যুদ্ধটা করে বড় বড় নেতারা, মরতে হয় সাধারণ মানুষকে। নেতারা বসে বসে হিসাব করে কয়টা মিসাইল মারলে শত্রুর কত ক্ষতি হবে, আর সাধারণ মানুষ হিসাব করে রাতে বেঁচে ঘুমাতে পারবে কি না।
ইয়েমেন আর সৌদি আরবের কাহিনিটাও অনেকটা এমন। একদিকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে হুতি বিদ্রোহীরা। এক পক্ষ অবরোধ দেয়, আরেক পক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এক পক্ষ বলে আত্মরক্ষা, আরেক পক্ষ বলে প্রতিশোধ। দুই পক্ষেরই মুখে বড় বড় যুক্তি। খালি মাঝখানে যে মানুষগুলা মরতেছে, তাদের যুক্তি দেওয়ার সুযোগটাই আর থাকে না।
হুতিদের বক্তব্য, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের অবরোধ আর হামলার জবাব দিতেই তারা পাল্টা আঘাত হানতেছে। সৌদি আরবের তেল, বিমানবন্দর আর অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারলে সরকার আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। মানে শত্রুর পকেটে চাপ দাও, আকাশে মিসাইল পাঠাও, অর্থনীতি অচল করে দাও। এই যে যুদ্ধের বিজনেস প্ল্যান, এর মধ্যে সাধারণ মানুষগুলা যে পড়ে আছে, তাদের কথা সম্ভবত এক্সেল শিটে তোলা হয় নাই।
অন্যদিকে সৌদি জোটও ইয়েমেনে হামলা চালাইছে, আর বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আছে। ফলে এক পক্ষের হামলার জবাবে আরেক পক্ষ হামলা চালায়, তারপর প্রথম পক্ষ আবার নতুন হামলার কারণ খুঁজে পায়। এইভাবে যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধেরও একটা চমৎকার সিস্টেম আছে। কেউ কাউকে মাফ করে না, কেউ নিজের দোষ স্বীকার করে না, আর সাধারণ মানুষের লাশের হিসাবটা শেষ পর্যন্ত অন্য কারও প্রেস কনফারেন্সে দুই লাইনে শেষ হয়ে যায়।
এর মধ্যে বিমানবন্দরেও হামলা হলে বিপদে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা। মানুষটা হয়তো কোথাও চাকরি করতে যাইতেছিল, কেউ পরিবারের কাছে ফিরতেছিল, কেউ চিকিৎসার জন্য যাইতেছিল। কিন্তু মিসাইল তো আর টিকিট দেখে আসে না। তার কাছে আপনি সৌদি, ইয়েমেনি, ধনী, গরিব, শিশু নাকি বৃদ্ধ, এসবের কোনো গুরুত্ব নাই।
আন্তর্জাতিক আইন বলে, বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছা করে টার্গেট করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে মনে হয়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আইনকানুনেরও ছুটি হয়ে যায়। সবাই নিজেদের হামলাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সুন্দর সুন্দর শব্দ খুঁজে পায়। আত্মরক্ষা, প্রতিশোধ, নিরাপত্তা, কৌশলগত লক্ষ্য। শব্দগুলা এত সুন্দর যে, মাঝেমধ্যে মনে হয় মানুষ মারারও বুঝি করপোরেট ভাষা আছে।
কেউ ইয়েমেনে বোমা ফেললে সেটা হয় নিরাপত্তার স্বার্থে, আর হুতিরা সৌদিতে হামলা করলে সেটা হয় প্রতিরোধের লড়াই। যার যার মিসাইল, তার তার ন্যারেটিভ। খালি মরে যাওয়া মানুষগুলার কোনো ন্যারেটিভ থাকে না। তারা আর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেদের পক্ষের যুক্তি বোঝাতে পারে না।
যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় যারা, তাদের বেশির ভাগই যুদ্ধক্ষেত্রে থাকে না। তাদের বাচ্চারা নিরাপদে থাকে, খাবার টেবিলে খাবার থাকে, রাতে ঘুমানোর জায়গা থাকে। আর যাদের নামে যুদ্ধ চালানো হয়, সেই সাধারণ মানুষগুলার ঘরবাড়ি উড়ে যায়। তারপর তাদেরই বলা হয়, দেশের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
দেশের স্বার্থটা আসলে কার স্বার্থ? যে মানুষটা বোমায় মারা গেল, তার কী লাভ হইলো? যে বাচ্চাটা পরিবার হারাইল, সে কোন বিজয়ের অংশীদার হইলো? আর যে মা সারারাত ছেলেকে বুকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বসে থাকল, তাকে কোন পক্ষের বিজয় উদ্যাপন করতে বলা হবে?
যুদ্ধ শেষে হয়তো কেউ বিজয় ঘোষণা করবে, কেউ নতুন চুক্তি করবে, কেউ আবার পরের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবে। কিন্তু যে মানুষগুলা আর ঘরে ফিরবে না, তাদের জন্য কোনো বিজয় মিছিল হবে না।
পৃথিবীতে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এটাই। মানুষ মারে একজন, দায় নেয় আরেকজন, ব্যাখ্যা দেয় তৃতীয়জন, আর লাশটা পড়ে থাকে এমন একজনের, যার যুদ্ধ চাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।



পাঠকের মন্তব্য