মেয়েদের লেখাপড়া কি আসলেই ফিতনা

৩৭ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

 

ফিতনা থেকে বাঁচাতে গিয়ে যদি মেয়েটিকে অজ্ঞ করে রাখেন, তাহলে তাকে কি সত্যিই নিরাপদ রাখলেন? একজন নারী যদি মূর্খ হন, নিজের চারপাশ সম্পর্কে না জানেন, স্বাস্থ্যসুরক্ষা না বোঝেন, নিজের দ্বীন সম্পর্কে না জানেন, সন্তানকে শিক্ষিত করার মতো জ্ঞান না রাখেন, সমাজের বাস্তবতা না বোঝেন—তাহলে তাকে শুধু ফিতনা থেকে বাঁচানো হয়েছে বললে কথাটা পুরো হয় না। অজ্ঞতাই তো সবচেয়ে বড় ফিতনা ও ক্ষতির কারণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকে শুরু করে সাহাবিদের আমল, খাইরুল কুরুনের নারী মুহাদ্দিসা, পরবর্তী মুসলিম সভ্যতা, উপমহাদেশের আলেমদের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, নারীকে জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা ইসলামের কোনো সার্বজনীন ঐতিহাসিক আদর্শ নয়।

আমাদের সোচ্চার হতে হবে শিক্ষার দরজা বন্ধ করার এই সহজ যুক্তির বিরুদ্ধে। ফিতনার ভয় থাকলে ফিতনা ঠেকানোর ব্যবস্থা করুন, পরিবেশ ঠিক করুন, সীমারেখা নির্ধারণ করুন, আলাদা প্রতিষ্ঠান করুন—কিন্তু মেয়েটার হাতে বই তুলে দেওয়ার পরেই যদি আমরা ভয় পেয়ে যাই, তাহলে একবার অন্তত ভাবি—সমস্যাটা বইয়ে, নাকি আমাদের নিজেদের চিন্তায়?

কারণ, ফিতনা থেকে বাঁচানোর নামে যদি আমরা মেয়েটিকে জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত করি, একদিন হয়তো দেখা যাবে—আমরা তাকে এক ফিতনা থেকে বাঁচাতে গিয়ে অজ্ঞতার আরেক ফিতনার মধ্যে ফেলে দিয়েছি।

আর বিষয়টা যেহেতু বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজার একটি প্ল্যাটফর্মের প্রসঙ্গে এসেছে, তাই আরেকটা বাস্তব প্রশ্নও করা দরকার—ধরুন, একজন নারী চাকরি করবেন না, সংসারই করবেন—তাতেই বা শিক্ষার প্রয়োজন কমে যায় কীভাবে? বরং সংসারটা ঠিকভাবে চালাতেও তো শিক্ষা লাগে।

বাংলাদেশে একজন অল্পশিক্ষিত নারীকেও সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশ, সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন, চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, নিজের ও সন্তানের অধিকার, স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক বোঝাপড়া—এমন অসংখ্য বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তিনি চাকরি না করলেও একজন মা হিসেবে সন্তানের প্রথম শিক্ষক, একজন স্ত্রী হিসেবে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অংশীদার। আর একজন নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব বোঝার প্রয়োজনও তাঁর আছে।

তাই শিক্ষাকে শুধু চাকরি পাওয়ার উপকরণ হিসেবে দেখা আসলে শিক্ষার পরিসরকেই ছোট করে দেখা। একজন নারী ঘরের বাইরে যাবেন না—তবুও তাঁর জ্ঞান দরকার; বরং সুন্দর, সচেতন ও দায়িত্বশীল একটি পরিবার গড়ার জন্য সেই জ্ঞান অনেক সময় আরও বেশি প্রয়োজন।

ফিতনার আশঙ্কাকে সামনে রেখে মেয়েদের শিক্ষার পরিসর সংকুচিত করার যে প্রবণতা এই বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে, সেটার সমালোচনা করতে হবে। কারণ, কোরআন-সুন্নাহ ও সালাফের আমলকে যদি সত্যিই মানদণ্ড ধরা হয়, তাহলে নারীদের ইলমচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্যটিও একই সঙ্গে সামনে রাখতে হবে।

আমার জানামতে, ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগামীদের মধ্যে সালাফি মতাদর্শের মানুষজনও রয়েছেন। আর এই পরিবারও সম্ভবত সালাফি হবেন, যেহেতু সালাফিয়্যাত নিকাহ প্ল্যাটফর্মে সহীহ আকিদার পাত্র খুঁজছেন। তো এত স্কুল করার পরও যদি সালাফিয়াতের বুঝ এই জায়গায় পৌঁছায় যে, ফিতনার ভয়ে তাঁর কন্যা শিক্ষায় অগ্রসর হতে পারলেন না, তাহলে এই ব্যর্থতার দায় কাকে দেওয়া হবে?

আর যদি এই ফিতনা কোনো বাস্তব আশঙ্কা থেকে হয়, অর্থাৎ নিরাপত্তাজনিত কোনো কারণে হয়, তাহলে পরিবার আইনের কাছে তার প্রতিকার চাইতে পারে। যে কারণে তাঁর কন্যার পড়াশোনা বন্ধ হলো, সেই কারণের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আমরা বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ—সবার জন্য ফিতনার আশঙ্কামুক্ত, নিরাপদ শিক্ষার সুযোগ চাই।

৩৭ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top