১
ঢাকার জেলের সেই বুড়া অশ্বত্থ গাছটার ছায়া যখন লাল ইটের উঁচা সিনের ওপর থিক্যা আস্তে আস্তে সরে গিয়া উঠানের ধূলার মধ্যে হারাইয়া যায়, তখন বুঝা যায় বেলা পইড়্যা গেছে। এই যে সময়ের গ্যাঁড়াকল, এই গ্যাঁড়াকলে মানুষ যখন আইটকা পড়ে, তখন মানুষ আর আস্ত মানুষ থাকে না, একটা বাটি, একটা থালা আর একটা কম্বলের কারবার হইয়া যায়। সরকারি খাতায় লোকটার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। লম্বা চওড়া শরীর, চোখে থালা সাইজের চশমা, গায়ে সুতি পাঞ্জাবি। কিন্তু জেলের ভেতরের আদমগুলা তারে স্রেফ ‘মুজিব ভাই’ বইল্যা ডাকত।
জেলের তো নিজস্ব একটা দুনিয়া আছে, নিজস্ব বুলি আছে, রাইটার দফা, জলভরি দফা, পাগল দফা। এই দুনিয়ার ভেতরে রাষ্ট্র হুট কইরা মুজিব ভাইরে পইরা থুইছিল, ভাবছিল লোকটা বুঝি চিপায় পইড়া কাইচ্ছা যাইব। কিন্তু লোকটার কারবার আছিল একদম আলাদা। তিনি জেলের এক কোণায় জমিওলার মতো বইসা গোলাপ গাছের গোড়ায় পানি দিতেন, আঙুল দিয়া মাটির চটচটে ভাব দেখতেন।
একদিন বিকেলের দিকে, যখন জেলের কাউয়াগুলা উড়াউড়ি বন্ধ কইরা ডালে গিয়া বইছে, তখন উঠানে দুইটা মুরগি হাঁটতেছিল। একটা মুরগির পা আছিল খোঁড়া। এক কয়েদি ছোকরা, নাম তার রহমত কি সমত হইব, চোখ টিপ দিয়া মুজিব ভাইরে গিয়া কয়, মুজিব ভাই, ঐ খোঁড়াটারে আইজ রাইতে সাফা কইরা দেই? হাড়ির মধ্যে পড়লে ঝোলডা মন্দ হইব না!
মুজিব ভাই চশমাডা নাকের ওপর থিক্যা একটু নামাইয়া লোকটার দিকে তাকাইলেন। তারপর মেলা ক্ষণ চুপ থাইকা হেস্যা বললেন, না রে, ওরে মারিস না।
ঐ রাইতে, যখন পুরা পুরান ঢাকা ঘুমাইয়া গেছে, জেলের লাল বাতিডা মিটিমিটি জ্বলতাছে, আর গরাদের ছায়াগুলা মেঝের ওপর ব্যাঙের মতো পইড়া আছে, তখন মুজিব ভাই রেণুর পাঠানো ফাজিলকাটার খাতায় লিখলেন: ওর হাঁটার ভঙ্গিতে একটা গম্ভীর ভাব আছে। আমি ওকে মেরে ফেলতে চাই না।
কী আজব কাণ্ড! যে লোকটার ঘাড়ে বাইরে পাকিস্তান সরকারের হুলিয়া ঝুলতাছে, রাজপথে মিছিল আর টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়া ওড়তাছে, সেই লোকটা জেলের চিপায় বইসা এক খোঁড়া মুরগির গাম্ভীর্য মাপতাছে!
