ডিয়ার সেন্সর বোর্ড, ইউ জাস্ট গট ট্রোলড বাই জহির রায়হান!

৬১১ পঠিত ... ১৬:৫২, আগস্ট ১৯, ২০২৬

 

১.

হা করে বসে আছি টিভির সামনে। এখনো হচ্ছে না কখন যে শুরু হবে! আজকে বিটিভিতে ‘জীবন থেকে নেয়া’ দেখাবে। আমরা ৮/১০টা বাচ্চা সেই কখন থেকে বসে আছি! গোসল, খাওয়া—সব শেষ। কোনো কাজ বাকি রাখিনি, যাতে মুভির মাঝে ঝামেলা না হয়!

ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। প্রতি শুক্রবার শুধু যুদ্ধের মুভি দেখায়। দেখি ঠিকই, কিন্তু বুঝি না কিছুই প্রায়! কিন্তু ‘জীবন থেকে নেয়া’র কথাই আলাদা। সেই মজা লাগে দেখতে। এক দজ্জাল মহিলা সবাইকে নাচিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে! কিছু হলেই ধুন্ধুমার! বাসন-কোসন আছড়ে পড়ছে, কইমাছ ছিটকে পড়ে লাফাচ্ছে! হাসতে হাসতে জীবন শেষ! যুদ্ধ আছে, কিন্তু সেটাও বোঝা যায়। আজ মজা হবে!

ছোটবেলার অসংখ্য যুদ্ধের মুভির মধ্যে এটা আমাদের বাচ্চাদের সবচেয়ে প্রিয় ছিল! কিন্তু একটু বড় হয়ে বুঝলাম, যুদ্ধের মুভি এটা না। এর পটভূমি ভাষা আন্দোলন আর ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু কী এক মুভি! ছোটবেলায় দেখতাম যতটুকু চোখে দেখা যেত, সেইটুকুর আনন্দে। বড় হয়ে অবাক হয়ে দেখতাম, জহির রায়হান যা দেখাতে চেয়েছিলেন তা!

২.

দিকে দিকে বাজছে যখন শেকল ভাঙার গান,
আমি তখন চোরের মতো, হুজুর হুজুর করায় রত।
চাচা আপন বাঁচা বলে বাঁচিয়েছি প্রাণ!...
আসলে ভাই, একা একা বাঁচার নামে আছি মরে,
এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে…

মুখস্থ লিরিক একদম। খান আতাউরের কণ্ঠের এই গান একেবারে ভেতরে ঢুকে গেছে। মুভিতে এক বেচারা স্বামী স্ত্রীর ভয়ে ছাদে বসে গান করছেন। স্ত্রীরত্নটি তার এক ভীষণ জীব!

গল্পটা যত সহজ, ভেতরের কাহিনি কিন্তু ততটা সহজ ছিল না। এই গল্পটা ছিল শুধু চোখ ফাঁকি দেওয়ার এক হাতসাফাই।

‘৭০ সাল চলছে। বাংলার মানুষের ওপর আইয়ুব-ইয়াহিয়ার স্বৈরশাসন বসে আছে সিন্দাবাদের ভূতের মতো। কোথাও একটু হাঁ করার জো নেই। অমনি বাহিনী হাজির! এরই মধ্যে আশার আলো নিয়ে এলেন এক ব্রেনিয়াক! বছর পঁয়ত্রিশের এক কাঁচা-পাকা চুলের তরুণ! জহির রায়হান।

৩.

তিনি ‘৫২ আর ‘৬৯ নিয়ে মুভি বানাতে চান। সবাই বলল, পাগল নাকি? মিলিটারিরাজ তো হাঁ করে আছেই, সাথে সেন্সর বোর্ড ফ্রি! যেন কাঁচি হাতে দর্জি! ‘পাকিস্তান’, ‘গণতন্ত্র’ এসব শুনেছে কি অমনি ঘ্যাচ ঘ্যাচ কেটে ডাস্টবিনে! তাহলে? মিটিংয়ে বসলেন জহির রায়হান আর আমজাদ হোসেন! বের হলো একটা উপায়! পলিটিক্যাল রূপক! এটাতে কাজ হবে নিশ্চয়ই। জেন-জি লেভেলের ট্রিক, কী বলেন?

তারা প্লট বানালেন একটা ফ্যামিলির। যে ফ্যামিলিতে এক চরম ত্যাড়্যা আর বদমেজাজি বড় বোন পুরো সংসার চালায়। কোমরে বিশাল এক চাবির তোড়া ঝুলিয়ে সবাইকে নিজের ইচ্ছেমতো নাচায়। ইচ্ছা হলেই কারও খাবার বন্ধ, তো কেউ ঘর থেকে বেরোও!

