মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়?
আমার মনে হয়, মানুষ কোথাও যায় না। মানুষ থেকে যায় তার ফেলে যাওয়া প্রিয় জিনিসগুলোর ভেতরে। কেউ থেকে যায় এক জোড়া পুরনো চশমার ভেতরে, কেউ বা পুরনো ডায়রির কোনো হলদে পাতায়। আর আমি? আমি থেকে গেলাম আমার চৌষট্টি-পয়ষট্টিটা কাঠ আর তামার তারের শরীর নিয়ে শুয়ে থাকা গিটারগুলোর খাঁজে খাঁজে।
আমার জন্ম হয়েছিল ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট। চট্টলা শহর তখন ঘুম থেকে উঠছে। খরনা গ্রামের বাতাস তখন বেশ শান্ত, মায়াবী। বাবা নাম রাখলেন মোহাম্মদ ইসহাক চৌধুরী, মা আদর করে ডাকতেন রবিন। সম্ভ্রান্ত চৌধুরী পরিবার। সেখানে গান-বাজনা ছিল কিছুটা অপরাধের মতো, কিছুটা অলক্ষুণীর মতো। বাবা ছিলেন ধার্মিক মানুষ, চাইতেন ছেলে পড়াশোনা করে কোনো একটা ভদ্র চাকরি করবে।
কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে কোন সুরটা বাজবে, সেটা কি আর বাবা-মায়ের নিয়মে চলে?
আমার শৈশবজুড়ে ছিল জুবিলি রোডের ধুলোবালি, ঘুড়ি ওড়ানোর বিকেল, আর ক্রিকেট বলের পিছু পিছু দৌড়ানো। গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুলে ক্লাস ফাইভে বা সিক্স-এ পড়ি, তখন বাবার মনটা কেমন যেন একটু নরম হলো। তিনি একটা অ্যাকোস্টিক গিটার এনে দিলেন হাতে। কাঠের গায়ে খোদাই করা তারের এক অদ্ভুত জগত! আমি আঙুল ছোঁয়ালাম, আর অমনি মনে হলো আমার ভেতরের ষোল আনা শরীরটাই কে যেন বদলে দিল।
তারপরের গল্পটা কেবল একটা ছেলের পাগল হয়ে ওঠার গল্প।
ক্লাস সেভেনে উঠে আমি শহরের এক বার্মিজ গিটারিস্ট জ্যাকব ডায়াসের কাছে যেতে শুরু করলাম। জ্যাকব ভাই আমাকে শেখালেন কর্ডের খেলা। শেখালেন কীভাবে ছয়টা তারের ভেতর থেকে কান্না আর আনন্দকে আলাদা করতে হয়। কুমার বিশ্বজিতের কাছে একটা পুরনো 'Teisco' ইলেকট্রিক গিটার ছিল। সেটা ধার করে বাজাতাম। শেষমেশ সেটা আমারই হয়ে গেল।
রাতে যখন জুবিলি রোডের বাসা নিঝুম হয়ে যেত, পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়ত; আমি তখন ঘরের দরজা বন্ধ করে কানের কাছে ক্যাসেট প্লেয়ার ধরে রাখতাম। জিমি হেন্ড্রিক্স বাজছে, লেড জেপেলিন বাজছে, ডিপ পার্পল বাজছে। আমি চোখ বন্ধ করতাম। হেন্ড্রিক্স যখন গিটারে আগুন জ্বালাতেন, আমার মনে হতো চট্টগ্রামের এই বৃষ্টিভেজা রাতে আমার বুকের ভেতরও একটা ডিস্টরশন সাউন্ড কেঁপে উঠছে।
আব্বা একদিন রাতে ঘরে ঢুকে বললেন, রবিন, এসব বাজিয়ে পেটে ভাত জুটবে না। গান-বাজনা ছেড়ে দাও। আমি কিছু বলিনি। চুপ করে কাঠের ফ্রেটবোর্ডের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
১৯৭৪ সালের দিকে স্পাইডার ব্যান্ডের সাথে যুক্ত হলাম। তারপর কুমার বিশ্বজিতের সাথে Ugly Boys। তারপর একদিন চায়ের দোকানে বসে গিটার বাজাচ্ছিলাম, হঠাৎ জেমস এলো। জেমস আমাকে দেখে বলল, আমাদের ফিলিংস ব্যান্ডে বাজাবি? আমি রাজি হয়ে গেলাম।
চট্টগ্রাম তখন নতুন এক মিউজিক রেভল্যুশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা হোটেলের আলো-আঁধারিতে ইংরেজি গান বাজাই, তরুণরা গাদাগাদি করে শোনে। ১৯৮০ সালে ডাক এলো ‘সোলস’ থেকে।
ততদিনে আমার মাথা থেকে পড়াশোনার ভূত পুরোপুরি নেমে গেছে। আমি বুঝে গেছি, আমার জীবনের একমাত্র ঠিকানা এই সুর, এই ছয়টি তার। চট্টগ্রামের মায়া, জুবিলি রোডের গলি, আর মায়ের কান্নাকাটি পেছনে ফেলে একদিন একটা ট্রেনের কামড়ায় উঠে বসলাম। পকেটে মাত্র ছয়শো টাকা। গন্তব্য, ঢাকা শহর।
ঢাকা শহর তখন আমার অচেনা। কিন্তু আমার কাছে একটা রূপালী গিটার ছিল। যে গিটার আমাকে বলেছিল, তুই একা নোস, আমি আছি তো!
