গত দুদিন ধরে ফোন স্ক্রল করতেই পারছি না! যেখানেই যাই, সেখানেই জান্নাতুল তাজমিনের খবর! দুমড়ানো ধানক্ষেতের ছবি, আরও কী কী! আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। আমি মা মানুষ, তার ওপর নিজে মেয়ে! তাই পালিয়ে বাঁচি!
আজ সকালে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলাম, আজ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। খুব হাসি পেল। অন্য জাতির কথা আমি জানি না, আমার কাছে আমার দেশটাই আস্ত দুনিয়া! কিন্তু আমার দুনিয়ার এ কী অবস্থা? দিবসটা দেখে মনে হলো, আমাদের দেশটাকে ভেঙাতেই যেন এসেছে সে!
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস! নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষা, সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের এমপাওয়ারমেন্টই এর মূল কথা! হাসি তো পাওয়ারই কথা, তাই না?
স্ট্যাট বলছে, গত এক মাসে সারা দেশে মোট ২৩৬ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রেইপড হয়েছেন ৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু। এই ৭৯ জনের মধ্যে আবার ৪৭ জনই শিশু ও কিশোরী! যা মোট সংখ্যাটার ৬০%। কী? মনে হচ্ছে না যে আমরা আমাদের মেয়েদের জন্য নিরাপত্তা কোলে নিয়ে বসে আছি?
এবার আরও এগোই। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ধর্ষণের শিকার ৪০৪ জন, যার ২৩৮ জনই শিশু-কিশোরী। ৫৯%! কমই তো, বলুন? হান্ড্রেড পারসেন্ট তো হয়নি এখনো! হাউকাউয়ের কী আছে এত?
শেষ হয়নি কিন্তু! গণধর্ষণের শিকার ৮৮ জন নারীর একটা বড় অংশ বাচ্চারা। রেইপ করার পর মেরে ফেলা হয়েছে ১৭ জন নারী ও শিশুকে! কুমিল্লার তাজমিন যার লেটেস্ট এডিশন!
গত এক মাসে মোলেস্টেশন ও হ্যারাসমেন্টের শিকার হওয়া মোট ৪৯ জনের মধ্যে ২৫ জনই ছিল শিশু ও কিশোরী। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, জানুয়ারি-জুলাই মাসে ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়, যার মধ্যে ২,০৩৮ জন শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫-৬০%ই কন্যাশিশু।
অন্যান্য নানা হয়রানি, সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইলিং, এসব তো ডালভাত। নানা কারণে মেয়ে বাচ্চারা বাসা থেকে বাইরে বেরিয়ে আর ফিরে আসছে না। গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজন কন্যাশিশুর রহস্যজনক ডেডবডি উদ্ধার করা হয়েছে, যার পেছনের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে পারিবারিক চাপ বা সামহাউ বুলিং।
ঘরে একটা মেয়ে আছে মানেই হলো, সারাক্ষণ থাকো আতঙ্কে! স্কুলে যাবে, ওখানে বিপদ। কে কোন ফাঁদ পেতে আছে, কে জানে! বিকেলে খেলতে মাঠে যাবে, আর ফিরবে না। চিপস, চকোলেট কিনতে যাবে, দোকানি ধরে ফেলবে! স্কুলে যাবে, প্লেন ক্র্যাশ করে স্কুল ধসে পড়বে, মেয়ে হাপিস! বোনের বাড়ি বেড়াতে যাবে, ফিরবে লাশ হয়ে! দরকার কী, বাবা!
তাহলে কী? ঘরবন্দী করে রাখি, তাই না? সেখানেও কি সেফটি আছে? একদম জিরো সাইজ থেকে শুরু করে কত বয়স পর্যন্ত মেয়েরা ঘরেই হ্যারাসড, মোলেস্টেড আর রেইপড হচ্ছে, তার কি কোনো লিমিট আছে? তারপর আছে পরিচিত মহল! কই যাবে মেয়েটা? মেয়েরা?
তাহলে কী উপায়? আরে, আছে আছে! উপায় অবশ্যই আছে। বাচ্চা নেওয়াটাই বন্ধ করে দিতে হবে। বাচ্চা নিলেই মেয়েবাবু চলে আসবে কোনো না কোনো ফাঁকে। আর শুরু হবে হয়রানি। ওরও লাইফ শেষ, ওর বাপ-মায়েরও!
আর দেশে এখন শার্লক হোমস, এরকুল পোয়ারো, ফেলুদা, এনাদের বড়ই প্রয়োজন! কেন? যে মেয়েগুলো দুনিয়ায় চলে এসেছে আগেভাগেই, তাদের বাঁচাতে। আমাদেরই তো ওরা, বাঁচাতে হবে না? মহামান্য আইন আঙুল চুষবেন! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধানের গান গাইবেন! প্রধানমন্ত্রী দেড়শ টাকার মিল খেয়ে দেশ উদ্ধার করবেন! বিরোধী দল মেয়েদের ব্যাপারে ‘কানে দিয়েছি তুলো, পিঠে বেঁধেছি কুলো’ থিওরি জাপটে ধরে রাখবেন। আইনমন্ত্রী সুকুমার রায়ের মতো হ-য-ব-র-ল বলতে থাকবেন, আর আমাদের মেয়েগুলো অকালে ঝরে যাবে! আর যা-ই হোক, এই বিখ্যাত ডিটেকটিভরা কখনো বিফল তো হননি! পারলে ওনারাই আমাদের মেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন! সো, উই নিড দেম ব্যাডলি!
এ দেশে মেয়েদের অধিকার রক্ষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। এমপাওয়ারমেন্ট আছে, সেটা মেয়েদেরই নাকে-মুখে রক্ত তুলে সেট করা। আর বাকি তাদের নিরাপত্তা! সে বাণী তো আগেই ঝেড়ে এলাম! তাহলে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে এ দেশের কাজটা কী? ঢাকঢোল পিটিয়ে দিবসটা উদযাপন করো; বাকি যা চলছিল, তা চলছে, চলবেই!
আমাদের দেশে ছেলে ও মেয়ে শিশুর অনুপাত ১০৫.৯৮ : ১০০। মানে শতকরা ৫১.৫% ছেলেশিশু আর ৪৮.৫% মেয়েশিশু। অলমোস্ট হাফ! চারপাশে দানবের ঘেরাটোপে আমরা কত দিন আমাদের মেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব? আর যারা আমাদের ছেড়ে গেছে, তাদের বিচার? কী হবে?
বাজনা যা বাজার বাজুক, বয়রার সুবিধাই এটা যে সে কানে শুনতে পায় না!
এ দেশে আইন-বিচার তো প্রহসন মাত্র, কিন্তু জানগুলো তো সত্যি!
(তথ্যসূত্র: Human Rights Support Society, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন, BBS, The Daily Star, Dhaka Tribune, প্রথম আলো, ইত্তেফাক)



পাঠকের মন্তব্য