ন্যুডিস্ট কলোনি নাই, মঙ্গলে যাব না তাই

০ পঠিত ০ ... ১ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে

 

অফিসের দিনটা আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই প্যাঁচাল আর থমথমে সাইজের আটা-ময়দার গোল্লার মতো ছিল। এসিটা ফোঁস ফোঁস করে ঠান্ডা বাতাস ছাড়তেছে, কিবোর্ডের কটকট শব্দে ছন্দহীন একটা ক্যাফেইন-মার্কা পরিবেশ। আমি টাইপরাইটার-মার্কা ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখের পলক না ফেলে ঘাড় কুঁজো করে বসে আছি, ভাবছি জীবনের এই হিসাব-নিকাশের শেষ কোথায়। ঠিক এই টাইমে, একেবারে অপ্রস্তুত মুহূর্তে, বসের কেবিন থেকে ভেসে এলো একটা গলা। সুরটা কোনো চেনা বাণিজ্যিক পপ-পোকা না, একেবারে ভারী মন্ত্রের মতো একটা ওঁম ধ্বনি। মনে হলো কোনো সাধু মধ্যরাতে মহাকাশের শূন্যতার দিকে মুখ রেখে মন্ত্র পড়তেছে। কিন্তু সেকেন্ড পার হতেই সেই আধ্যাত্মিক ভাবের পিঠে সজোরে কষে এক চড় মারল গানের কথা, ওম মঙ্গল গ্রহে মানুষ থাকে না, বেড়াল থাকে না, সিন্ধুঘোটকও থাকে না...

আমি মাউসের ওপর থেকে হাতের আঙুল সরায়ে সোজা হয়ে বসলাম। বসের ল্যাপটপের স্পিকার থেকে চন্দ্রবিন্দুর সেই অদ্ভুত নাকি-নাকি শান্ত গলায় চন্দ্রবিন্দুর হুল ফোটানো লিরিক্স তখন এয়ারকন্ডিশন্ড বাতাসে আঠা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। পৃথিবীতে বেকারত্ব আছে, হকারের ফুটপাথ আছে, প্যান্টের ভাঁজে চোথা আছে, আর ডায়না-চার্লসের কিসসাও আছে, তাই কবি বলতেছেন চলো সোজা মঙ্গলে কেটে পড়ি! গানের সুরের ভেতর যে এমন নিঃশব্দে তীব্র বিষ আর মারাত্মক রস একসাথে মেখে রাখা যায়, এই গান না শুনলে বিশ্বাসই হতো না। পুরো ট্র্যাকটা যেন অফিসের গণ্ডি পেরিয়ে আমার খুলির ভেতর সোজা একটা নতুন গ্রহ তৈরি করে ফেলল। আমি কাজকম্ম সব শিকেয় তুলে দিয়ে বসের ল্যাপটপের দিকে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে রইলাম, এ তো গান না, এ যেন জীবনের চরম বাস্তবতার দলিল!

২

ল্যাপটপের কিবোর্ডে হাতের আঙুলগুলা স্থবির হয়ে রইল। আমার ঠিক পাশেই বস। সেখান থেকেই বাজছিল গানটা, এক অদ্ভুত, নির্ভার আর খ্যাপাটে মেজাজের সুর। আমি আর টান সহ্য করতে না পেরে একটু ঘাড় কাত করে বসের দিকে তাকালাম। কোনো পেঁচাল না পেঁচিয়ে, কাজকাম থামিয়ে সোজাসাপ্টা জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, গানটার নাম কী? বস স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে, একদম ক্যাজুয়াল টোনে সংক্ষেপে বললেন, চন্দ্রবিন্দুর মঙ্গল গ্রহ।

নামটা শুনেই মাথার ভেতর কেমন যেন একটা ধাক্কা মারল। আবার কান পাতলাম সেই স্পিকারের দিকে। লিরিক্সের ভেতর তখন একে একে নামতেছে সমাজের যত বিদঘুটে বাস্তবতা, বেকারের উৎপাত, বনধ ঢাকার যো, আর রাজনীতির প্যাঁচাল। গানের প্রথম সেই ধ্যানমগ্ন গম্ভীর ওঁম আওয়াজ থেকে শুরু করে এই কথ্য সুরের চাল, পুরো ব্যাপারটা বসের টেবিল ছাড়িয়ে আমার মাথার ভেতর সজোরে সাইরেন বাজাতে শুরু করল। একটা নাম জানার পরই গানটা যেন আমার মগজে সোজা শিকড় গেড়ে বসল!

