ওয়ার্কপ্লেসে কত রকমভাবে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট হতে পারে, তা জানতে হলে বাংলাদেশ বোধহয় একটি ভালো জায়গা! কেন বলছি জানেন? সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা এমনই আরেকটি দৃশ্য দেখতে পেলাম।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। বর্তমানে কানাডার একটি স্বনামধন্য মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন। হঠাৎ করেই তিনি তার এক্স-কলিগদের গ্রুপচ্যাটের কিছু স্ক্রিনশট হাতে পান। সেখানে একসময় যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তারাই তাকে স্লাট-শেমিং করছিলেন। তার পারসোনাল লাইফ নিয়েও নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে।
যখন একজন মানুষ একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান, তখন তিনি ধরে নেন, সেই বিষাক্ত পরিবেশটাও হয়তো পেছনে ফেলে এসেছেন। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগে হয়রানির কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা সময়সীমা থাকে না। প্রতিষ্ঠান ছাড়লেও মানসিক ট্রমা কিংবা এসব নোংরা চর্চা যে ছায়ার মতো পিছু ধাওয়া করতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। অফিসিয়ালি সম্পর্ক শেষ হলেও সহকর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক কদর্যতা শেষ হয় না।
মোটা দাগে সবাই মনে করেন, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট মানে গায়ে বাজেভাবে হাত দেওয়া অথবা অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া। আসলে ব্যাপারটা শুধু তা নয়। এই যে এক্স-কলিগকে নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য করা, তাঁর ছবি টেনে এনে আজেবাজে কথা বলা—এসবই সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের মধ্যে পড়তে পারে। সহকর্মীদের অস্বস্তিতে ফেলে এমন স্থূল জোক বলাও সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট। কোনো সহকর্মী উপস্থিত নেই বলেই তাঁকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা—এটাও সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের অংশ হতে পারে। অফিসের সহকর্মীদের সিগারেটের আড্ডায়, লাঞ্চ ব্রেকে, অমুকের জামাটা দেখছেন? তমুকের ফিগারটা দেখেছেন? এ ধরনের মন্তব্যও সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টই। আর এসব হ্যারাসমেন্টের বেশিরভাগ ভিক্টিমই নারী।
কাজের পরিবেশ বা ওয়ার্কপ্লেস কালচারের নামে আমাদের সমাজে এমন এক ধরনের বয়েজ ক্লাব বা বিষাক্ত গসিপ কালচার গড়ে উঠেছে, যেখানে অনুপস্থিত নারী সহকর্মীকে স্রেফ বস্তুর মতো বিবেচনা করা হয়। তা সে অফিসের লাঞ্চ টেবিল, চায়ের দোকানের অফলাইন আড্ডাই হোক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জারের গোপন ডিজিটাল গ্রুপ—সবখানেই যেন একই চর্চা!
এসব জায়গায় নারীদের ছবি, পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন বা চালচলন নিয়ে কথা বলাকে কেবল হালকা বিনোদন বা পুরুষালি আড্ডা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলে। অথচ তারা এটা ভাবেন না যে মুখের বা ইনবক্সের এই অশালীন চর্চাগুলো কোনো সাধারণ আড্ডা নয়। এগুলো অফলাইন ও অনলাইন—উভয় ক্ষেত্রেই বুলিং, মানসিক নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল হতে পারে।
একজন নারী যখন নিজের যোগ্যতায় দেশে বা বিদেশে এগিয়ে যান, তখন তার মেধা বা সাফল্যকে মেনে নিতে না পেরে ব্যক্তিগত জীবনকে টেনে এনে অপমান করাই হয়ে ওঠে এই শ্রেণির পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রধান হাতিয়ার।
আমরা বলি, সচেতনতা দরকার। কিন্তু এ ধরনের হয়রানি ও হ্যারাসমেন্ট থামানোর জন্য কেবল মুখের কথা কোনো কাজে দেয় না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, তা সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি, কর্মক্ষেত্রের বাইরে বা কাজের সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও সহকর্মীদের প্রতি আচরণ নিয়ে স্পষ্ট নীতি ও কঠোর জিরো টলারেন্স পলিসি থাকা জরুরি। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ডিজিটাল কোড অব কন্ডাক্ট কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন, যাতে কেউ মনে না করে যে অফিসের বাইরে বা গ্রুপচ্যাটে যা খুশি বলে পার পাওয়া সম্ভব।
যেকোনো ধরনের সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট বা স্লাট-শেমিংয়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলা এবং সেগুলোকে চিহ্নিত করাই প্রতিবাদের প্রথম ধাপ। ভুক্তভোগী নারী যেভাবে বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন, তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এক সাহসী দৃষ্টান্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা মজার ছলে করা এসব কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকে গুরুতর হয়রানি হিসেবে চিহ্নিত করতে শিখব না, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কর্মক্ষেত্রই নারীর জন্য সত্যিকারের নিরাপদ ও সম্মানজনক হয়ে উঠবে না।



পাঠকের মন্তব্য