বাইরে থেকে দেখলে এটা একটা পিওর ফ্যামিলি ড্রামা। কিন্তু ওই বদমেজাজি বোন আর তার কোমরের চাবির তোড়া আসলে আইয়ুব খান আর তার সামরিক ক্ষমতার প্রতীক! আর ফ্যামিলির বাকিরা হলো সাড়ে সাত কোটি বাঙালি! সেন্সর বোর্ড তখন চিন্তা করছে, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স? ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায়! আমাদের পিছে না লাগলেই হলো!

তবু তো ভয় যায় না! যদি হঠাৎ কিছু করে ফেলে? সেই আশঙ্কাতেই এফডিসির সেটে একদিন মিলিটারি জিপের সাইরেন! ডিরেক্টর জহির রায়হান আর হিরো রাজ্জাক—সাথে চলো!

৪.

ইন্টারোগেশন সেল! মিলিটারি অফিসারের কড়া গলা,

‘তোমরা নাকি রাষ্ট্রবিরোধী সিনেমা বানাচ্ছ?’

একদম সোনামুখ জহির রায়হানের। বললেন,

‘বলছেন কী স্যার? রাষ্ট্রবিরোধী? কিসের রাষ্ট্রবিরোধী! এটা তো স্রেফ এক ননদ-ভাইবউয়ের ঝগড়ার গল্প। বিশ্বাস না হলে আসেন, চা খেতে খেতে স্ক্রিপ্ট শুনিয়ে দিই!’

মিলিটারি অফিসার কনফিউজড হয়ে গেল। জহির রায়হানকে ছেড়ে দিল ঠিকই, তবে হুমকি দিয়ে দিল,

‘ছবি রিলিজের পর যদি ঝামেলা হয়, প্রথম গুলিটা কিন্তু তোমার!’

ডিরেক্টরসাহেব মনে মনে বললেন,

‘রিলিজটা হতে দাও আগে, ব্রো! দেন, উই’ল সি!’

৫.

জীবন হাতে নিয়েই শুটিং চলল। মুভিতে একটা ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরির সিন আছে। ডিরেক্টরসাহেব কোনো ঝামেলা করলেন না। সত্যিকার প্রভাতফেরির দিনে গোপন ক্যামেরা নিয়ে তিনি হাজির শহীদ মিনারে! ভোরবেলার লাখো সাধারণ মানুষের রক্তভেজা শোকমিছিল, তার ভেতরেই মিশিয়ে দিলেন ছবির কাস্টদের। বাস্তবে মিশে গিয়ে তৈরি হলো সিনেমার ইতিহাস!

এই ছবিতেই প্রথম ‘আমার সোনার বাংলা’র ফুল ভার্সন ইউজ করা হলো! অ্যান্থেমের পাওয়ার দেখা গেল পর্দায়!

৬.

ফাইনালি, ১৯৭০ সালের ১০ এপ্রিল। ‘জীবন থেকে নেয়া’র রিলিজ ডেট। কিন্তু সেন্সর বোর্ডের আবারও যেন ঘাপলা মনে হলো। ‘কুছ তো গড়বড় হ্যায়।’ তারা ছবির রিলিজ আটকে দিল।

কিন্তু ততক্ষণে প্রশ্নপত্র ফাঁস! ব্যস! সাধারণ মানুষ আর ছাত্রসমাজ রাস্তায়! স্লোগান উঠল, জীবন থেকে নেয়া রিলিজ না হলে সিনেমা হলে আগুন জ্বলবে!

পাবলিকের গরমে সেন্সর বোর্ডের সর্দি-গরমি হয়ে গেল। পরদিনই বাধ্য হয়ে রিলিজ দিল তারা। মুহূর্তে ‘জীবন থেকে নেয়া’ জীবনের গল্প হয়ে গেল! বড়বোনের পতনে হল কাঁপিয়ে স্লোগান উঠল!

জহির রায়হান দেখিয়ে দিলেন, রাজপথে মিছিল না করে, কোনো উসকানি না দিয়ে মানুষের হৃদয়ে প্রতিবাদ তৈরি করা যায়! আর পাকিস্তানি সেন্সর বোর্ড? ট্রোলড হয়ে গেল তো!

৬১১ পঠিত ... ১৬:৫২, আগস্ট ১৯, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top