যেসব দেশে স্বাধীনতার অর্থ প্রায় প্রতিটি নাগরিকের জীবনে অনূদিত হয়েছে, মৌলিক মানবাধিকার পূরণ হয়েছে, সেখানে স্বাধীনতা দিবসে লোকজনকে পতাকা হাতে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায় না। খেলার মাঠ ছাড়া আর অন্য কোথাও জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে আতিশয্য নেই। আলোর নিচে অন্ধকারে বেঁচে থাকার বাস্তবতায় আলোকসজ্জার বাড়াবাড়িও নেই।
নাগরিক অধিকার পূরণ হয়ে গেলে দেশপ্রেম ও ধর্মপ্রেমের প্রদর্শনীর প্রয়োজন পড়ে না। বৈষম্যধূসর সমাজে দেশপ্রেম ও ধর্মপ্রেমের ধোঁয়া তুলে একেকটি ইন্টারেস্ট গ্রুপ জীবন নির্বাহ করে। দেশপ্রেম ও ধর্মপ্রেম একেকটি পেশায় পরিণত হয়।
বিভিন্ন দেশ ও জাতি গঠনে সফল নেতাদের সুকৃতি রয়েছে। অথচ পৃথিবীর কোনো কল্যাণরাষ্ট্রে নেতা-পূজা কিংবা কান্না নেই। এসব আতিশয্য কেবল চোখে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার অকল্যাণরাষ্ট্রগুলোতে, প্রায় ব্যর্থ নেতাদের নিয়ে।
আমাদের পরিচিত নেতাদের মধ্যে কামাল আতাতুর্ক, মাহাথির মুহাম্মদ ও লি কুয়ান ইউ নিজ নিজ দেশ ও জাতি গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে এসব কৃতি নেতাকে নিয়ে কান্না নেই।
মিশরের উল্লেখযোগ্য নেতা আনোয়ার সাদাত, লিবিয়ার গাদ্দাফি ও ইরাকের সাদ্দাম হোসেন নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা কালচারাল উইং এই নেতাদের স্মরণ করে কেঁদে জারজার হন না। কোনো সেমিনার-সিম্পোজিয়াম কিংবা প্রবন্ধে রেফারেন্সের প্রয়োজনে এসব নেতার প্রসঙ্গ আসে।
সুতরাং পূর্বে কিংবা পশ্চিমে দক্ষিণ এশিয়ার বিনম্র শ্রদ্ধা ও কান্নার কালচারটি নেই। এমনকি জিম্বাবুয়েতেও কেউ বুদ্ধি খাটিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি করে না। মুক্তিসংগ্রামের নেতা হিসেবে মুগাবেকে শ্রদ্ধা করি, হয়তো তাঁর শাসনকালে কিছু স্বৈরসিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন; কিন্তু তবুও ইতিহাসে তার স্থান নির্দিষ্ট।
এর কারণ, জিম্বাবুয়েতে মুগাবের নামে রাজনৈতিক ধান্দা চালিয়ে যাওয়ার লোক নেই। দক্ষিণ এশীয় বিনম্র শ্রদ্ধার পেছনে খুব সুনির্দিষ্ট ধান্দা থাকে। ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে গান্ধীজি ও জিন্নাহকে শ্রদ্ধা জানানোর লোকের সংখ্যা কম। কারণ, রাজনীতিতে তাঁদের উত্তরাধিকার নেই। আর দেশ দুটিতে অন্য কোনো দেশের কালচারাল কলোনি নেই।
কিন্তু বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর মাঝে আওয়ামী লীগ ও ইন্ডিয়ার ছায়া-উপনিবেশ স্থাপনের অভিলাষ থাকে। ফলে এই শ্রদ্ধা জানানো কখনোই নিঃস্বার্থ হয় না।
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমার জানাশোনার মাঝে ইতিবাচকতা রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের আকাঙ্ক্ষা ও ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের গুণাগুণ তাঁকে বিশিষ্ট করেছিল। স্বাধীনতার পরে ইন্ডিয়া তার ‘এ’ টিম আওয়ামী লীগের ওপর পুরোপুরি আস্থা না রেখে সিপিবিকে ‘বি’ টিম হিসেবে ছায়া-উপনিবেশের মজদুর ভূমিকায় সক্রিয় রেখেছিল। আর ‘সি’ টিম হিসেবে জাসদকে রেখেছিল মুজিবকে টাইট দিয়ে রাখার জন্য। এই ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ টিম প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ বিজয়ের পর ওয়ান-ইলেভেন থেকে আজ অবধি মহাজোট হিসেবে উপস্থিত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এরশাদকে ‘ডি’ টিম হিসেবে হাজির করে দিল্লির সাউথ ব্লক।
