হুমায়ূন আহমেদ তাঁর গল্পে শৈশবে দেখা নিজের মায়াময় যৌথ পরিবারের বন্ধন খুঁজে বেড়িয়েছেন। তাঁর জগতটা খুব সহজ একটা জগত ছিল। এই যে আমাদের চারপাশের জগত, সেটা আসলে খুবই আনন্দমুখর এক যৌথ পরিবার। বিজ্ঞাপনের ইলিউশন যে আধুনিকতার ধারণা তৈরি করে, তারপর কথিত আধুনিক হওয়ার যে ইঁদুরদৌড় তৈরি হয়, হুমায়ূন তাকে অস্বীকার করেছেন।
আমার কলেজজীবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনের সামনে লুঙ্গি আর শার্ট পরে সবুজ ঘাসের ওপর বসে তিনি কয়েকজন কলেজপড়ুয়ার সঙ্গে যে ভণিতাহীন আড্ডা দিয়েছিলেন, সেই সহজাত আমুদে মানুষই হুমায়ূন আহমেদ। এর ঠিক পনেরো বছর পর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা ঘুরে, বাংলাদেশি ডায়াসপোরার সংবর্ধনা নিয়েও তিনি আবার একটি একান্ত আড্ডা দিতে চাইলেন। এবার জার্মান পানশালায় খুশির জল চাখতে চাখতে।
দুটো আড্ডাতেই তিনি অপরিবর্তনীয় এক মৌলিক মানুষ। বিশ্বসাহিত্য, সমাজ, দর্শন—কী নিয়ে আড্ডা হয়নি সেখানে! কিন্তু ঐ যে, যে শিক্ষক ছাত্রদের খুব সহজ করে রসায়ন পড়াতে সক্ষম, তিনি সহজ করে বিশ্বসাহিত্যও পড়াবেন—সেটাই তো স্বাভাবিক।
রসায়নের শিক্ষক হওয়ার কারণে তাঁর গল্পে নানারকম হিউমারের ব্যবহার ছিল নিখুঁত। তিনি জানতেন, এই গল্প শুনে কখন মানুষ হাসবে, কখন কাঁদবে, কখন তাকে পাগলামি পেয়ে বসবে, আর কখন সে স্বাভাবিক আচরণ করবে।
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে শুভর আকাঙ্ক্ষা থাকে। অপ্রয়োজনে জটিল হয়ে ওঠা মস্তিষ্ক মানুষকে সাদা-কালো, ভালো-মন্দে চিহ্নিত করতে চায়। হুমায়ূন সেই রায় দেওয়ার স্বভাবের বাইরের লোক। ফলে তাঁর উপন্যাস ও নাটকে অপরাধী চরিত্রগুলো প্রথমে ভয়ংকর হিসেবে দেখা দিলেও, পরে তাদের মধ্যেও ভালো হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়। শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনকে হুমায়ূন বেশি পছন্দ করতেন। সংশোধনভিত্তিক এই দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক প্রভাব নেদারল্যান্ডস ও কয়েকটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের বিচারব্যবস্থায়ও আলোচিত হয়েছে।
রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার সব সমালোচনাই তিনি করেছেন। কিন্তু এমনভাবে সমালোচনা করেছেন, যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তা ব্যক্তিরা আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে পান। নিজেরাই নিজেদের নিয়ে হাসেন।
হুমায়ূন সেই বিরলপ্রজ কথাসাহিত্যিক, যিনি দলীয় রাজনীতির ক্লেদ গায়ে লাগতে দেননি। দলীয় রাজনীতির কর্দমাক্ত সরোবরে তিনি শুভ্র রাজহংস হয়ে সাঁতার কেটেছেন, কিন্তু পালকে এতটুকু কাদা লাগেনি।
মুক্তিযুদ্ধে বাবাকে হারানো, মুক্তিযুদ্ধের পরে রক্ষী বাহিনীর হাতে তাঁদের বাড়ি দখল হয়ে যাওয়া—যাপিত জীবনের এই দুটি অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেও তিনি নৈর্ব্যক্তিকভাবে জনমানুষের মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন করেছেন তাঁর গল্পে। তোতাপাখির মুখে ‘তুই রাজাকার’ বলিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সহযোগীদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। আবার বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে দাড়ি-টুপিওয়ালা মানুষ মানেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী—এমন স্টেরিওটাইপকেও তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন।