৩

গানটা তখন মাঝপথে, আর আমার মগজের ভেতর ঘোর আরো ঘন হয়ে আসতেছে। একের পর এক বিচিত্র লাইনের ধাক্কা, ধেড়ে শিশু, আঁতেলের জিন্স প্যান্ট, কুষ্ঠরোগী আর শংকরাচার্য। পৃথিবীতে এত জঞ্জাল, এত যন্ত্রণা আর ক্যাচাল যে মঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতিই নাই। সুরের তালে তালে আমার মনও তখন একদম ব্যাগপত্র গুছিয়ে মঙ্গল গ্রহের দিকে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তখনই, গানটা শেষ মোচড় দিল। একটা দীর্ঘ টান মেরে গায়ক যখন হঠাৎ বলে উঠলেন, নেই ন্যুডিস্ট কলোনি, সেটা তো আগে বলো নি! অমনি পুরো কান্ডকারখানা এক নিমেষে উল্টে গেল।

পরের লাইনেই সটান ঘোষণা, যাব না মঙ্গলে না! আমি কিবোর্ডের দিকে চেয়ে থ মেরে গেলাম। এতক্ষণ ধরে এত নীতি-নৈতিকতা, রাজনীতি, দূষণ আর বেকারত্বের কচকচানি শোনানোর পর, শেষমেশ কিনা সামান্য একটা ন্যুডিস্ট কলোনি না থাকার অজুহাতে মঙ্গল গ্রহ বয়কট! এই একটা লাইনের মাস্টারস্ট্রোক পুরো গানটাকে এক চরম অ্যাবসার্ড আর তীক্ষ্ণ রূপ এনে দিল। পৃথিবী যতই পচা হোক, যতই ঝামেলা থাকুক, মানুষ তার ছোটখাটো ফ্যান্টাসি আর খামখেয়ালিপনার টানে এই পৃথিবীর চেনা নরকেই পড়ে থাকতে চায়, মঙ্গল গ্রহের স্বর্গে যেতে রাজি না!

৪

অফিসের বাকি পুরোটা সময় কীভাবে কাটল, আমার খেয়ালই ছিল না। বাড়ি ফেরার পথে আর রাতে ঘুমানোর আগে, ফোন খুলে সোজা হেডফোনে লুপে চালিয়ে দিলাম মঙ্গল গ্রহ। চায়ের টংয়ের হালকা ধোঁয়ার ভেতরে আর রাতের শহরের ক্লান্ত বাতিগুলোর দিকে তাকিয়ে শুনতে শুনতে মনে হলো, গানটা শুধুই একটা ব্যান্ড ট্র্যাক না, এটা একটা পুরো জ্যান্ত সাইকোলজি! একটা গান কীভাবে একাধারে অদ্ভুত হাসির খোরাক যোগায়, আবার বুকের ভেতর হালকা এক চিমটি বাস্তবতা এনে বিধে দেয়, তা ভেবে পুরো মাথা চক্কর দিচ্ছিল।

সেই যে সকালে বসের পাশ থেকে গানটার নাম জেনেছিলাম, সারাদিন পার হয়ে গিয়ে গভীর রাতেও গানটার প্রভাব বিন্দুমাত্র কমল না। চন্দ্রবিন্দুর এই গানের মাতলামি আর রসিকতা আমার মাথার নিউরনে একেবারে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসে গেল। পৃথিবীর সমস্ত ধানাইপানাই, ক্যাচাল আর অদ্ভুত নিয়মকানুন মাথার ওপর কিলবিল করলেও, এখন থেকে যখনই মেজাজ খিঁচে যাবে, একবার কানে হেডফোন গুঁজে মনে মনে শুধু গেয়ে উঠলেই চলবে, যাব না মঙ্গলে না, না না না মঙ্গলে না!

০ পঠিত ০ ... ১ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top ​