১
মানুষের জন্মস্থান তার ভেতরে আজীবন একটা ছায়াবাজির মতো থেকে যায়। আমার ক্ষেত্রে সেই ছায়াটার নাম ফেনীর মজুপুর। সোনাগাজী উপজেলার একটা নির্জন গ্রাম, যেখানে ধানের খেতের ওপর বাতাস খেলে গেলে মনে হতো সবুজ সমুদ্রে ঢেউ উঠেছে। তবে ১৯৩৫ সালের সেই আগস্টে; কেউ বলে পাঁচ তারিখ, কেউ বলে উনিশ। আমি যখন প্রথম কেঁদে উঠলাম, তখন আমার জন্য ওই শান্ত গ্রামটা খুব বেশি সময় স্থির হয়ে রইল না।
আমার বাবা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন এক আশ্চর্য ধীরস্থির মানুষ। কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসার নামজাদা অধ্যাপক। চেহারাতেই একটা বিদগ্ধ পণ্ডিতের ছাপ ছিল। আমরা আট ভাইবোন। পাঁচ ভাই, তিন বোন। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার আমাদের সবার চেয়ে আলাদা, তার চোখের ভেতরেই একটা অদ্ভুত আলোর দীপ্তি ছিল। আর আমি? পরিবারের তিন নম্বর ছেলে। আমার নাম রাখা হলো আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ডাকনাম জাফর। কিন্তু পৃথিবী আমাকে যে নামে চিনবে, সেই নামের খোঁজ পেতে আমার তখনো অনেক পথ হাঁটা বাকি।
আমার শৈশবের অনেকটাই কেটেছে কলকাতায়, বাবার চাকরির সূত্রে। ১৯৩০ আর ৪০-এর দশকের কলকাতা ছিল এক ফুটন্ত কড়াই। বাইরে ব্রিটিশদের শাসন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা স্বাধীনতার আগুন জ্বলছে। মিছিল, স্লোগান, আবার এর ঠিক পেছনেই জমাট বাঁধছে অদ্ভুত এক সাম্প্রদায়িক বিষাদ। ছোটবেলায় পার্কে খেলতে খেলতে বা বাবার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি দেখতাম, শহরের দেয়ালগুলো যেন কথা বলছে। রাজনীতি তখন শুধু বড়দের আড্ডায় ছিল না, তা ছিল বাতাসে, খাবারের টেবিলে, এমনকি আমাদের স্কুলের বারান্দাতেও।
মিত্র ইনস্টিটিউট আর কলকাতা মডেল স্কুলে পড়ার দিনগুলোর কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে। একটা কৌতূহলী ছেলে, যার চোখ দুটো সবসময় মানুষের মুখ পড়তে চাইত। মানুষ কীভাবে হাসে, কীভাবে হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে যায়, কীভাবে একটা উসকানিমূলক কথায় রাজপথ উত্তাল করে তোলে, এসব দেখতে দেখতেই আমি বড় হচ্ছিলাম।
তারপর এলো ১৯৪৭।
এক রাতে মনে হলো পুরো দেশটা দুভাগে কেটে ফেলা হলো। মানচিত্রের ওপর আঁকা এক একটা লাইন মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিল। কলকাতা ছাড়তে হলো আমাদের। শিকড় উপড়ে আমরা ফিরে এলাম নিজেদের ভিটেয়, তারপর ঢাকায়। দেশভাগের সেই ধাক্কাটাই হয়তো আমার মনের ভেতরে প্রথম কোনো বড় ধাক্কার মতো লেগেছিল। বুঝেছিলাম, রাজনীতি কোনো বইয়ের পাতা নয়, রাজনীতি মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার এক নির্মম কারখানা।
ঢাকা তখন আরেক রূপ নিচ্ছে। তরুণ বয়সে আমি ঢুকে পড়লাম ভাষার লড়াইয়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। আমতলার সেই বিখ্যাত সভা, ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত। যে প্রথম ১০ জন মানুষ ব্যারিকেড ভেঙে রাস্তায় নেমেছিল, আমি ছিলাম তাদেরই একজন। পুলিশের লাঠি, টিয়ারগ্যাস, চারপাশের চিৎকার সবকিছুর মাঝে দাঁড়িয়ে সেদিন প্রথম অনুভব করলাম, প্রতিবাদের একটা আলাদা ভাষা থাকে।
সেই রাজনীতিই আমাকে টেনে নিয়ে গেল কমিউনিস্ট পার্টির দিকে। একদিন কমরেড মণি সিংহ আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, তোমার নামটা বেশ বড়, জহির। আজ থেকে তুমি রায়হান।
ব্যস, আবু আবদার জহিরুল্লাহ একপাশে সরে দাঁড়াল। উঠে এলো জহির রায়হান।
তখনো আমি জানি না, এই নামটা একদিন ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে দেশের ইতিহাস বদলে দেবে। তখনো জানি না, আমার ভেতরে যে গল্পের পোকাটা নড়াচড়া করছে, তা একদিন আস্ত একটা জাতিকে মুক্তির স্বপ্ন দেখাবে। আমি শুধু জানতাম, চারপাশের এই অস্থির সময়টাকে আমাকে ধরে রাখতে হবে। হয় কলমে, না হয় অন্য কোনো এক মায়াবী পর্দায়...
