ছয় দিন খাটুন, এক দিন মরার মতো বাঁচুন

৮৭ পঠিত ... ২১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে

17 (19)

 

আমাদের এই মূঢ় কর্পোরেট সমাজ একটি অপবিজ্ঞানকে অত্যন্ত ভক্তিভরে পূজা করে। সেই অপবিজ্ঞানটির নাম, সপ্তাহে ছয় দিন খাটা। আমাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত খাঁচায় বন্দি হয়ে টানা ছয় দিন চেয়ার আঁকড়ে ধরে থাকাই নাকি পরম পুরুষার্থ! অথচ এই ষড়দিবসীয় দাসত্ব মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, বরং মানুষকে পরিণত করে একেকটি নির্বোধ যান্ত্রিক পুতুলে।

উৎপাদনশীলতা বা সৃজনশীলতা কোনো কলের লাঙল নয় যে, চাবুক মারলেই তা সকাল-সন্ধ্যা সমান তালে ফসল ফলিয়ে যাবে। শিল্পবিপ্লবের সেই উনিশ শতকের মালিকেরা মনে করত, মানুষকে যত বেশি নিঙড়ানো যাবে, রস তত বেশি বেরোবে। কিন্তু ১৯২৬ সালে হেনরি ফোর্ড নামের এক বুদ্ধিমান ব্যবসায়ীও বুঝেছিলেন, গাধাকে পিটিয়ে ঘোড়া বানানো যায়, কিন্তু তাকে দিয়ে শিল্প সৃষ্টি করানো যায় না। তিনি ছুটির দিন বাড়িয়ে দেখলেন, শ্রমিকের ক্লান্তি কমলে কাজের মান বাড়ে।

কিন্তু আমাদের সমাজ এখনও সেই মধ্যযুগীয় ক্রীতদাসপ্রথার নর্দমায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে।

টানা ছয় দিন কাজের চাবুক খেলে মানুষের মস্তিষ্কে জমে ওঠে সঞ্চিত ক্লান্তি। মস্তিষ্ক তখন কাজ করা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু শরীরটা লোকদেখানো ভণ্ডামি চালিয়ে যায়। ছয় নম্বর দিনে গিয়ে আপনি যে কাজটি করছেন, তা কোনো মৌলিক চিন্তার ফসল নয়—তা কেবল ভুলের পুনরাবৃত্তি। মাত্র এক দিনের ছুটি দিয়ে মানুষকে বলা হয় রিসেট হতে! এক দিনে কি রক্ত-মাংসের মানুষ তার অবসাদ ধুয়েমুছে সাফ করতে পারে? পারে না। ফলে সে বিষণ্ণতা আর দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি নিয়ে আবার এসে বসে তার আধুনিক খাঁচায়।

সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করানো মানে কাজের মান বাড়ানো নয়; এটি হলো মানুষের ভেতরের সৃজনশীলতাকে হত্যা করে তাকে অকর্মণ্য বানিয়ে রাখার এক সুপরিকল্পিত কর্পোরেট ষড়যন্ত্র।

আমরা যেটাকে খুব গর্ব করে হার্ডওয়ার্ক বলি, চিকিৎসাবিজ্ঞান আর আধুনিক মনোবিজ্ঞান তাকে বলে আত্মবিনাশের ধীরগতির মহড়া। সপ্তাহে ছয় দিন কাজের খাঁচায় বন্দি থাকার দ্বিতীয় ভয়াবহ ধাপটি শুরু হয় আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এবং রক্তের ভেতরের হরমোনের নিঃশব্দ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে।

কর্পোরেট প্রভুরা ভেবেছেন, মানুষের শরীরটাও বুঝি তাদের অফিসের ওই বিদ্যুৎচালিত চাতালের মতো। সুইচ টিপলেই চাকা ঘুরতে থাকবে। কিন্তু শরীর ও মন কোনো যন্ত্র নয়। টানা ছয় দিন খাটুনির ফলে রক্তে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা এমন এক সর্বনাশা উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছায় যে, মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা ও অনুভূতিশক্তি অবশ হয়ে আসে। মস্তিষ্ক তার ভারসাম্য হারায়, ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়, আর মনোযোগ ভেঙে পড়ে কাঁচের মতো। আপনি ভাবছেন, আপনি কাজ করছেন; অথচ আপনার অবচেতন মন তখন বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছে।