২
ঢাকার আকাশটা খুব অদ্ভুত। চট্টগ্রামের মতো অত নীল নয়, আবার খুব একটা ধূসরও না। আমি তখন সোলস-এর গিটারিস্ট। দশটি বছর কেটে গেল সেই চেনা আশ্রয়ে। কিন্তু মনের ভেতরে এক অস্থিরতা কাজ করছিল। আমি এমন এক সাউন্ড খুঁজছিলাম, যা শুধু কানে লাগবে না, বুকের ভেতর গিয়ে ধাক্কা দেবে। ডিস্টরশন। এক তীব্র, রুক্ষ, অথচ আবেগী শব্দ।
মানুষ যখন নিজের ছায়াকে ছাড়িয়ে যেতে চায়, তখন তাকে একা হতে হয়। আমি সোলস ছেড়ে দিলাম। অনেকেই অবাক হলো। অনেকেই বলল, কী করছিস বাচ্চু? এত আরামের জীবন ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে নামছিস? আমি শুধু হাসলাম। আমি জানতাম, আমার জন্য এক নতুন জগত অপেক্ষা করছে।
১৯৯১ সালের সেই এপ্রিল মাসে তৈরি হলো আমার নিজের ব্যান্ড। প্রথমে নাম দিলাম লিটল রিভার ব্যান্ড। পরে অস্ট্রেলিয়ান এক ব্যান্ডের সাথে নাম মিলে যাওয়ায় সেটা বদলে হলো ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’। অর্থাৎ LRB। অদ্ভুত এক নাম, তাই না? ভালোবাসা অন্ধ, আর সেই অন্ধ ভালোবাসায় আমরা মেতে উঠলাম সুরের নেশায়। স্বপন, তুতুল, জয়—আমরা চারজন মিলে একটা পরিবার হয়ে গেলাম।
আমাদের প্রথম ডাবল অ্যালবাম LRB I & II বের হলো ১৯৯২ সালে। পুরো বাংলাদেশের মানুষ তখন চমকে গিয়েছিল। এমন সাউন্ড এর আগে কেউ শোনেনি। বাংলা রককে আমরা অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেলাম। তারপর এলো ‘সুখ’ অ্যালবাম। চলো বদলে যাই গানটা আমি লিখেছিলাম, সুরও করেছিলাম নিজের মতো করে। বিয়ের পর মানুষের সম্পর্কের রূপ কেমন বদলে যায়, সেই গোপন গল্পটা আমি গানের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলাম। মানুষ গানটা শুনল, নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নিল। এটাই তো মিউজিকের সার্থকতা।
ততদিনে চন্দনা এসেছে আমার জীবনে। আমার সংসারের খুঁটি। আমাদের সম্পর্কের পথে অনেক বাধা ছিল, পরিবার থেকে মেলামেশায় নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু সেসব বাধা পেরিয়ে যাওয়ার শক্তিটা আমি পেতাম আমার গিটারের তারের ভেতর থেকেই। আমার ‘ফেরারী মন’ অ্যালবামটা ছিল সেই কষ্টের দলিল।
রেকর্ডিং স্টুডিওতে যখন বসতাম, বাইরের জগত ভুলে যেতাম। আমার স্টুডিও AB Kitchen-এ তখন কত রাত কেটেছে। আমি জানতাম, এই তো শুরু। অনেক পথ চলা বাকি। হাজারটা কনসার্ট, হাজারটা মানুষের হাততালির মাঝে আমি নিজেকে খুঁজছিলাম। ঢাকা শহর আমাকে দুহাত ভরে দিচ্ছে, কিন্তু আমার মনটা কি শান্তি পাচ্ছে? না, গিটারিস্টের মনে কোনোদিন শান্তি থাকে না। সে চিরকাল এক অশান্ত পথিকের মতো সুরের পেছনে ছুটে বেড়ায়।