বাইরে তখন ১৯৬৬ সালের উত্তাল বাতাস। ছয় দফার খাতা খোলা হইছে। আর জেলের এই কুঠুরির ভেতরে মুজিব ভাই খাতার পর খাতা কাইলা করতাছেন। কোনো চাপাবাজি নাই, একফোটা পোলিশ নাই, একদম সাচ্চা কথা। তিনি যেমন সরকারের নগ্ন স্বৈরাচারীরে ধইরা ধুইয়া দিতাছেন, তেমনি নিজের দলের যে রাজনৈতিক পোলাপানগুলা ভীরু, সুযোগ পাইলেই পইলা যায়, তগোরেও কোনো ছাড় দিতাছেন না। ভাসানী সাহেবের চুপ মাইরা থাকা দেইখা খোঁচা মারতেও পিছপা হন নাই। বাঙালি জাতের যে স্বভাব, একজন একটু উপরে উঠলেই ঠ্যাং ধইরা নিচে নামানো, সেই পরশ্রীকাতরতার চামড়াও তিনি ছিলে দিতাছেন নিজের কলমে।
রাইত গভীর হইলে তিনি এক কোণায় কম্বল বিছাইয়া নামাজে দাঁড়ান, কোরআনের তরজমা পড়েন। জেলের নিঝুম অন্ধকারের ভেতর এই একলা মানুষটা তখন কী ভাবতেন? তিনি কি পুরান ঢাকার লালবাগের গলিগুলার কথা ভাবতেন? নাকি ধানমন্ডির ঘরের কথা, যেখানে ছোট্ট রাসেলডা হয়তো মাঅ্যার আঁচল ধইরা জিজ্ঞেস করতাছে, আব্বা কই?
সকাল হইলে একটা হলুদ পাখি গিয়া বসত কাঁঠাল গাছে। মুজিব ভাই চুপচাপ ঐ পাখিডার দিকে চাইয়া থাকতেন। খাঁচার ভেতরে বইসা আরেকটা মুক্ত পাখিরে দেখার যে কী টান, তা ঐ চার দেওয়ালের বাইরের মানুষগুলা জীবনেও বুঝব না। রাষ্ট্র ভাবছিল লোকটারে চার দেওয়ালে বন্দি কইরা একলা বানাইয়া ফালাইছে, কিন্তু লোকটা ঐ একলা থাকার ভেতরেই নিজের ভেতর আরেকটা আস্ত বাংলাদেশ বানাইতাছিল।
২
কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টের সেই ঘরডা আছিল একদম অন্য কিসিমের কারবার। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারির ১৮ তারিখের ঘোর রাইতে যখন পুরান ঢাকার জেলগেটের তালা খুইলা মুজিব ভাইরে মিলিটারি গাড়িতে তোলা হইল, তখন তিনি মাটির দিকে একটু ঝুঁকা পড়ছিলেন। কপালে এক মুঠ ধূলা মাখ্যা নিচু গলায় কিসব জানি বিড়বিড় করছিলেন, আমার এই দেশেতেই জন্ম, যেন এই দেশেতেই মরি।
তবে কুর্মিটোলার বন্দিশালায় পৌঁছাইয়া দেখা গেল, সেইখানে কোনো গান নাই, কোনো গোলাপ গাছ নাই, ইভেন সেই খোঁড়া মুরগিটার গাম্ভীর্য মাপার মতো উঠানডাও নাই।
রাষ্ট্র এইবার এমন এক জ্যামিতি বানাইছিল, যার নাম একাকী কনফাইনমেন্ট।
যে কামরাডায় মুজিব ভাইরে রাখা হইল, তার জানালার কাঁচগুলা লাল রঙে লেপা। বাইরে দিন অইতাছে নাকি রাইত অইতাছে, সূর্য উঠতাছে নাকি অমাবস্যা নামতাছে, বুঝার কোনো কায়দা নাই। মাথার ওপর চব্বিশ ঘণ্টা জ্বলতাছে মেজাজ খারাপ করা এক তীব্র বিজলি বাতি। সময়ের হিসাবডাই রাষ্ট্র এক ঝটকায় হাড়াইয়া দিছিল। কোনো খবরের কাগজ নাই, একটা বই নাই, রেডিওর ঘর্ঘর শব্দ নাই, পাহারাদার মিলিটারির পোলাপানগুলার সাথে কথা বলা তো দূরের কথা, তগোরে কড়া হুকুম দেওয়া আছিল কয়েদির দিকে চাইয়া মুখ ফোটানো যাইব না।
পাঁচটা কড়া মাস মুজিব ভাই ওই লাল কাঁচের আর লাল বাতির ঘরে বন্দি হইয়া আছিলেন।
