কয়েকদিন ধরে গিবলি স্টুডিও মুভি ম্যারাথন দিচ্ছি। একটার পর একটা গিবলি স্টুডিওর মুভি দেখছি। তো টানা দুই-তিনদিন তিন-চারটা মুভি দেখার পর মনে হলো, এই মুভিগুলো আমার মাইন্ড বুস্টআপ করেছে। আমার কাজ করতে ভালো লাগছে, মনটা খুশি খুশি লাগছে! বিশ্বাস করুন আর না করুন, একটা সিনেমা বা মুভি আমাদের মনের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলতে পারে। যখন লাইভ অ্যাকশন মুভি হচ্ছে তখন আমরা অটোমেটিক্যালি অনেক বেশি কানেক্টেড ফিল করি। কিন্তু অ্যানিমেশন?
আমাদের দেশের যারা নিয়মিত মুভি দেখেন, বোঝেন এবং এগুলো নিয়ে চর্চা করেন তাদের অনেকেরই ধারণা অ্যানিমেশন বাচ্চা থেকে টিনেজদের জন্য। অনেকেই কখনও অ্যানিমেশন মুভি দেখেননি বা দেখার ইচ্ছা নেই। খুব একটা আগ্রহ পান নাই। হ্যাঁ আমি এটাও স্বীকার করি যে, অ্যানিমেশন মুভি আসলে সবার প্লেটের বিরিয়ানি না।
তো এত কথা বলছি কেন? কারণ এই গিবলি স্টুডিওর মুভি দেখতে দেখতে আমার খুব আফসোস হইল যে, আমাদের দেশের এরকম একটা সিনেমা নাই। বাংলা ভাষায় নাই। এই আফসোস আমার বহুদিনের। সেই ছোটবেলা থেকে যখন অ্যানিমেশন মুভি দেখতাম আর ভাষা বুঝতাম না, তখনই মনে হত এগুলো কেন বাংলায় বানায় না! এরপর বাচ্চাদের কিছু ডিজনি মুভির বাংলা ডাবিং দেখতাম। কিন্তু সেগুলো আঞ্চলিক ভাষা বা খুব ভালোমানের ডাবিং না হওয়ায় মনের আনন্দ দিতে পারেনি।
গিবলি স্টুডিওর My neighbor Totoro দেখে আফসোস হলো, এমন একটা বন্ধু যদি আমারও থাকত!
এখন বাংলাদেশে কেন অ্যানিমেশন মুভি সেভাবে হয় না? আমি জানার চেষ্টা করলাম। অ্যানিমেশনের সাথে বাংলাদেশিদের পরিচয় করিয়েছে মন্টু মিয়ার অভিযান। তবে সেটা ছিল থ্রি-ডি। সেসময় সবাই এটা দেখে বেশ পছন্দ করেছে। তারও আগে টু-ডি বা কার্টুনিশ অ্যানিমেশনের সাথে আমাদের পরিচয় মীনা কার্টুন দিয়ে। কিন্তু মীনা কার্টুন পুরোপুরি বাংলাদেশে তৈরী না। মীনার প্রথম কয়েকটি animation তৈরির সঙ্গে Manila-র Hanna-Barbera-র studio-র সহযোগিতা ছিল। পরবর্তী অনেক episode তৈরি হয় Ram Mohan-এর Mumbai studio-তে। অর্থাৎ মীনার জন্মের গল্পটিই আসলে আন্তর্জাতিক collaboration-এর গল্প। এই হানা-বারবারা স্টুডিওই কিন্তু বিশ্বখ্যাত কার্টুন টম অ্যান্ড জেরি তৈরি করত।
তবে হ্যাঁ মীনা কার্টুন আমাদের অ্যানিমেশনের পায়োনিওর ছিল। এটা আমাদেরকে দেখাল যে রিসোর্স না থাকলেও কোলাবোরেট করে প্রজেক্ট করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এরপর থেকে আমাদের দেশের অ্যানিমেশন সেক্টর যে খুব এগিয়েছে এমন কোনো ব্যাপার না!