ইন্ডিয়ার বাংলাদেশনীতি মুসলিমবিদ্বেষের ওপর দাঁড়িয়ে। ফলে বঙ্গবন্ধু যখন ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)-র সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন, ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সিপিবি আর জাসদকে প্রয়োজন হয় বিশুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির নামে ইন্ডিয়ান কালচারাল হেজিমনি ধরে রাখতে। সিপিবি এ কাজ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে থেকে আর জাসদ এ কাজ বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে গিয়ে করেছিল। সুতরাং দিল্লির সাউথ ব্লকের কাছে বঙ্গবন্ধু পছন্দ ও অপছন্দের মিশেলে একজন নেতা ছিলেন।
ইন্ডিয়ার পলিসি হচ্ছে বংশানুক্রমিকভাবে পাকিস্তানকে ঘৃণা করা। সরাসরি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ কেমন দেখায়, সে কারণে পাকিস্তান শব্দটি জিনগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কট্টর হিন্দু ও নিম্নবর্গের মুসলমানের সংস্কৃতিমনা ছেলেদের মাঝে মুসলিম ঘৃণার প্রতিশব্দ হিসেবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সঙ্গে যেদিন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে লাহোরে গিয়েছিলেন আর ভুট্টোকে ঢাকায় এনেছিলেন, সেদিনই শেখ মুজিবের ওপর ইন্ডিয়ার মন উঠে গিয়েছিল।
ইন্ডিয়ার পলিসি হলো, সেখানে বসবাসরত মুসলমানেরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে থাকবে; আর বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার কালচারাল মজদুরেরা প্রতিদিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, হত্যা ও শিকারের সম্মতি উৎপাদন করে মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখবে। ইন্ডিয়ার কালচারাল হেজিমনিতে অসম্মতি জানালেই ফেসবুকে নিম্নশ্রেণির কট্টর হিন্দু ও নিম্নবর্গের মুসলমানের সংস্কৃতিমনা ছেলে-মেয়ে এসে ‘রাজাকার’, ‘জামায়াতি’ তকমা দিয়ে নিয়ে বেশ একটা প্রণব মুখার্জির মতো আভিজাত্য নিয়ে চেয়ারে গুলটি পাকিয়ে বসবে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে প্রণব মুখার্জি এমন প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, যাতে আওয়ামী লীগ পুরোপুরি একটি হিন্দুত্ববাদী দল হয়ে ওঠে। প্রণব নিজের মেয়েকে হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে যোগদান করাতে ব্যর্থ হলেও হাসিনাকে দিয়ে ঠিকই আওয়ামী লীগ ও বিজেপির সম্পর্কটিকে দাম্পত্য বন্ধনে উপনীত করাতে পেরেছিলেন। হাসিনা তবু মাঝে মাঝে ছুটে গিয়ে হেফাজতের সঙ্গে শোকরানা মাহফিল করলে সিপিবি-জাসদ ও নিম্নবর্গের মুসলমানের সংস্কৃতিমনা ছেলে-মেয়েকে দিয়ে তীব্র নিন্দার ঝড় বইয়ে দিয়েছে দিল্লির সাউথ ব্লক।