লেখালেখি দিয়ে কাজটা শুরু হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকে যুগের আলো, খাপছাড়া, যান্ত্রিক; একটার পর একটা পত্রিকায় সাংবাদিকতা আর সম্পাদনা করতাম। কলমটা হাতের তালুর মতো চেনা হয়ে গিয়েছিল। তারপর মন টেনে নিয়ে গেল উপন্যাসের দিকে। শেষ বিকেলের মেয়ে, আরেক ফাল্গুন, আর সেই যে গ্রাম বাংলার আবহমান সোঁদা মাটির গল্প; হাজার বছর ধরে।
কিন্তু আমার ভেতরের মানুষটা কেবল শব্দের ফ্রেমে আটকে থাকতে চাইল না। সে চেয়েছিল দৃশ্য দেখতে, মানুষকে দৃশ্য দেখাতে।
১৯৫৭ সালে পরিচালক এহতেশামের সঙ্গে জাগো হুয়া সাভেরা ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রথম বুঝলাম, এই মাঝারি মাপের বাক্স আর লেন্সের ভেতরে কী এক আশ্চর্য শক্তি লুকিয়ে আছে। ১৯৬১ সালে নিজের প্রথম ছবি বানালাম। কখনো আসেনি। মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব, হতাশা আর জটিল সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল তাতে। মাঝখানে জীবনটাও বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। ১৯৬১-তেই বিয়ে করলাম সুমিতা দেবীকে। তারপর প্রযুক্তি নিয়ে কিছু খেলাধুলার ভূত চাপল মাথায়। পাকিস্তানে প্রথম রঙিন ছবি সঙ্গম বানালাম, তারপর প্রথম সিনেমাস্কোপ বাহানা। কিন্তু এগুলোর ভেতরে আমার আসল আত্মাটা যেন তৃপ্ত হচ্ছিল না।
আমার মন পড়ে ছিল বাংলার লোককথা আর সামাজিক লড়াইয়ের গভীরে। ১৯৬৬-তে বানালাম বেহুলা। ওপর দিয়ে এটা মনসা-চাঁদ সদাগরের লোককাহিনি, কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায় এ তো অন্যায় আর অনমনীয় শক্তির বিরুদ্ধে এক সাধারণ মানুষের নিঃশব্দ প্রতিবাদের রূপক! সেন্সর বোর্ডের লাল চোখ এড়িয়ে যখন ছবিটা প্রেক্ষাগৃহে চলল, মানুষের চোখগুলো দেখেছিলাম। আমি বুঝে গিয়েছিলাম, এই জাতিকে গল্প শোনানোর মাধ্যমটা ঠিক পেয়ে গেছি।
তারপর এলো ১৯৬৮ সাল। সুচন্দার সঙ্গে জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলো। ততদিনে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ কালবৈশাখীর মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থান, রাস্তায় মিছিল, বুটের আওয়াজ—দেশটা ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছে।
আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। মাথায় এক অদ্ভূত ভূত চাপল। ঠিক করলাম, একটা রূপক ছবি বানাব।
ছবিটার নাম দিলাম জীবন থেকে নেয়া।
গল্পটা বাইরে থেকে দেখতে একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের। সেখানে এক স্বৈরাচারী বড় বউ যার চাবির রিংয়ের শব্দে বাড়ির সবাই তটস্থ থাকে। সেই চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন রাউশন জামিল। কিন্তু এই বাড়ির ওপরের রূপকটা ছিল পরিষ্কার: বড় বউ মানে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, আর এই শোষিত পরিবারটা হলো আমাদের অবরুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তান।
আমি শুধু একটা ফিকশন বানাচ্ছিলাম না। ছবির ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম শহীদ মিনারের বাস্তব প্রামাণ্য ফুটেজ, প্রভাতফেরি, রাস্তায় মানুষের রক্তক্ষয়ী মিছিল। রবি ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ আর আলতাফ মাহমুদের সুরে সুর মেলানো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান দুটি যখন পর্দায় বাজল, মানুষ হলে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল।
পাকিস্তান সরকার হরেক কিসিমের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ততদিনে খুব দেরি হয়ে গেছে। ‘এ খাঁচা ভাঙবোই আমরা’ এই স্লোগান তখন আর শুধু সিনেমার সংলাপ ছিল না, তা ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিটি মানুষের বুকের ভেতর।
সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক কলকাতায় প্রদর্শনীতে দেখে ওনারা জড়িয়ে ধরেছিলেন। কিন্তু আমার মন তখন অন্য কোথাও। আমি ভাবছিলাম, ক্যানভাসটা যদি আরও বড় করা যেত! আমি কাজ শুরু করলাম ইংরেজি ভাষার ছবি Let There Be Light-এর।
কিন্তু মানুষের জীবনে সব আলো কি শেষ পর্যন্ত জ্বলে ওঠে? ১৯৭১-এর মার্চে যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলো, তখন সেই অসমাপ্ত আলোর ক্যানভাস ফেলে আমাকে নামতে হলো এক অন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে...