মানুষ যখন জেলের সাধারণ কয়েদিদের লগে থাকে, তখন থালা-বাটির শব্দেও এক কিসিমের জীবন পাওয়া যায়। কিন্তু যখন চারপাশ একদম নিঝুম, আর চব্বিশ ঘণ্টা মাথার ওপর লাল আলোর অত্যাচার, তখন নিজের মেজাজ আর ঘিলু ঠিক রাখাটাই হইয়া দাঁড়ায় আসল লড়াই। রেণুর পাঠানো খাতাগুলাও তখন কাছে আছিল না। তিনি কোনো খাতা পাইলেন না নিজের মনের কথা লেখনের লাইগা। পরে স্রেফ একটা ছিমছাম বাক্যে সাইজ কইরা লিখছিলেন, মানসিক নির্যাতনের কথা যত কম বলা যায়, ততই ভালো।
এই যে কম বলা, এই কম বলার ভেতরেই কিন্তু আসল কিসসাডা জমা আছিল।
ঘরডার এক কোণ থিক্যা আরেক কোণে গেলে চার কদম। আবার ঘুর্যা এই কোণে আইলে চার কদম। মুজিব ভাই সারাদিন ওই চার কদমের চক্করে হাঁটতেন। লম্বা লোকডা যখন লাল আলোর নিচে মাথা নিচু কইরা পাইচারি করতেন, তখন জেলের সিপাহিগুলা ফুটো দিয়া চাইয়া দেখত। তারা ভাবত, লোকডা হয়তো ঘাবড়াইয়া গেছে, হুট কইরা বুঝি হাড় মাইন্যা নিব। কিন্তু মুজিব ভাই ওই চার কদমের ভেতরেই মেপে নিতাছেন রাষ্ট্র আর কতখানি নিচে নামতে পারে।
মে মাসের দিকে যখন আগরতলা মামলার বিচার শুরু অইল, কুর্মিটোলার ট্রাইব্যুনালে লোকটারে আনা অইল, তখন দেখা গেল লোকটার গায়ের চামড়া কিছুটা ফ্যাকাশে অইছে, চোখের নিচে কালচে ছায়া। কিন্তু ওই থালা সাইজের চশমার পেছনের চোখ দুইডা আগের মতোই টলটলে আর ধারালো।
কুর্মিটোলার লাল বাতি আর নির্জন কামরা লোকটারে ভাঙতে পারে নাই। রাষ্ট্র যতখানি একলা বানাইতে চাইছিল, লোকডা ওই লাল আলোর বৃত্তের ভেতরে বইসাই ততখানি একলা পাহাড়ের মতো শক্ত হইয়া খাড়া হইয়া গেছিল।
৩
মার্চের ছাব্বিশ তারিখের সেই কালরাইতের পর যখন মুজিব ভাইরে করাচি হইয়া সোজা পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি জেলে নিয়া যাওয়া হইল, তখন কিন্তু কিসসাডা আর সাধারণ জেলের কারবার আছিল না। ১ এপ্রিল ১৯৭১। এরপর মিয়ানওয়ালি থিক্যা লায়ালপুর, সাহিওয়াল, জেলখানার নামগুলা কেবল পাল্টাইতাছিল, কিন্তু চারপাশের অন্ধকারডা আছিল একদম এক কিসিমের, নিরেট আর গ্যাঁড়াকলে বাঁধা।
এইবার রাষ্ট্র তারে কোনো রাজনৈতিক বন্দির খাতির করে নাই। তার ওপর সিল মাইরা দিছিল রাষ্ট্রদ্রোহীর।
যে লোকটার একটা কথা শুননের লাইগা রেসকোর্সের ময়দানে লাখ লাখ মানুষ পিলপিল কইরা জমা অইত, সেই লোকটারে এমন এক চিপায় পুর্যা থোওয়া হইল, যেখানে বাতাসের আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই। কোনো পেপার নাই, রেডিও নাই, প্রহরীদের লগে কথা কওন মানা। বাইরের দুনিয়ায় কী অইতাছে, তার একবিন্দু খবর ওই খাঁচার ভেতরে পৌঁছাত না।
তিনি জানতেন না ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঘরডায় রেণু আর পোলাপানগুলা ক্যামনে আছে। তিনি জানতেন না ২৫ মার্চের ওই রক্তগঙ্গার পর সোনার বাংলার মানুষগুলা আদৌ জ্যান্ত আছে নাকি সব শেষ হইয়া গেছে। তিনি কিচ্ছু জানতেন না, না মুজিবনগর সরকার গঠনের খবর, না মুক্তিযুদ্ধের লাল-সবুজ লড়াইয়ের খবর, না ভারতের ইন্টারফেয়ারেন্স, আর না বন্দুক হাতে তরোয়ান পোলাপানগুলার বর্ডার পার অইয়া যুদ্ধ করার কিসসা!