গিটার তখন আমার কাছে শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, গিটার ছিল আমার কথা বলার ভাষা। যে কথা আমি কাউকে বলতে পারতাম না, সেই কথাগুলো বলতাম আমার গিটারের সোলোর মাধ্যমে। আর মানুষ যারা আমার কনসার্টে আসত তারা সেই কথাগুলো ঠিকই বুঝতে পারত। এটাই ছিল আমার জাদুকরী মুহূর্ত।
৩
সময় তখন খুব দ্রুত ছুটছিল। ঢাকা শহর থেকে চট্টগ্রাম, চট্টলা থেকে লন্ডন, সেখান থেকে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। মঞ্চের পর মঞ্চ বদলে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই আলো ঝলমলে মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন আমার কার্ভিন কিংবা ফেন্ডার গিটারটার গায়ে হাত রাখতাম, মনে হতো হাজার মানুষের এই চিৎকার আর করতালি আসলে খুব নিঃসঙ্গ এক সাউন্ডের ভিড়।
দুই হাজার সালের পরের সময়টা। আমার মাথায় ততদিনে হেভি সাউন্ডের ভুত পুরোপুরি ভর করেছে। তুতুল ব্যান্ড ছেড়ে চলে যাওয়ার পর দলে মাসুদ এলো, সেকেন্ড গিটারিস্ট হিসেবে। ব্যান্ডের সাউন্ড আরও কড়া হলো, আরও মেটাল হলো। 'স্পর্শ', 'যুদ্ধ'—আমরা এলআরবি-কে নতুন করে রূপ দিতে চাইছিলাম।
বাইরের মানুষ আমাকে দেখত এক অদম্য রকার হিসেবে। বিশাল সংগ্রহশালায় চওড়া গলায় হাসা এক রাজপুত্র, যার কালেকশনে ৬৫টার ওপর গিটার শুয়ে থাকে যেন বিশ্বস্ত অনুচর। তারা দেখত জিম বিম আর আভিজাত্যের মিশেলে মেতে থাকা এক রঙিন মানুষ। কিন্তু সেই মানুষের ভেতরেও তো একটা মধ্যবিত্ত ছেলে লুকিয়ে ছিল! যে ছেলেটা আজও একলা রাতে স্টুডিওতে বসে কাঁদে, যে ছেলেটা একলা রাতে বুঝে নেয় শ্রোতারা কেবল তার সেই তুমি কিংবা কষ্ট পেতে ভালোবাসির মিষ্টি ব্যালডটাই চায়, তার ভেতরের আধুনিক ব্লুজ কিংবা জ্যাজের পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলোকে তারা অত সহজে নিতে পারে না।
আমার মন বলত, বাচ্চু, তুই তো একটা খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছিস।
একদিকে কনসার্টের ক্লান্তি, অন্যদিকে ভেতরের অশান্ত সুর। আমি আর আমার রূপালী গিটার তখন যেন পরস্পরের মুখোমুখি বসে কথা বলতাম। গিটারে যখন সোলো দিতাম, ফ্রেটবোর্ডের দ্রুত চলাফেরাগুলো আসলে ছিল আমার নিঃশ্বাস নেওয়ার আকুতি। স্টুডিও AB Kitchen-এর লাইটগুলো নিভে এলে আমি একা বসে থাকতাম।
বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ভারী পাথর জমে থাকত। চিকিৎসকেরা বললেন, হৃদযন্ত্রটা নাকি অতটা চাপ নিতে পারছে না। শরীর বিদ্রোহ করছিল, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মঞ্চে উঠে যখনই মাইক্রোফোন আর গিটারটা হাতে পেতাম, শরীরের সব ব্যাথা কোথায় যেন এক নিমেষে উবে যেত! গিটারে ডিস্টরশন প্লাগইন করতাম, স্পিকারগুলো কাঁপতে থাকত, আর আমি ভুলে যেতাম আমার ডাক্তারের বারণ, আমার শরীরের বয়সের হিসাব।