আমাদের সমাজের লোকজ আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে একজন মানুষকে দেবতা ও ফেরেশতা হিসেবে দেখতে চাওয়া। এ কারণে একজন নেতাকে দ্রুত মাথায় তুলে আবার আছাড় মারার ঘটনা ঘটতে থাকে। নৈর্ব্যক্তিক ও নিরপেক্ষভাবে কাউকে নিয়ে আলোচনা করার সামর্থ্য দক্ষিণ এশীয় ভ্যাড়ভেড়ে সমাজে অনুপস্থিত।
যেসব শিশু-কিশোর-তরুণকে হাসিনার ফ্যাসিজমকালে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তাদের প্রজন্মের পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো বেশ কঠিন।
জেনেক্স ও সিনিয়র মিলেনিয়ালদের কাছে বঙ্গবন্ধু বিনম্র শ্রদ্ধার। কারণ, তাঁকে সপরিবারে হত্যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি সহানুভূতি জন্মেছে ওই প্রজন্মগুলোর মাঝে। আমি নিজেই ওই প্রজন্মের। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে দেখেছি, ওই শ্রদ্ধা সবসময় জমা হয়েছে আওয়ামী লীগের অ্যাকাউন্টে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের প্রথম একদলীয় শাসন বাকশালের বিষ পানের অভিজ্ঞতা থাকার পরও এ দেশের মানুষ আবার হাসিনার নেতৃত্বে বাকশাল ২.০-এর বিষ পান করেছে।
রাজনীতিতে নিজ কন্যাকে রেখে না গেলে বঙ্গবন্ধু হয়তো গান্ধীজি ও জিন্নাহর মতো খানিকটা নিরাপদে থাকতে পারতেন। গান্ধী ও জিন্নাহ তাঁদের নিজ নিজ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই মারা যাওয়ার কারণে তাঁদের রক্ষীবাহিনী গড়ে উঠতে পারেনি; তাঁদের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ভিক্ষ হয়নি। তাঁদের পরিবারগুলো শেখ পরিবারের মতো অমূল্য রতনে ভরপুর নয়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ইতিহাস গবেষক, সাংবাদিক ও কালচারাল উইং ইন্ডিয়ার পক্ষে ইন্ডিয়ার হেজিমনির সমালোচনাকারীদের ঘৃণা করার শিক্ষা দিয়েছেন সারাজীবন ধরে। কট্টর হিন্দু পরিবারগুলো শতবর্ষ ধরে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরাজিত ইন্ডিয়ান মিডিয়া ও দেশীয় মজদুরেরা সন্তান ও অনুজের বয়সী জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি ঘৃণার প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, তাদের প্রতিটি ঘৃণার সমান ও বিপরীতমুখী ঘৃণার মুখোমুখি হলেই কালচারাল ঘৃণা-বিশারদেরা তাদের ফেসবুক নসিহত ও উপসম্পাদকীয়-টকশোতে ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের বাতিঘর হয়ে পড়ে। এই সেন্স অব এনটাইটেলমেন্ট ও হিপোক্রেসি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমি বিশ্বাস করি, ঘৃণা মানুষকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে, জীর্ণ করে ফেলে। আর এ কারণেই টিভি টকশোতে ও ওয়েব শোতে উপস্থিত হওয়া আওয়ামী লীগ ও ইন্ডিয়ান কালচারাল উইংকে দেখলে ঝোড়ো কাক মনে হয়। আসলে মানুষের অবচেতনের বিকৃতি মুখমণ্ডলে প্রতিফলিত হয়।
তাই আজকের তরুণেরা আওয়ামী ও ইন্ডিয়ান কালচারাল উইংয়ের রাক্ষসদের ঘৃণাবৃত্তে পড়বে না। ঘৃণা নয়, ভালোবাসার বাংলাদেশ বিনির্মাণই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা।
ক্রমাগত যৌক্তিক বিতর্ক করে পোড় খাওয়া অসাড় চিন্তার অচলায়তনটিকে ভেঙে দিতে হবে। পুরোনো বন্দোবস্তের তেলাঞ্জলিভিত্তিক ফকিরি সমাজকে নতুন বন্দোবস্তের শ্রমঘন, সম্মানজনক সমাজে উত্তরণ ঘটাতে হবে।



পাঠকের মন্তব্য