শওকত ওসমানের ‘জননী' রি-রিড করছিলাম। অনেক আগে পড়া হয়েছিল বইটা। কিন্তু বই ব্যাপারটা এমন যে জীবনের প্রতি ধাপে তার মিনিং বদলায়। পড়তে পড়তে এবারও সেটাই টের পাচ্ছিলাম।
জননী দরিয়া বিবির গল্প। একটা পাওয়ারফুল চরিত্র যিনি নিজের নারীত্ব ও মাতৃত্ব- দুটোকেই সম্মান দিয়েছিলেন। কিন্তু এই একই গল্পে একজন হাসুবিবিও আছেন। নরম স্বভাবের এক নারী- নানান বঞ্চনার শিকার। শওকত ওসমান দেখিয়েছেন সমাজে দরিয়া বিবির পাশাপাশি হাসুবিবিরাও আছেন।
আজ হাসুবিবির গল্প করি। হাসু অল্পবয়সী এক মেয়ে। তার কোন সমস্যা আছে- তাই সে মা হতে পারে না। ভাতের চেয়ে স্বামী-শাশুড়ির খোটা শোনে বেশি। নরম বলে, খুতওয়ালা বলে তাকে কথা শোনায় না এমন কেউ নেই! এরপর হঠাৎ একদিন খবর হয় হাসু মা হবে! কিন্তু এটা রটনামাত্র! একদিন ধরা পড়ে যায় সব! হাসু ছোট বাচ্চাদের কাপড় চুরি করে করে পেটে বেঁধে রেখে সমাজকে দেখায় সে মা হচ্ছে! সমাজের ‘কথা’ থেকে বাঁচতে এর চেয়ে ভালো সমাধান তার মাথায় আসেনি।
আজকের দিনের মেয়েদেরও কিন্তু অনেকটাই সেইম অবস্থা। বিয়ে হওয়া মানেই ব্যস- দুয়ার খুলে গেল! স্বামী স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করছেন- ‘তুমি কবে মা হতে চাও’ এখনো আমাদের আজকের সমাজে খুব কম মেয়ের ভাগ্যেই এটুকু জোটে। বিয়ে হয়েছে। প্রসেসটা বায়োলজিক্যাল। এমনিতেই বাচ্চা হবে, জিজ্ঞেস করার কি আছে? বাচ্চা হবে জেনেই তো বিয়ে করেছে নাকি?- এমনটাই মানসিকতা বেশিরভাগ স্বামীর!
স্বামী-ভাগ্য যদি বা মেয়েটার ভালো হয় তো আছে পরিবারের মুরব্বিরা। বাবা-মা, শশুর-শাশুড়ি! বিয়ে হতে পারে না, কবে নাতি-নাতনির মুখ দেখব বলে বসে থাকা! ছয়মাস পার হতে না হতেই মেয়েটিকে নিয়ে গাইন্যাকের কাছে দৌড়ানো! আসলেই মা হতে পারবে তো? পারলে এখনো হচ্ছে না কেন?
যদি মেয়েটার নিজের বাড়ি আর শশুরবাড়ি এসব না করে তো এর পরের লাইনে আছে আত্নীয়-স্বজন! দ্য গ্রেট রিলেটিভস! এদের বাচ্চা হচ্ছে না কেন-এই টেনশনে তাদের মাথা ছিড়ে পড়ার যোগাড় হবে। তারা উপদেশ দেবেন, পরামর্শ দেবেন, জ্ঞান দেবেন। পারলে হাতে-কলমে শেখাতে আসবেন। সিস্টেমটা জানো তো? মনে হয় আমার বাচ্চা নেবার টাইমে তারা বিছানার পাশে বসে থাকতে পারলে টেনশন দূর হবে তাদের।
তারপর আছে পাড়া-পড়শীরা। নানা প্রেসারের সাথে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল তো আছেই! ৯৫ পারসেন্ট টাইম এই কথা, প্রেসার,ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের শিকার কিন্তু শুধু মেয়েরাই হয়!
নতুন কাপল। অবশ্যই তাদের কাছে গুড নিউজের জন্য সবার আকাঙ্খা থাকবে। সেটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সেটা মানসিক চাপের পর্যায়ে চলে যাবে কেন? কথা শুনতে হবে কেন? তারচেয়েও বড় কথা মেয়েরাই শুধু এর ভুক্তভোগী হবে কেন?
মা হবে একজন নারী, কিন্তু সেই ডিসিশনটা নেবার ক্ষমতা একটা মেয়ের কতটুকু? মেয়েটা হয়ত পড়াশোনা শেষ করতে চায়, হয়ত চাকরির পরীক্ষায় বসতে চায়, নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চায়! কিন্তু সেগুলোর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মা হয়ে যাওয়াটা।
আমি এমনও অনেক দেখেছি যে মেয়েটা চাকরি যাতে করতে না পারে সেই ব্যবস্থা হিসেবে বাচ্চা নিয়ে নাও। আটকে দাও! আবারও চলে আসে সেই মেয়েদের অন্দরে পাঠানোর গল্প! নিজের স্বপ্নকে মাটিচাপা দিয়ে সমাজ কে মাথায় করে রাখো!
বেশিরভাগ মেয়েরাই এই চাপগুলো উইদস্ট্যান্ড করে নিতে পারে না। হাসু মেয়েটাও মা হতে চাইত। কিন্তু সমাজের আর পরিবারের চাপ চুপ করে থাকা এই মেয়েটার পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছিল। আজকের মেয়েরাও সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। আজও তাদের মা হবার ডিসিশনটা সমাজ নিয়ে দেয়!
মা হবার এই প্রসেসটা একটা জার্নি। যিনি এই জার্নি করেন নি তিনি চোখের সামনে দেখলেও এর ভার বুঝতে পারবেন না। এই জার্নিটার জন্য একজন মেয়ের অনেক বড় একটা প্রিপারেশনের দরকার। তার শারীরিক, মানসিক পরিবর্তনের, কষ্টের পরিমাপ করা সমাজের পক্ষে সম্ভব নয়। তার উপদেশ, পরামর্শ, জ্ঞানের প্রয়োজন অবশ্যই - কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন স্নেহের, ভালোবাসার, সহানুভূতির! তাই, মেয়েদের আমরা এতটুকু ছাড় দেই- মা যেহেতু সে হবে, ডিসিশনটাও সে-ই নিক!



পাঠকের মন্তব্য