ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে একটা র্যান্ডম পোস্ট সামনে আসলো। এক আপুর বিল্ডিং এর মালিক নোটিশ দিয়ে ভাড়াটিয়াদের জানিয়েছে, ছাদে মেয়েদের অন্তর্বাস শুকানো যাবে না। বিল্ডিং এর কিছু মেয়েরা এটা নিয়ে কথা বললে বাড়িওয়ালাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমাদের বাসার মেয়েরা ঘরে ভেতর শুকায়, আপনারাও শুকাবেন সেভাবেই! আমাদের অন্তর্বাস তো জীবনেও কেউ কখনও দেখে নাই…
এখন এটা নৈতিক না অনৈতিক হলো, বাড়িওয়ালা হলেই কি ভাড়াটিয়াদের ওপর চাইলেই একটা নিয়ম চাপিয়ে দিতে পারেন কি না সেই আলাপে যাব না। বরং আজকে আমার কথার বিষয় হলো, মেয়েদের অন্তর্বাস! একটু খারাপভাবে যৌন উত্তেজক শব্দে বলি, ব্রা আর প্যান্টি!
অথচ আমি যদি বলতাম শার্ট আর প্যান্ট, আপনাকে সেটা সুড়সুড়ি দিত কি? দিত না! কিন্তু ব্রা আর প্যান্টি হলো যৌন উত্তেজক শব্দ! দুই টুকরা কাপড় আপনাদেরকে সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে। দুটো পোশাকের নাম আপনাকে উত্তেজিত করে তুলছে… কী আশ্চর্য! শব্দ দুইটা যেন নিষিদ্ধ পল্লীর। সবাই জানে কিন্তু সামনাসামনি উচ্চারণ করা যাবে না।
নাম শুনেই যেখানে সুড়সুড়ি লাগে, দেখলে তাদের কী অবস্থা হয়? না না! এটা তো মেনে নেওয়া যায় না! পুরুষদের যৌন উত্তেজক মগজ কল্পনা করে নেবে একটা ব্রা প্যান্টি দেখে নারী শরীরটা, সেটা নারীরই দোষ বৈকি! পুরুষ কেন নিজের ভাবনাকে কন্ট্রোল করবে? নিজের চোখ কন্ট্রোল করবে? তারা আদিম, স্বাধীন! তাদের ভাবনা কন্ট্রোল করা যাবে না! মেয়েদেরকে ঘরে ঢোকাও, মেয়েদের অন্তর্বাস ঘরে ঢোকাও।
কিন্তু ছেলেদের বক্সার থাকলে অসুবিধা নাই! শুধু থাকলে কেন, নিচু করে প্যান্ট পরার পর একটা ছেলে যখন বসে, তার পেছনের অংশের অনেকটা রিভিল হলেও প্রবলেম নাই! বক্সারের ওয়েস্টব্যান্ড দেখা গেলেও সমস্যা নাই! কারণ তাদের এই কুৎসিত জিনিস কোনো পুরুষের মনেও কামনা, বাসনা জাগায় না। বা খারাপও লাগে না! তাই কারও মান সম্মানেও লাগে না!
অথচ ব্রা বা প্যান্টি অথবা মেয়েদের অন্তর্বাস কখনই সেক্স সিম্বল হিসেবে তৈরি হয়নি। এটা ছিল নরমাল পোশাকের অংশ। শুধু ব্রা না, মেয়েদের অন্তর্বাস বা লঞ্জারি কখনই লুকানোর জন্য বা সেক্স সিম্বল হিসেবে আসেনি।
১৯ শতকের ইউরোপীয় আন্ডারওয়্যারের অনেকটাই ছিল লিলেন কাপড়ে তৈরি। তখন প্যান্টির বদলে ছিল ড্রয়ার্স, যেটা ছিল বড় বড় দেখতে অনেকটা ঢিলেঢালা শর্টসের মতো। যার সঙ্গে আজকের অন্তর্বাসের সাথে তুলনা করাই কঠিন। নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টসের পোশাক-ইতিহাসের আলোচনায় বলা হয়েছে, এ সময়ের আন্ডারওয়্যার আমাদের কাছে যতটা ইন্টিমেট মনে হয়, সমকালীন মানুষের কাছে তার অর্থ ছিল একেবারেই আলাদা।
এমন কি ভিক্টোরিয়ান নারীদের ড্রয়ার্সের ডিজাইনও আজকের চোখে অদ্ভুত। অনেক ড্রয়ার্সের মাঝখানে খোলা অংশ থাকত।
আজ আমরা যেটাকে অত্যন্ত ব্যক্তিগত বা যৌন বলে ভাবতে পারি, তখন সেটাই ছিল ব্যবহারিক ডিজাইন। কারণ তখনকার মাল্টি লেয়ার স্কার্টের নিচে ড্রেস সামলে টয়লেট ব্যবহারের জন্য এই খোলা বা ওপেন ক্রোচ ডিজাইন সুবিধাজনক ছিল। মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম এবং পোশাক-ইতিহাসের গবেষণা- দুই জায়গাতেই এই বিষয়টি উঠে এসেছে। একই পোশাক এক যুগে যেটা শালীন, অন্য যুগে সেটা অশ্লীল হয়ে গেল!
