লোহা নয়, এখানে কাটা হয় মানুষের আয়ু

৯১ পঠিত ... ৯ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে

সীতাকুণ্ডের সমুদ্রসৈকতজুড়ে পড়ে থাকে বিশাল সব লোহার কঙ্কাল। পৃথিবীর দূরদূরান্ত থেকে বুড়ো হয়ে যাওয়া বিশাল বিশাল জাহাজগুলোকে এখানে টেনে এনে ফেলে রাখা হয়। তারপর একদল অনাহারী মানুষ হাতে হাতুড়ি আর কাটার টর্চ নিয়ে সেই মরা দানবদের চামড়া আর মাংস ছাড়াতে থাকে। কাগজপত্রে এটাকে বলা হয় ‘শিপ রিসাইক্লিং’, আর সহজ বাংলায় এর নাম লোহা কাটার কারখানা।

ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামের এই ইয়ার্ডটির গায়ে নাকি আঠা দিয়ে সাঁটানো ছিল একখানা গ্রিন

 সার্টিফিকেট। যার অর্থ দাঁড়ায়, পরিবেশ আর মানুষের জীবনের হিসাব নাকি এরা খুব মেপে মেপে রাখে। অথচ ১৪ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর উপকূলে যখন রোদের আলো ফুটে উঠছিল, তখন সেই সার্টিফিকেটের রং কতখানি সবুজ আর কতখানি রক্তের মতো লাল, তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি।

ছুটির দিন হলেও সস্তা শ্রমের কারখানাগুলোতে কোনো ছুটি থাকে না। একদল মানুষকে সেদিন ডেকে আনা হয়েছিল এক বুড়ো এলএনজি, অর্থাৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজের অন্ধকার জঠরে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য।

নিয়মবইয়ে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে—গ্যাসবাহী জাহাজ কাটার আগে তার পাইপলাইন ও সংশ্লিষ্ট অংশগুলোকে ধুয়ে-মুছে শতভাগ গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কারণ সেগুলোর ভেতরে কার্বন মনোক্সাইড আর হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো হিংস্র গ্যাস ওত পেতে বসে থাকতে পারে। কিন্তু নিয়মের বই তো শুধু শহরের বাতানুকূল অফিসের আলমারিতে সাজিয়ে রাখার জিনিস; সীতাকুণ্ডের বিষাক্ত বাতাসে সেই বইয়ের পাতা খোলে না।

বিষাক্ত গ্যাসভরা অন্ধকার চেম্বারের ভেতর যখন সেই অজ্ঞ শ্রমিকদের নামিয়ে দেওয়া হলো, ঠিক তখনই দানবটা তার শেষ নিশ্বাস ছড়াতে শুরু করল। হাইড্রোজেন সালফাইডের ঘনত্ব মুহূর্তের মধ্যে প্রাণঘাতী মাত্রায় পৌঁছে গেল। নিঃশ্বাস নেওয়ারও সময় পেল না মানুষগুলো। একে একে ঢলে পড়ল লোহার মেঝেতে।

মোট নয়জন মানুষ যাদের মধ্যে সানি জলদাস কিংবা মনসুর আলীর মতো নাম ছিল কয়েক মিনিটের মধ্যে নিথর হয়ে গেল।

লোহা কাটার এই ইয়ার্ডে আসলে লোহা কাটা হয় না, কাটা হয় মানুষের আয়ু। একটা সবুজ কাগজের ছাড়পত্র আর কিছু সস্তা শ্রমিকের লাশ ছাড়া এই লোহার জঠরে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

মানুষগুলো যখন জাহাজের অন্ধকূপে শ্বাস নিতে না পেরে ধুঁকছিল, তখন উপকূলে সমুদ্রের বাতাস আগের মতোই বয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সীতাকুণ্ডের সেই বিশাল লোহার খাঁচার ভেতরে সময় থমকে গিয়েছিল।

বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাসের প্রতিটি কণা ভারী হয়ে উঠেছিল। সানি জলদাস বা মনসুর আলীর মতো মানুষগুলো যখন ঢলে পড়ছিল, তাদের বাঁচানোর জন্য ছুটে গিয়েছিলেন অন্য কয়েকজন সহকর্মী। সীতাকুণ্ডের এই ইয়ার্ডগুলোতে এটাই ঘটে—একজন যখন বিষাক্ত গ্যাসে তলিয়ে যায়, তখন পাশে থাকা আরেকজন সস্তা মানুষ তাকে তুলতে গিয়ে নিজেও নিঃশব্দে মৃত্যুকে জড়িয়ে ধরে।

যে ইয়ার্ডটির গায়ে ‘গ্রিন’ বা সবুজ সার্টিফিকেট ঝুলছিল, দুর্ঘটনার ঠিক এক মাস আগেই সেখানে গিয়েছিলেন কলকারখানা পরিদর্শনের কিছু কর্মকর্তা। তারা কাগজে-কলমে ত্রুটি পেয়েছিলেন, নোটিশ দিয়েছিলেন, এমনকি শ্রম আদালতে মামলাও করেছিলেন।

কিন্তু সীতাকুণ্ডে কাগজের মামলার চেয়ে লোহার দাম অনেক বেশি।

মালিকপক্ষ সেই নোটিশকে একপাশে সরিয়ে রেখে বিষাক্ত গ্যাসের ট্যাংকের মুখ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল একদল নিঃস্ব মানুষের সামনে। কারণ শুক্রবার ছুটির দিন হলেও জাহাজ কাটার চাকা বন্ধ রাখা মানেই কয়েক লাখ টাকার লোকসান। আর শ্রমিকের জীবনের দাম? সে তো সীতাকুণ্ডের কাদামাটিতে ফ্রিতেই মেলে।

ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস এলো, সেনাবাহিনী এলো, এলো ক্ষমতার করিডোরের নানা মানুষ। কিন্তু বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছিল না কেউ। তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড ইয়ার্ডের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিল। গঠন করা হলো একাধিক তদন্ত কমিটি।

যেমনটি প্রতিবার ঘটে। কয়েকটি তদন্ত কমিটির নাম, কিছু গুমোট শোকবার্তা, আর নিহতদের পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকার একখানা প্লাস্টিকের চেক।

যে মানুষটার ঘাম আর রক্তে মালিকদের শত কোটি টাকার ব্যবসা দাঁড়ায়, তার পুরো জীবনের দাম এখানে স্থির করা হয় মাত্র ১০ লাখ টাকায়।

এই দেশে শ্রমিকের রক্তের চেয়ে জাহাজের লোহার ধার অনেক বেশি কাঁচা। দুর্ঘটনা ঘটে, লাশ সাজানো হয়, লাল ফিতার দৌড়ঝাঁপ চলে, আর তারপর সবকিছু আবার আগের মতো নীরব হয়ে যায়।

ভাটিয়ারীর কাদা আর রক্তের দাগ শুকানোর আগেই যদি আমরা মানচিত্রের সীমানা ডিঙিয়ে একটু অন্য দিকে তাকাই, তবে দৃশ্যটা কিন্তু একই রকম থাকে না।

এই বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষেই ভারতের গুজরাটে আলং শিপব্রেকিং ইয়ার্ড কিংবা তামিলনাড়ুর বিভিন্ন কারখানার কথা ভাবা যাক। সেখানে যখন কোনো কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসের লিকেজে মানুষ মারা যায় কিংবা কোনো সেপটিক ট্যাংকে শ্রমিকের লাশ পড়ে, তখন খবরটা শুধু সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা তদন্ত কমিটির ফাইলে বন্দি থাকে না।

ঘটনার পর সেখানে আইনের হাত মালিক আর ম্যানেজারের শার্টের কলার পর্যন্ত পৌঁছায়। অপরাধমূলক নরহত্যার ধারায় মামলা হয়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়, পুলিশ গিয়ে লকআপের তালা খোলে। কারখানা সিলগালা করা হয়, আর পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের দায়ে মোটা অঙ্কের জরিমানার মুখেও পড়তে হয় মালিকপক্ষকে।

অথচ আমাদের সীতাকুণ্ডে কোনো মালিকের হাতে হ্যান্ডকাফ পড়ে না। সীতাকুণ্ডের থানায় কোনো অপরাধমূলক হত্যার মামলা হয় না। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে এসে অবলীলায় বলে দেন, “পরিবারের পক্ষ থেকে তো কোনো অভিযোগ আসেনি, ওপর থেকেও কোনো নির্দেশনা নেই।”

যেন অভিযোগ করার ক্ষমতা থাকে সেই অনাহারী পরিবারগুলোর, যাদের উপার্জনক্ষম শেষ মানুষটা কিছুক্ষণ আগেই লোহার খাঁচায় দম আটকে মারা গেছে!