৩
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত। ঢাকা শহরটা যেন এক নিমেষে নরক হয়ে উঠল। চারদিকে শুধু গানপাউডারের গন্ধ, আগুনের লেশিখা আর মানুষের আর্তনাদ। চোখের সামনে নিজের চেনা শহরটাকে পুড়তে দেখলাম। বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু কাঁদার সময় তখন ছিল না।
আমি বুঝেছিলাম, আমার এই মুহূর্তে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার চেয়েও বড় এক দায়িত্ব আছে। বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে, এখানে কী নির্মম হত্যাকাণ্ড চলছে। মে মাসের দিকে কোনোক্রমে সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছালাম। পরনে সামান্য কাপড়, আর মাথায় এক আকাশ দুশ্চিন্তা।
কলকাতায় গিয়ে দেখি দেশত্যাগী হাজার হাজার মানুষের ঢল। শরণার্থী শিবিরগুলোতে উপচে পড়ছে হাহাকার, রোগে-শোকে ছোট ছোট শিশুরা ধুঁকছে। আর অন্যদিকে আমার বাংলার দামাল ছেলেরা খালি গায়ে, সামান্য প্রশিক্ষণ নিয়ে তৈরি হচ্ছে রাইফেল হাতে রুখে দাঁড়াতে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও কুশলী সহায়ক সমিতি থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ক্যামেরাটাই হবে আমাদের গেরিলা অস্ত্র। চারটা প্রামাণ্যচিত্রের পরিকল্পনা হলো। কিন্তু আমার মাথায় কেবল একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল, কীভাবে এমন একটা কিছু তৈরি করা যায় যা বিশ্বের ঘুমে ঢুলুঢুলু বিবেককে এক প্রচণ্ড ধাক্কা দেবে।
শুরু হলো Stop Genocide-এর কাজ।
টাকাপয়সা বলতে কিচ্ছু নেই, সরঞ্জামের প্রচণ্ড অভাব। কোনোমতে পুরোনো কিছু স্টক ফুটেজ, নিউজরিল আর ক্যামেরা যোগাড় করে আমরা ছুটলাম সীমান্ত এলাকার শরণার্থী শিবিরগুলোতে। আলমগীর কবিরের ধারালো কণ্ঠ, অরুণ রায়ের ক্যামেরা আর দেবব্রত সেনগুপ্তের সম্পাদনা, সবাই যেন আক্ষরিক অর্থেই রক্ত দিয়ে কাজ করছিলাম।
আমি লেনিনের বিখ্যাত বাণী দিয়ে ছবিটা শুরু করলাম। একদিকে পশুর মতো পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞ, অন্যদিকে ভিয়েতনাম আর আলজেরিয়ার রক্তাক্ত ইতিহাস, দুটোকে এক সুতোয় বেঁধে দিলাম। আমি মেলাতে চেয়েছিলাম মানুষের স্বাধীনতার সার্বজনীন লড়াকু চেতনাকে। প্রামাণ্যচিত্রের শেষ দৃশ্যে বড় বড় অক্ষরে ভেসে উঠল একটিমাত্র শব্দ: STOP।
ছবিটি তৈরি হওয়ার পর যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেখলেন, তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি অবিলম্বে এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে এটি যখন প্রদর্শিত হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মান্যগণ্য পরিচালকেরা আমার হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন।
এরপর বানালাম A State is Born। পাশাপাশি আলমগীর কবির বানালো Liberation Fighters আর বাবুল চৌধুরী Innocent Millions। এই ছবিগুলো দেখিয়ে যে অর্থ আয় হতো, তার পুরোটাই আমি তুলে দিতাম মুজিবনগর সরকারের মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে।
তখন আমার খাওয়া নেই, ঘুম নেই। সারাদিন-সারারাত শুধু কাজ আর কাজ। দূর থেকে খবর পেতাম দেশের ভেতরের বিভীষিকার। মনে হতো, এই তো আর কিছুদিন; নতুন একটা সূর্য উঠতে যাচ্ছে।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করল। চারদিকে বিজয়ের আনন্দ, কিন্তু আমার মনের ভেতরে তখন এক অজানা আশঙ্কার কালো মেঘ জমছে। ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে এলাম। এসে যে খবরটা পেলাম, তা আমার বুকের ভেতরের সব আলো এক ঝটকায় নিভিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল...