ছেলে আহনাফ আর মেয়ে ফাইরুজকে দেখতাম। চন্দনা আমার পাশে ছায়ার মতো থাকত। সংসার ছিল, ভালোবাসা ছিল, কিন্তু আমার প্রথম আর শেষ প্রেম তো থেকে গেল সেই ছয়টা তারের ভেতরেই।
মৃত্যু যে এত কাছাকাছি হেঁটে বেড়ায়, তা কি মানুষ সহজে বুঝতে পারে? আমি জানতাম না, রূপালী শহরের এই ঝিলমিলে আলো পেছনে ফেলে আমার গন্তব্য আর কত দূর। তবে এটুকু জানতাম, যতদিন এই বুকের ভেতর একটাও স্পন্দন অবশিষ্ট আছে, এই রূপালী গিটার নিশ্চুপ হয়ে থাকবে না।
৪
২০১৮ সালের অক্টোবর মাস। ঢাকা শহরের শরৎকালে আকাশটা একটু বেশিই বিষণ্ণ থাকে। আমার কেমন যেন মনে হতো, এই জীবনের খেলাটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। শরীরটা আর সইছিল না। হৃদযন্ত্রের ভেতরে যে একটা অস্থির সুর অনবরত বেজে চলত, সেটা যেন থামার জন্য ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
১৮ অক্টোবরের সেই সকাল। ঘুম থেকে উঠেই কেমন এক অচেনা নীরবতা চারপাশ ঘিরে ধরল। বুকটা বড্ড ভারী ছিল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সেই পথটুকুতেই বুঝে গিয়েছিলাম, আমার হাতের ফ্রেটবোর্ড, আমার অ্যাম্পের সাউন্ড আর স্টুডিওর লাল লাইট সবকিছু পেছনে ফেলে এবার আমাকে অন্য এক মঞ্চে উঠতে হবে। ৫৬ বছরের এই ছোট্ট জীবননাট্যের পটক্ষেপ ঘটল সেখানেই।
কিন্তু আমি তো চট্টগ্রামকে ভুলে যাইনি। যে শহরের জুবিলি রোড আমাকে গান শিখিয়েছিল, যে মা আমাকে পরম মায়ে আগলে রেখেছিলেন, আমাকে ফিরতেই হতো সেখানে। চট্টগ্রামের মাটিতে, আমার মায়ের কবরের ঠিক পাশটিতেই আমার শেষ ঘুমানোর বিছানা হলো।
মৃত্যুর পর দেখলাম, মানুষ কেঁদেছে। আমার ভালোবাসার শহর চট্টগ্রাম তার মোড়ে রূপালী গিটারের এক বিশাল ভাস্কর্য বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমার আফসোস হয় ব্যান্ডের নাম নিয়ে ঘটা সেই টানাটানি দেখে। যে LRB-কে আমি নিজের রক্তের মতো ভালোবেসে গড়ে তুলেছিলাম, যে গানের সুরগুলো আমরা একসাথে বানিয়েছিলাম, সেসব নিয়ে টানাটানি দেখে আমার আত্মাটাও হয়তো কেঁপে উঠেছিল।
এখন আমি এক নিরবতার জগতে আছি। কিন্তু আমার সেই ৬৫টি গিটার, আমার লিখে যাওয়া চলো বদলে যাই, সেই তুমি, কিংবা ঘুম ভাঙা শহরে এসবের মাঝেই তো আমি রয়ে গেলাম।
মানুষ মরে যায়, মানুষ তার রূপালী গিটার রেখে চলে যায়। কিন্তু যে সুর একবার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, সেই সুরের কি কোনো দিন মৃত্যু হয়?
আমি বাচ্চু, তোমাদের আইয়ুব বাচ্চু, থাকব ওই ছয়টি তারের প্রতিটি প্রতিধ্বনি আর হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসার সুরের মাঝে, চিরকাল।



পাঠকের মন্তব্য