে লম্বা কাগজ বিছিয়ে ক্যাম্পিং ল্যাম্প ও ফোনের স্ক্রিনের আলোয় আঁকতে শুরু করেন তাঁরা।
একজন অংশগ্রহণকারীর হাতে ছিল একটি প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা, ‘If Day Can Be Ours, Night Is Too।’ অর্থাৎ, দিন যদি আমাদের হতে পারে, রাতও আমাদের।
একই দিন, ১ অক্টোবর, রাজধানী কলেজ থেকে শিবাজী কলেজ অভিমুখে শুধু নারীদের অংশগ্রহণে একটি মিছিলও হয়। আয়োজকদের পোস্টারে লেখা ছিল, প্রতিবাদটি শিক্ষার্থীদের নিজেদের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছে এবং এতে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের অংশগ্রহণ নেই।
২ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে ৩০০-র বেশি নারী গোলাপি পোশাক পরে হাতে মশাল নিয়ে রাস্তায় হাঁটেন।
এই কর্মসূচিটি ‘Why Loiter’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর লক্ষ্য ছিল, জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতিকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখার প্রবণতা বদলে দেওয়া।
একই সময়ে দিল্লির বাইরে মুম্বাই, গুয়াহাটি, পানাজি, কলকাতা ও ভুবনেশ্বরেও নারী নিরাপত্তা ও গণপরিসরে নারীদের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হয়।
দিল্লির একটি ক্যাম্পাসে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ধীরে ধীরে অন্য শহরের নারীদেরও নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলার জায়গা তৈরি করে দিয়েছে।
পারফর্মার, থিয়েটারশিল্পী ও নৃত্যশিল্পী দৃষ্টি ২০২৩ সালে এই পদযাত্রার ফরিদাবাদ পর্ব শুরু করেছিলেন। তিনি জানান, একসময় রাতে বাইরে যাওয়ার জন্য তাঁকে বাড়িতে অনেক বোঝাতে হতো।
দৃষ্টি বলেন, ‘পরের দিনের জন্য জিনিসপত্র গুছিয়ে, বাড়িতে কিছুক্ষণ শুয়ে-বসে থাকতে হতো।’
তাকে প্রশ্ন করা হতো, দিনের বেলা হাঁটতে পারেন না কেন? রাতে কেন হাঁটতে হবে?
তিনি জানান, একপর্যায়ে তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তবে মাত্র আধা ঘণ্টার জন্য।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বসুন্ধরার কাছে এই পদযাত্রা ছিল জনপরিসর ও সমাজে নারীদের নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার স্বাধীনতার প্রতীক।
তিনি বলেন, ‘নারীরা সর্বত্রই আছেন, কিন্তু ক্ষমতার পদে আমাদের উপস্থিতি প্রায়ই নামমাত্র হয়ে থাকে। নিজেদের সঠিকভাবে তুলে ধরার সুযোগ আমরা খুব কমই পাই।’
আন্দোলন এখনও থামেনি। সম্প্রতি এসএফআই ‘Reclaim the Night’ প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে গ্রেটার নয়ডাগামী বাসে গণধর্ষণের অভিযোগের প্রতিবাদে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে গভীর রাতে মিছিল করেছে।
একই সঙ্গে তারা ‘Women Students’ Manifesto’ প্রকাশ করেছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডুসু) নির্বাচনের আগে নারী নিরাপত্তা, প্রতিনিধিত্ব ও লিঙ্গ-ন্যায়বিচারকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ডুসু নির্বাচনে সব মহিলা কলেজের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, ছাত্র সংসদের পদগুলোতে ৫০ শতাংশ নারী সংরক্ষণ, ছাত্র প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে কার্যকর অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি (আইসিসি) গঠন, ক্যাম্পাসে নারী পুলিশ মোতায়েন এবং নিয়মিত স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা। মিছিলকারীরা সন্ধ্যার পর নারী শিক্ষার্থীদের ঘরের ভেতরে থাকার বাধ্যবাধকতারও বিরোধিতা করেন।
দিল্লির সাম্প্রতিক প্রতিবাদ শুধু একটি অপরাধের বিচার চাওয়ার মধ্যে আটকে নেই। শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে নিরাপদ রাস্তা, পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ গণপরিবহন, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এই দাবিগুলো নতুন নয়। ২০১২ সালের নির্ভয়া কাণ্ডের পরও নারীর নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে আন্দোলন হয়েছিল। আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল, নানা প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। তবু নতুন কোনো ঘটনা সামনে এলেই আবারও শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে।
মেয়েদের রাতের রাস্তা এড়িয়ে চলতে শেখানোর ১৪ বছর পর এবার শহরগুলোকে শেখানোর সময় এসেছে, মেয়েদের নয়, অপরাধীদের ভয় পাওয়ার কথা।







পাঠকের মন্তব্য