আলো আসবেই’ গ্রুপকে টপিক না দিয়ে, তরুণরা আসল রাজনীতিতে ফিরুক

৪৯ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে

 

আওয়ামী লীগ ও বাম একাংশের রাজনীতিতে ফেরার জন্য তাদের নির্মিত আইকনগুলোর ওপর আঘাত প্রয়োজন হয়। এই আইকন তিনটি: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ।

তরুণ প্রজন্মের উচিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচক মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু আর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক কথা না বলা। নেতিবাচক কথা বলা মানেই ২০০৯-২৪ (৫ আগস্ট) পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করা ও একে জোর গলায় সমর্থন করা খুনেদের আন্দোলনের স্পেস করে দেওয়া।

কট্টর ইসলামপন্থীদের সামনে মহানবী, হিজাব-সম্পর্কিত কোনো নেতিবাচক আলোচনা করলে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে লাগে; কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের সামনে যেমন দেবদেবী, ধর্মীয় চিহ্নসম্বলিত পোশাক ও মেকআপ নিয়ে কথা বললে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে লাগে; আওয়ামী লীগ ও বাম একাংশের রয়েছে তেমনি প্রবল চেতনা-বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ অনুভূতি। এ দেশে ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি সবই পালিত হয় ধর্মীয় আঙ্গিকে।

ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের সমাজে ধর্ম, ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে খোলা মনে প্রশ্ন করা যায়; আমাদের পশ্চাৎপদ সমাজে সেটা সম্ভব নয়।

এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই নতুন প্রজন্মকে সমাজ উত্তরণের জন্য কাজ করতে হবে। ফোকাস করতে হবে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। রাষ্ট্র সংস্কার, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা, স্বজনপ্রীতি, পেশিশক্তি ব্যবহার করে চাঁদা আদায়; এই বিষয়গুলো হচ্ছে প্রায়োরিটি। সেগুলো ফেলে কালচারাল ওয়ারের ফাঁদে পা দিলে আওয়ামী লীগ ও বামের একাংশ শক্তিসঞ্চয় করবে। আর ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার সেই কালচারাল ওয়ারের পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে 'রাষ্ট্রদ্রোহ' মামলা বিষয়টাকে ডালভাত করে ফেলবে। দেশের মূল সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদ ও বিতর্ক না করে বিমূর্ত কালচারাল ওয়ার করলে সবচেয়ে লাভবান হবে ক্ষমতাসীন সরকার।

ইন্ডিয়ার দিল্লিতে ককরোচদের আন্দোলনকে ঘিরে গত দু-দিনে বাংলাদেশের মুসলমান নামের হিন্দুত্ববাদী মননের লোকেদের মাঝে ককরোচদের প্রতি ক্ষোভ ও রক্ততৃষ্ণা লক্ষ্য করা গেছে। এ সেই ২০২৪-এর জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি তাদের রক্ততৃষ্ণার ধারাবাহিকতা। কী রকম বিষাক্ত সাপ নিয়ে আমাদের সমাজ বসে আছে, তা অনুধাবন করা যায় নরেন্দ্র মোদির প্রতি তাদের অন্ধভক্তি দেখে। বাংলাদেশে মোদির ছায়া উপনিবেশ ফিরিয়ে আনতে এরা মরিয়া। কাজেই কালচারাল ওয়ারের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌমত্বের যুদ্ধ তরুণ প্রজন্মের সামনে রয়েছে।

কালচার বিষয়টি বিশ্বায়িত হয়েছে। নেটফ্লিক্স ও বাংলাদেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এখন তরুণ প্রজন্মের বিনোদনের ঠিকানা। দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের অনুসঙ্গে গান গাওয়া, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, ফ্ল্যাশ মব ডান্স; এসবই সমসাময়িক কালচারাল অ্যাক্টিভিটিজ। দুলে দুলে রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত পরিবেশন এখন বাবার ধমকে ঈদের নামাজে যাওয়া-মায়ের ধমকে দাদা-নানার কবর জিয়ারত করার মতো ব্যাপার। এটা জগতেরই নিয়ম। ইউরোপেই বাপ-দাদার আমলের মতো অপেরা সংগীতের অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়ার চল নেই। বেটোফেন-মোৎসার্ট জাদুঘরের সজ্জা। জাস্টিন বিবারই নতুন প্রজন্মের চুল খুলে নাচার জায়গা। এরকম জগৎবাস্তবতায় প্রবীণ প্রজন্মের সঙ্গে কালচারাল ওয়ারে মত্ত হওয়া অনুচিত। প্রবীণেরা যে কয়টা দিন বাঁচবে, থাকুক না ফ্যামিলি অ্যালবাম দেখতে দেখতে রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত শোনার নস্টালজিয়ার মাঝে। তাদেরকে ঘাঁটাতে যাবার দরকার কী!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গল্প ও উপন্যাসে যেসব চরিত্রের লঘুতা ও হিপোক্রেসি নিয়ে লিখেছেন, হুবহু ওই চরিত্রগুলোই 'আগেই ভালো ছিলাম', 'আলো আসবেই', 'দাও ফিরিয়ে অরণ্য ত্রিবেদীদা' গ্রুপের সদস্য। রবীন্দ্রনাথ যাদের নিয়ে হেসেছেন, তারাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কাঁদে। রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ না করে শুধু রবীন্দ্র রচনাবলি হাতে সোফায় বসে ছবি তুললে আর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পোশাক পরে নব্য জমিদারের ভণ ধরলে এমন কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

তরুণ প্রজন্মের যখন 'জুলাই সনদ' নিয়ে কথা বলা দরকার, তখন তাদের কেউ কেউ গেছে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দিতে। অমনি জুলাইয়ের পরাজিত শক্তি বড় মুখ করে ফেসবুকে চলে এসেছে। কথা বলার একটা টপিক পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির গুণে এমন একটি স্থানে রয়েছেন; তাঁর ছবিতে কালি দিলে তাঁর সুকৃতিতে মালিন্য আসে না।

ইসলামপন্থীরা যেমন বুঝতে চায় না, মহানবী তাঁর স্বীয় কর্মগুণে এমন উচ্চতায় স্থান পেয়েছেন যে মুসলমান শরীরে হিন্দুত্ববাদী মননের কেউ তাঁর দিকে গোবর ছুড়লে তাতে মহানবীর সুকৃতিতে মালিন্য আসে না। ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের ভাবমূর্তি পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো ফ্যান ক্লাব প্রয়োজন হয় না। ফ্যান ক্লাব দরকার হয় হাসিনা ও মোদির মতো ক্ষুদ্র মানুষদের ভাবমূর্তি পাহারা দিতে।

রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লাগানোর দায়ে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়েছে। আসলে বিএনপি তার নেতা ও মন্ত্রীদের ছবিতে যেন কেউ কালি না দেয়, সেটা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাকে ডালভাত করছে। যে অপরাধে তরুণদের কাউন্সেলিং করে বুঝিয়ে ছেড়ে দেওয়া যায়; রবীন্দ্রনাথের 'ঘরে বাইরে' উপন্যাস পড়িয়ে বা সত্যজিৎ রায়ের তৈরি 'ঘরে বাইরে' ছবিটি দেখিয়ে বলা যায়, এই দেখো, উনি 'কালচারাল মামা-খালাদের ভণ্ডামি ও লঘুতার চিত্র এঁকে গেছেন'; সেই অপরাধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার মাঝে ফ্যাসিজমের রেড ফ্ল্যাগ দেখা যায়।

৪৯ পঠিত ০ ... ১০ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​