ডব্লিউএইচও এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একাধিক গবেষণা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করার অর্থ হলো নিজের আয়ু স্বেচ্ছায় কমিয়ে আনা। হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ আর পেশি-কঙ্কালতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনার চমৎকার এক ফাঁদ হলো এই ছয় দিনের কর্মসপ্তাহ।

এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটে মানুষের আত্মিক ও পারিবারিক জগতে। এক দিনের তথাকথিত ছুটির ভিখারি হয়ে মানুষ যখন ঘরে ফেরে, সে আর এক পূর্ণাঙ্গ মানুষ থাকে না। সে হয়ে ওঠে একখণ্ড জ্যান্ত ক্লান্তি, এক বিরক্তির স্তূপ। তার পরিবার, সমাজ, বই পড়া, গান শোনা কিংবা নিখাদ আলস্য উপভোগের অধিকার সম্পূর্ণ কেড়ে নেওয়া হয়।

ফলাফল? বার্নআউট বা পেশাগত চরম অবসাদ। ছয় দিনের দাসত্বে অভ্যস্ত কর্মী তার উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে, জীবনের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা তৈরি হয়, আর কাজের মান গিয়ে ঠেকে শূন্যের কোঠায়। আপনারা কাজের সময় বাড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মানুষটাকে ভেতরে ভেতরে মেরে ফেলে এক অপ্রয়োজনীয় লাশ বানিয়ে দিয়েছেন।

যে মালিক বা সমাজ মনে করে সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করালে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা আকাশ ছোঁবে, সে মূলত নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে। এটি কেবল একটি চিকিৎসাগত বা মানসিক বিপর্যয় নয়—এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক আত্মহনন।

কাজের সময় বাড়ানো এবং কাজের উৎপাদনশীলতার সম্পর্ক সরলরৈখিক নয়। যখন একজন কর্মীকে টানা ছয় দিন কাজ করতে বাধ্য করা হয়, তখন প্রতিষ্ঠানের খরচ কমে না, বরং বহুগুণ বেড়ে যায়। ভুলের হার বৃদ্ধি, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা, ঘন ঘন কর্মী চাকরি ছেড়ে দেওয়া এবং কর্মীদের অসুস্থতাজনিত অনুপস্থিতি; এসবের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা ছয় নম্বর দিনে পাওয়া তথাকথিত বাড়তি কাজের চেয়ে অনেক বেশি। আপনি যত দিন বাড়াচ্ছেন, তত বেশি স্থূল ও নিম্নমানের কাজ তৈরি করছেন।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আজ চার দিনের কর্মসপ্তাহের দিকে হাঁটছে কেবল দয়া দেখিয়ে নয়, বরং অতি কঠোর বাস্তবতার কারণে। আইসল্যান্ড, যুক্তরাজ্য বা বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোর সাম্প্রতিক গবেষণা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, কাজের দিন ও ঘণ্টা কমালে মানুষের ক্লান্তি ও স্ট্রেস কমে, অথচ মোট উৎপাদনের পরিমাণ হয় সমান, না হয় আরও বেশি। কারণ, বিশ্রাম পাওয়া সতেজ মন অল্প সময়ে যে কাজ করতে পারে, ক্লান্ত-অবসন্ন মন ছয় দিনেও তার অর্ধেক করতে পারে না।

সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করানো কোনো শৃঙ্খলা নয়; এটি স্রেফ ব্যবস্থাপনার দেউলিয়াপনা এবং দাসত্বপ্রথার এক আধুনিক সংস্করণ।

যদি আমরা সত্যিই একটি উন্নত, সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল সমাজ গঠন করতে চাই, তবে সপ্তাহে ছয় দিনের এই পচা-গলা মডেলটিকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। মানুষের রক্ত নিঙড়ে ঘণ্টা হিসাব করা বন্ধ করতে হবে; গুরুত্ব দিতে হবে কাজের মান ও মানুষের স্বাধীনতার ওপর। কারণ দিনশেষে, গোলাম দিয়ে হয়তো পিচ ঢালাইয়ের কাজ করানো যায়, কিন্তু কোনো আবিষ্কার বা নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করানো যায় না।

৮৭ পঠিত ... ২১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top