তার দিন কাটত একলাই। আর মিলিটারি আদালতের ট্রাইব্যুনালে বইসা চলত ফাঁসির প্রসেস।
লায়ালপুর আর মিয়ানওয়ালি জেলের উঠানে বসে তিনি নিজের চোখে দেখতেন, কয়েদিগুলা কোদাল দিয়া মাটি কোপাইতাছে। কার লাইগা এই মাটি খোঁড়া অইতাছে? অন্য কারো না, স্রেফ তার নিজের কবরের লাইগা! আগস্ট-সেপ্টেম্বরের সেই চড়া রোদে নিজের চোখের সামনে নিজের কবর খোঁড়ার দৃশ্য দেখা, চিন্তা করেন কারবার! এক রাইতে তো প্রহরীরা প্ল্যানই কইরা ফালাইছিল তারে সাফা কইরা দেওনের। এক বাঙালি অফিসার বা জেলের এক সহৃদয় সুপারিনটেনডেন্ট নিজের ঘরে নিয়া লোকটারে লুকায়া না রাখলে কিসসা অইখানেই খতম হইয়া যাইত।
মৃত্যু তার ছায়ার মতো পিছে পিছে ঘুরতাছিল, কিন্তু লোকটার ঘিলু আর কলিজাডা আছিল অন্য ধাতুর তৈরি। পরে তিনি নিজের মুখে বলছিলেন, আমি জানতাম ওরা আমারে মাইরা ফেলব। কিন্তু আমি এও জানতাম, আমার বাংলা মুক্ত অইবোই।
১৬ ডিসেম্বর অইয়া গেল। ঢাকায় তখন পাকিস্তানি মিলিটারির বড় বড় সারেরা হাঁটু গাইড়া সারেন্ডার করতাছে, বিজয়ের পতপত আওয়াজ উঠতাছে, আর ওইদিকে মিয়ানওয়ালির নির্জন কুঠুরিতে বইসা মুজিব ভাই তখনও কিচ্ছু জানেন না!
ডিসেম্বরের শেষাশেখি যখন তারে জেল থিক্যা বাইর কইরা এক সরকারি গেস্টহাউসে নিয়া যাওয়া হইল এবং ভুট্টো সাহেব গিয়া তার সামনে দাঁড়াইলেন, তখন প্রথম পর্দাডা সরল। ভুট্টো সাহেব যখন বললেন, আপনেরে ছেড়ে দেওয়া অইব, বাংলাদেশ এখন স্বাধীন অইয়া গেছে, তখন মুজিব ভাই এক ঝটকায় খাড়া অইয়া গেছিলেন।
অবাক অইয়া স্রেফ শুধাইছিলেন, কীভাবে সম্ভব?
যে লোকডা জীবনের প্রায় ৪,৬৮২ দিন, অর্থাৎ পুরো আয়ুর এক-চতুর্থাংশ সময় চার দেওয়ালে আইটকা কাটাইলেন, যার চোখের সামনে নিজের কবর খোঁড়া অইল, তিনি যখন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনের প্লেনে উঠলেন, তখন তিনি আর স্রেফ এক বন্দি লোক ছিলেন না; তিনি আছিলেন চার দেওয়ালের অন্ধকার ফেরে আসা এক জ্যান্ত ইতিহাস।



পাঠকের মন্তব্য