ইউরোপে নারীর অন্তর্বাসের ইতিহাসের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে শরীরকে নির্দিষ্ট আদর্শে গড়ে তোলার চেষ্টা। যুগে যুগে পার্ফেক্ট নারীর শরীর কেমন হবে, সেই প্রতিযোগীতায় এসেছে নারীদের ড্রেসে হাজার পরিবর্তন, সাথে শরীরে হয়েছে যন্ত্রণা।
কোরসেট কোমর সরু করেছে, পেটিকোট স্কার্টকে ফুলিয়েছে, বাসল (bustle) পেছনের অংশকে নির্দিষ্ট শেপ দিয়েছে। ভিক্টরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামের পোশাক-ইতিহাসে দেখা যায়, ভিক্টোরিয়ান ফ্যাশানের কাঙ্ক্ষিত সিলুয়েট তৈরি করার বড় অংশের কাজটাই করত শরীরের নিচে পরা পোশাকগুলো।
অর্থাৎ অন্তর্বাস শুধু লুকানোর পোশাক ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শরীরকে কেমন দেখাবে সেটা ঠিক করা। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। অন্তর্বাস শরীরের কাছাকাছি যেতে যেতে শরীরের সামাজিক অর্থের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়। কোনো পোশাক যত বেশি শরীরের নির্দিষ্ট অংশকে শেপ করে, সাপোর্ট করে বা ঢেকে রাখে, সেটিকে তত বেশি প্রাইভেট হিসেবে ভাবা সহজ হয়।
আর প্রাইভেট জিনিসের সঙ্গে খুব দ্রুত যুক্ত হয় লজ্জা।
কোরসেটের বিকল্প হিসেবে ১৯শতকের শেষভাগ থেকেই বিভিন্ন ধরনের বাস্ট সাপোর্টার ও ব্রেস্ট সাপোর্টার আন্ডারগার্মেন্টস তৈরি হচ্ছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই আন্ডারগার্মেন্টস শেপিং এর পাশাপাশি মেয়েদের ব্রেস্ট সাপোর্ট দিয়ে ব্যথার হাত থেকে বাঁচাত। কাজেই এটা ছিল প্র্যাক্টিক্যাল একটা সমস্যার সমাধান।
ফরাসি ডিজাইনার হারমিনি কাদোলের এর তৈরি ব্রেস্ট সাপোর্টিং ডিজাইন ১৮৮৯ সালের প্যারিসে প্রদর্শিত হয়েছিল। পরে মেরি ফেলপস জ্যাকব ১৯১৪ সালে নিজের ব্রাসিয়ারের পেটেন্ট নেন।
কিন্তু এখানেও মজার বিষয় হলো, ব্রার প্রথম দিকের উদ্দেশ্য ছিল নারীর শরীর প্রদর্শন করা না। বরং কোরসেটের কঠোরতা থেকে মুক্তি, সাপোর্ট, চলাফেরার সুবিধা আর পোশাকের নিচে শরীরকে নতুনভাবে শেপ- এসবই ছিল বড় কারণ। মেরি ফেলপস জ্যাকবের বিখ্যাত ডিজাইনটিও ছিল নরম, হালকা আর করসেটের তুলনায় অনেক বেশি আরামদায়ক।
অর্থাৎ, আজ যে পোশাককে আমরা নারীর শরীরের সবচেয়ে ব্যক্তিগত পোশাকগুলোর একটি মনে করি, তার আধুনিক ইতিহাস শুরু হয়েছিল অনেকটাই আরাম ও ব্যবহারিকতার প্রশ্ন থেকে।
বাংলাদেশে এটা ট্যাবু হয়ে গেল কী করে?