৪
ঢাকায় ফিরে চারদিকে শুধু বিজয়ের কোলাহল দেখছিলাম। রাস্তায় রাস্তায় উড়ছিল লাল-সবুজের পতাকা, মানুুষের মুখে বিজয়ের হাসি। কিন্তু আমাদের বাড়িতে তখন কোনো আনন্দ ছিল না। ঘরে ঢুকে দেখি থমথমে নীরবতা।
আমার বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ১৪ ডিসেম্বরের পর থেকে নিখোঁজ। আল-বদর আর রাজাকাররা তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে। বিজয়ের ঠিক দুই দিন আগে আমার আলো দেখানো, পথ দেখানো প্রিয় ভাইটাকে এভাবে হারিয়ে ফেলব, তা আমি স্বপ্নের ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।
আমি স্থির থাকতে পারলাম না। ভাইয়ের সন্ধানে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করলাম। শহরের এ-গলি সে-গলি, বন্ধ থাকা বন্দিশালা, খবরের কাগজের দপ্তর সব জায়গায় হন্যে হয়ে ঘুরতে লাগলাম। ঘুম আর খাওয়া বলতে জীবনে কিছু অবশিষ্ট ছিল না। চোখে কেবল একটাই ছবি ভাসত। বড় ভাই হয়তো কোথাও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বেঁচে আছেন, আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল।
হঠাৎ টেলিফোনের ঘণ্টাটা বেজে উঠল। রফিক নামের অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ফোনের ওপাশ থেকে হন্তদন্ত হয়ে বলল, আপনার ভাই জহিদুল্লাহ/শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে। আপনি নিজে যদি এখনই যান, তাকে বাঁচানো সম্ভব।
কথাটা শুনে আমার মাথার ভেতর রক্ত ছলছল করে উঠল। কোনো কিছু না ভেবেই আমি বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব আর চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবিরও ছিল।
তখনো মিরপুর এলাকাটা পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবশিষ্টাংশ আর অস্ত্রধারী বিহারিরা আত্মগোপন করে ছিল। আমরা যখন মিরপুরের ভেতরের দিকে এগোচ্ছি, চারপাশে কেমন যেন এক থমথমে নীরবতা। রাস্তাগুলো কুয়াশায় ঢাকা, কোনো সাধারণ মানুষের দেখা নেই।
হঠাৎ চারদিক থেকে গোলাগুলির বিকট শব্দ। সেনা আর পুলিশের সাথে লুকিয়ে থাকা বিহারিদের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল।
আমি আর ফিরতে পারলাম না। কুয়াশা আর বারুদের ধোঁয়ার ভেতরেই থমকে গেল ৩৬ বছরের এক স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবন। আমার কোনো মৃতদেহ কেউ খুঁজে পায়নি। আমি মিলিয়ে গেলাম সেই মাটির গভীরে, যে মাটিকে ভালোবেসে আমি সেলুলয়েডে এঁকেছিলাম স্বাধীনতার ছবি।
আমার অসমাপ্ত থেকে গেল Let There Be Light প্রজেক্টটা। যে আলোর খোঁজ আমি আজীবন করে গেছি, সেই আলোতেই হয়তো শেষ পর্যন্ত লীন হয়ে গেলাম।
আজ এত বছর পরও মানুষ যখন ৩০ জানুয়ারি ‘জহির রায়হান অন্তর্ধান দিবস’ পালন করে, কিংবা জীবন থেকে নেয়া দেখে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তখন মনে হয় মানুষটা হারিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার ক্যামেরা, তার স্বপ্ন আর তার লড়াই তো এই স্বাধীন বাংলার বাতাসে চিরকাল অমর হয়ে রইল।



পাঠকের মন্তব্য