যেন ১০ লাখ টাকার একখানা ক্ষতিপূরণের চেক হাতে গুঁজে দিলেই রক্তের দায় চুকে যায়!

অন্য দেশে যেখানে আইনের শাসন আর আদালতের পরোয়ানা দ্রুত চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে, সেখানে আমাদের দেশের প্রশাসন যেন এক অদ্ভুত ঘুমের ওষুধ খেয়ে বসে থাকে।

কারণটা খুব স্পষ্ট! শিপব্রেকিংয়ের মালিকরা শুধু ব্যবসার মালিক নন, তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার মসনদেরও একেকজন অংশীদার। আইনের বইটা এখানে কেবল গরিবকে বাঁধার জন্য তৈরি, আর কোটিপতিদের জন্য সেই বইয়ের পাতাগুলো স্রেফ এক টুকরো টিস্যু পেপার।

আমরা কেন চুপ করে থাকি?

কেন নয়জন মানুষ যখন লোহার খোপে শ্বাস আটকে মারা যায়, তখন গোটা দেশ কয়েক ঘণ্টার টকশো আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুটো কান্নাকাটি ছাড়া আর কিছুই করে না?

উত্তরটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর।

কারণ যারা মারা গেছে, তারা কেউ শহরের কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের বাসিন্দা নয়, কিংবা কোনো ধনকুবেরের সন্তান নয়। তারা ছিল সীতাকুণ্ডের সস্তা শ্রমের বাজারে প্রতিদিন নিজেদের নাম বিক্রি করতে আসা একেকটি প্রান্তিক মুখ।

এই সমাজ আর রাষ্ট্রের কাছে গরিবের জীবন কোনো অস্তিত্বই নয়; কেবল লাশের তালিকায় যুক্ত হওয়া একেকটি সংখ্যামাত্র।

একজন মানুষ মারা গেলে ১০ লাখ টাকার একটি চেক হাতে ধরিয়ে দিয়ে পুরো বিচারব্যবস্থাকে কেনা যায়। এই বাজারদর মালিকপক্ষ থেকে শুরু করে ক্ষমতার প্রতিটি স্তরের মুখস্থ।

শ্রমিকের মৃত্যু এখানে কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি হিসেবি বিনিয়োগ। লাখ টাকার নিরাপত্তাসামগ্রী না কিনে যদি ১০ লাখ টাকায় একটি লাশের দায় মেটানো যায়, তবে সেই ব্যবসায় লাভই তো বেশি!

এসএন করপোরেশনে এর আগে বিস্ফোরণে ডজনখানেক মানুষ মারা গেল। কিছুদিন ইয়ার্ড বন্ধ থাকল, জরিমানা হলো, তারপর আবার দিব্যি সেখানে লোহার বিকট শব্দ আর আগুনের ফুলকি ফুটতে শুরু করল।

ফেরদৌস স্টিলের বেলাতেও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না।

কয়েক সপ্তাহ যাবে, তদন্তের কাগজগুলোতে ধুলোর আস্তরণ জমবে, ইয়ার্ড আবার খুলে দেওয়া হবে। আর আমরা নতুন কোনো লাশ পড়ার অপেক্ষায় নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ব।

গরিব মানুষ যখন মরে, তখন পৃথিবীর আবহাওয়া বদলায় না। শেয়ারবাজার পড়ে যায় না। ক্ষমতার মসনদ কেঁপে ওঠে না।

তাই আমরা নিশ্চিন্তে নীরব থাকি।

আর এই নীরবতার সুযোগেই শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের সেই কালো অন্ধকূপটি আবার নতুন কোনো সস্তা মানুষের নিঃশ্বাস শুষে নেওয়ার জন্য হা করে বসে থাকে।

৯১ পঠিত ... ৯ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top