আমাদের সমাজে নারী-শরীর, পর্দা, যৌনতা, মাসিক এবং সম্মান এসবের নিজস্ব দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এর সঙ্গে ঔপনিবেশিক যুগের নতুন ধরনের মধ্যবিত্ত ভদ্রতা, পোশাক ও রেসপেক্টিবিলিটির ধারণাও যুক্ত হয়েছে। তাই আজকের বাঙালি নারীর পোশাকবোধকে পুরোপুরি প্রাচীন বা পুরোপুরি পশ্চিমা, কোনোটাই বলা ঠিক হবে না। বরং এখানে অনেকগুলো সামাজিক স্তর একসঙ্গে কাজ করেছে।
আর সেই স্তরগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো- নারীর শরীরকে শুধু তার নিজের শরীর হিসেবে দেখা হয়নি, সেটাকে পরিবারের সম্মান, যৌনতা, চরিত্র এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাই মেয়েদের শরীরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত জিনিসও লুকানোর জিনিস হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে মেন্সট্রুয়াল হাইজিন নিয়ে গবেষণাগুলো এই সামাজিক কাঠামোর একটি আরও পরিষ্কার উদাহরণ দেয়।
২০২৫ সালে ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গ্রামীণ অঞ্চলে মেন্সট্রুয়াল হাইজিন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কালচারাল ট্যাবু আর কুসংস্কার কীভাবে হাইজিন মেইনটেইন করাকে বাঁধা দেয় তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে বিশেষভাবে দেখা যায়, মেন্সট্রুয়াল সাইকেলের জন্য ব্যবহার করা কাপড় শুকানোর ব্যাপারেও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা কাজ করে।
আর ২০২৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশি নারীদের বাস্তব এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে একটি গবেষণায় অন্ধকার জায়গায় মেন্সট্রুয়াল ক্লথ শুকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। মানে মেন্সট্রুয়াল সাইকেলের কোনকিছু দেখা যাবে না। আন্ডারগার্মেন্টস দেখা যাবে না। ব্রা শব্দও উচ্চারণ করা যাবে না! নারীর শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনিস দেখা যাবে না। অর্থাৎ সমস্যাটা শুধু কাপড় নয়।
সমস্যাটা হলো নারী-শরীরের দৃশ্যমান চিহ্ন।
সবকিছুর পরেও প্রশ্ন আসে, মেয়েদের অন্তর্বাস ঘরের ভেতর লুকিয়ে শুকালে সমস্যা কী?
সমস্যা আছে। পুরুষশাসিত সমাজ কখনই মেয়েদের অসুবিধা, শারিরিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে চায়নি। এদের শুধু মনে হয়েছে, মেয়েদেরকে ঠেলে ভেতরে পাঠাই!
ঘরের ভেতর, কাপড়ের নিচে, ওয়াশরুমের মধ্যে মানে যেখানে সরাসরি রোদ যায় না, সেসব জায়গায় অন্তর্বাস শুকালে এবং পরে সেটা ব্যবহার করলে নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। যেহেতু অন্তর্বাসের ওপর কয়েক লেয়ারের কাপড় পরা হয়, তাই প্রতিদিন এটাকে ধুয়ে ফেলাটাও জরুরি। কিন্তু এই রাখি রাখি সারি সারির জন্য বেশিরভাগ মেয়েরাই নিয়মিত অন্তর্বাস ধুয়ে দেন না। কড়া রোদে না শুকালে বা অন্তর্বাস ভেজা ভেজা থাকলে সেখানে তৈরী হয় ব্যাক্টেরিয়া। এজন্য হতে পারে র্যাশ, অ্যালার্জি, ব্যাক্টেরিয়া অ্যাটাক, ফাঙ্গাল ইনফেকশনসহ নানা শারীরিক সমস্যা। বিশেষত প্যান্টির কারণে অনেক মেয়েরই যে যৌনাঙ্গে ছত্রাক সংক্রমণের সমস্যা হয়- সেটা অনেকেই জানেন না।
কিন্তু এসব দেখার বা ভাবার সময় আমাদের সমাজের নেই। অন্তর্বাস ছাদে বা খোলা জায়গায় শুকালে তাদের যৌন অনুভূতি নাড়া দেবে! তাই অন্তর্বাস ঠ্যালো অন্তঃপুরে, কেউ যেন না দেখে মেয়ে!



পাঠকের মন্তব্য