বাংলাদেশে বিশুদ্ধ বাঙালি হতে গেলে ইসলামবিমুখ হতে হয়—এই ইন্ডিয়ান স্কুলিংয়ের বাইরে হুমায়ূনের গল্পের চরিত্র রবীন্দ্রসংগীতও শুনেছে, আবার নামাজও পড়েছে। মুসলমান আত্মপরিচয় নিয়ে সংস্কৃতিমনা মহলের যে হীনমন্যতা, তা হুমায়ূনকে বিস্মিত করেছে। আত্মবিশ্বাসী এই কথাসাহিত্যিক সব ধর্ম, গোত্র ও রাজনৈতিক বিশ্বাসে বিভক্ত সমাজকে একসঙ্গে দেখতে চেয়েছেন।
যাদের গল্পে জাদু নেই, যাদের গদ্য সাবলীল নয়, যারা মার্কেজ ও দেবেশ রায়ের কষ্টকল্পিত অনুকরণ করতে গিয়ে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে যায়, পত্রিকার সাহিত্য পাতার গ্যাটিস দিয়ে যাদের কথাশিল্পী হিসেবে দাঁড় করানো হয়—বইমেলায় তাদের বই পাঠকপ্রিয়তা পায় না। অথচ পাঠকদের লাইন ধরে হুমায়ূনের বই কেনা আর তাঁর অটোগ্রাফ নেওয়া দেখে তারা তাঁকে ‘সস্তা’ ও ‘বাজারি’ লেখক বলে তকমা দিয়ে সমালোচনার সাহিত্য থেকে তাঁকে ‘নাই’ করে দিতে চেয়েছে মিডিওক্রেসির কবিরাজেরা।
বাংলাদেশে লিলিপুটেরা সারাক্ষণ এমন গালিভারকে ‘নাই’ করে দিতে দিনরাত সক্রিয় থাকে। তবুও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হুমায়ূন সাহিত্য রাজত্ব করে। ইন্টারনেটের যুগে তাঁর লেখা টিভি নাটকের ক্লিপ যখন ধ্রুপদি হয়ে ঘুরতে থাকে, তখন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির গান্ধাকরণ নীতিতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ফুঁকঝুঁক করে সাংস্কৃতিক কলতলাগুলো খলবল করতে থাকে।
অথচ আজও নতুন প্রজন্মের পাঠক হুমায়ূনের উপন্যাসে নিমগ্ন হয়। নতুন প্রজন্মের সাহিত্যসমালোচকেরা হুমায়ূন সাহিত্যে বাংলাদেশের জাদুবাস্তবতা খুঁজে পান। সমস্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাধির প্রতিষেধক খুঁজে পান তাঁর গল্পে।
খ্রিস্টোফার নোলানের ‘ইনসেপশন’ চলচ্চিত্রটি যারা দেখেছেন, তারা স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন, তারও ভেতর আরেক স্বপ্নের শক্তিতে নতুন পৃথিবীর যে সৃজন দেখতে পান, হুমায়ূন আহমেদের গল্পগুলো ঠিক তেমনই। সেগুলো জটিল পৃথিবী ভেঙে সহজ পৃথিবী নির্মাণ করে।
কমবেশি সব মানুষের মধ্যে নিজেকে নিয়ে, পরিবারকে নিয়ে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিয়ে যে স্বপ্ন থাকে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা খলতায় বাস্তবায়িত হয় না, হুমায়ূনের গল্পগুলো সেই অপূর্ণ সাধ পূরণের ছবি আঁকে। এ কারণেই তাঁর উপন্যাস পড়ে, টিভিতে তাঁর নাটক দেখে স্বপ্নপূরণের আনন্দাশ্রু নিয়ে ঘুমাতে যায় পাঠক ও দর্শক।
জীবন তো রূপকথা হয় না। হুমায়ূন আহমেদও রূপকথা লিখতে বসেননি। মানুষের স্বপ্নপূরণ হয় এমন ছোট ছোট কাজগুলোই তিনি তাঁর গল্পের চরিত্রদের দিয়ে করাতে চেয়েছেন। তাতেই অপার আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেছে সবার মনে।
হুমায়ূন আহমেদের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে, তিনি নিজের জীবন সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় যাপন করেছেন। সমাজের ঠিক করে দেওয়া সাফল্যের সংজ্ঞা তিনি মেনে নেননি। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’—এই ভয়ে যখন মানুষ ভয়ে ভয়ে বাঁচে, তখন তিনি তাকে একদম পাত্তা দেননি। লোকজ মেট্রোপলিটনের আরোপিত স্মার্টনেসের সংজ্ঞা কিংবা ধ্যাড়ধেড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ইন্টেলেকচুয়াল কসরতকে তিনি এক পয়সারও গুরুত্ব দেননি।
যিনি গল্পের জাদুতে মানুষের মনে সাম্রাজ্য গড়েছেন, তাঁর জন্য অমরতা ছিল অনিবার্য। তাঁর গল্প পড়ে পাঠকের যে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে বইয়ের পাতায় পড়ে, তাতেই যেন তাঁর মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে।



পাঠকের মন্তব্য