এমন না যে আমাদের দেশের আর্টিস্ট বা গল্পের অভাব। তা কিন্তু একদমই না। আপনি একটু খেয়াল করে দেখেন এখনের অন্তিক মাহমুদ, শামিমা শ্রাবনীর মতো আরও অনেকেই নিজ উদ্যোগে অ্যানিমেশন করে যাচ্ছে। মানুষ পছন্দও করছেন। অন্তিক মাহমুদ স্টুডিও শূণ্য ব্যান্ডের সাথে কোলাব করে বেহুলার যে ভিডিও বানিয়েছেন, সেটা কী অসাধারণ! পুরোটা সময় মনে হয় যেন এক ৯০ দশকের ভিডিও গেমে বসে আছি! (না দেখলে ইউটিউবে দেখে আসুন) এছাড়াও আমাদের দেশের বিভিন্ন অ্যানিমেশন আর্টিস্টরা বিদেশের বিভিন্ন প্রজেক্টে বাইরের দেশের বড় বড় অ্যানিমেশন প্রজেক্টে কাজ করে থাকেন ফ্রিল্যান্সিং বেসিসে, তা আমরা জানিও না।
আরেকজনের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। নাফিস বিন যাফর। উনি বাংলাদেশের একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে থাকেন লস এঞ্জেলেসে। কাজ করেন বিশ্বখ্যাত DreamWorks Animation এ প্রধান ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। তিনি Shrek Forever After, Kung Fu Panda 2, Madagascar 3, The Croods, Penguins of Madagascar, How to Train Your Dragon 2 এর মতো বিখ্যাত সব অ্যানিমেশন মুভির সাথে কাজ করেছেন। ২০০৮ সালে Academy Scientific and Technical Award পেয়েছিলেন। Digital Domain-এ তার তৈরি fluid simulation system Pirates of the Caribbean: At World's End-এর মতো film-এ visual effects তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালেও Academy থেকে Technical Achievement Award পান।
তার কথা উল্লেখ করার কারণ হলো বাংলাদেশে আর্টিস্ট নাই, ইলাস্ট্রেটর নাই, অ্যানিমেটর নাই... এটা যে সত্যি না সেটা প্রমাণের জন্য। তাহলে কেন পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন ফিল্ম তৈরী হয় না? একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন ফিল্ম বানাতে খরচ হয় প্রচুর। অনেক সময় দেখা যায় একটা প্রজেক্টে যে খরচ হয়, তা দিয়ে নরমাল সিনেমার দুইটা বানানো সম্ভব। তার ওপর একেকটা মুভি বানানোর জন্য প্রচুর সময় লাগে। আমাদের দেশে কেউ আসলে এই রিস্কটা নেওয়ার সাহস এখনও করেননি। হয়ত ডিরেক্টর-প্রোডিউসার মনে হয়, বাচ্চাদের মুভি বানাতে এত টাকা খরচ করার কোনো মানে নাই! কয়েকদিন পর পর বিগ বাজেটে বস্তাপঁচা কিছু সিনেমা না বানিয়ে একটা অ্যানিমেশন ফিল্ম বানানো যায় এই চিন্তা কারও মাথায় আসে নাই। তারা ভায়োলেন্ট, বলিউড মুভির সস্তা কপি, সেই একই প্রেম, মারামারি নিয়ে থাকতেই পছন্দ করে বেশি।
তবে সবকিছু শুনে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের অ্যানিমেশন সেক্টর একেবারেই মৃত। আসলে তা না। বরং ইদানীং বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ দেখা গেছে ।
Tomorrow তার একটি উদাহরণ। বাংলাদেশি animator-দের তৈরি 3D animated feature হিসেবে ছবিটা উল্লেখ করার মতো। এর মতো project নিখুঁত কি না, সেটি আলাদা আলোচনার বিষয়। কিন্তু এমন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন করার চেষ্টাটাই সচেয়ে বড় বিষয়! কারণ এটি দেখায়, বাংলাদেশে feature-level animation করা অসম্ভব না।
আবার Ogopogo Studios-এর মতো উদ্যোগ stop-motion animation নিয়ে কাজ করছে। Stop-motion এমনিতেই অত্যন্ত labour-intensive একটি medium, physical object বা puppet frame by frame নড়ানোর কাজ। এই ধরনের niche medium নিয়েও বাংলাদেশে studio তৈরি হওয়া আমাদের মনে আশা যোগায়।
Sunset Studios-ও animation-এর জন্য নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেছে। তাদের Dead End project-কে anime-style Bangladeshi animation-এর একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। এছাড়া আছে বেশিকিছু শর্ট ফিল্ম যেগুলো আপনারা দেখতে পারবেন ইউটিউবে।
কাজেই আমাদের দেশে পূর্ণ্যদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন ফিল্ম সম্ভব না; এটা বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং কেউ আসলে উদ্যোগ নিচ্ছে না এটা নিয়ে কাজ করার। এই সেক্টরটি একটি অপার সম্ভাবনাময় সেক্টর। এটি আমাদেরকে এনে দিতে পারে আন্তর্জাতি খ্যাতি। সিনেমার কোনো আলাদা ভাষা নেই। Cinema itself is a language. আপনারা হয়তো বিশ্বাস করবেন না, Flow নামের এক অ্যানিমেশন মুভি ২০২৫ সালের সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম বিভাগে অস্কার জিতেছে। যেটাতে একটা সিঙ্গেল ডায়লগ নেই। অথচ ৮৫ মিনিটের এই মুভিটি চলতে থাকলে আপনি স্ক্রিন থেকে এক মিনিটের জন্যও চোখ সরাতে পারবেন না। এবং এই মুভিটি বাচ্চাদের জন্য আনন্দ দিতে পারবে হয়তো কিন্তু বড়দের জন্য এক গভীর জীবনবোধ জাগিয়ে তুলবে।
পুরোপুরি বড়দের অ্যানিমেশন মুভি, সুলতানাস ড্রিমের অ্যানিমেশন দেখলে মনে হয় যেন আঁকার খাতা থেকে গল্পটা উঠে এসেছে
এখনও যদি আপনাদের মনে হয় অ্যানিমেশন মুভি শুধু বাচ্চাদের জন্য মনে হয় তবে আপনার জন্য রইল কয়েকটা অ্যানিমেশন মুভি সাজেশন, যা মোটেই বাচ্চাদের জন্য না
১। Grave of the Fireflies (1988) — Studio Ghibli
২। The Breadwinner (2017) — Cartoon Saloon
৩। Perfect Blue (1997) — Satoshi Kon
৪। Waltz with Bashir (2008)
৫। It's Such a Beautiful Day (2012)
৬। Mary and Max (2009)
৭। Flow (2024)- Dream well studi0
৮। Sultana’s Dream (2023)
The Breadwinner আপনাকে নতুনভাবে ভাবাতে বাধ্য করবে
এছাড়াও আপনি যখন অ্যানিমেশন মুভির জগতে পা রাখবেন, আপনি হাজার হাজার মুভি খুঁজে পাবেন যা বাচ্চাদের মুভির মুখোশে আসলে বড়দের জন্য গভীর জীবনবোধের বার্তা দিয়ে যায়। এসব দেখতে দেখতে নিশ্চই আপনিও আমার মতো আফসোস করবেন,
আমাদের দেশে হবে এই মুভি কবে?







পাঠকের মন্তব্য