ব্যাপারটা খুব জটিল কিছু না, কিন্তু আমরা এটাকে এমন এক খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছি যা খেলে পেটের অসুখ হওয়া অবধারিত।
ফুটবল খেলাটা আদতে একটা চামড়ার বল, ২২ জোড়া বুট আর দুটো পোস্টের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে থাকা একটি সাধারণ জ্যামিতি। বলটা যখন বাতাসে বাঁক খেয়ে জালে জড়ায়, তখন পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম কাজ করে, কোনো অলৌকিক অদৃশ্য হাত এসে তাতে দিকনির্দেশ করে না। কিন্তু আমরা, অর্থাৎ পরম উৎসাহী বিশ্ব নাগরিকেরা, সেই গোলপোস্টের কোণে একাধারে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমস্ত প্রস্তাব এনে গুঁজে দিই। স্পেন গোল দিল, অমনি আমাদের মস্তিষ্ক নামক জটিল যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—অতএব, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতির সমস্ত হিসাবনিকাশ এক লহমায় মিটে গেল! স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডের পা থেকে বেরোনো শটটি যেন ফুটবলের বাইরে গিয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক আদালতের রায় হয়ে ঝুলে পড়ল। এই যে খামখেয়ালি লজিকের সার্কাস, একে বিজ্ঞের ভাষায় বলা চলে 'পোস্ট-হক ফ্যালাসি', আর চলতি বাংলায় বলা যায় 'কাকের ডাকে মেঘ ডাকল, তাই কাকই বৃষ্টির দেবতা'।
প্রসঙ্গ যখন এই ঐতিহাসিক ফাইনাল, তখন খেলা শেষে কয়েকজন খেলোয়াড়ের ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো বা দর্শকদের সোচ্চার স্লোগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে যে একখানা বিরাট রাজনৈতিক মহাকাব্য ফেঁদে বসা হলো, তা দেখে হাসি চাপানো কঠিন। একজন খেলোয়াড় তার ব্যক্তিগত আবেগ বা মানবিক অবস্থান থেকে একটা কাপড়ের টুকরো হাতে তুলে নিতেই পারেন; নিউইয়র্কের রাস্তায় বা গাজার অলিতে-গলিতে মানুষ মুহূর্তের উল্লাসে মেতে উঠতেই পারে। কিন্তু সেই উল্লাসকে যদি আপনি ফিলিস্তিনের চূড়ান্ত স্বাধীনতা বা ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার বলে চালিয়ে দিতে চান, তবে বুঝতে হবে আপনার যুক্তির পায়ে চোট লেগেছে, অবিলম্বে ফিজোথেরাপি দরকার। মিডিয়া—সে টাইমস অব ইসরায়েলই হোক আর আল জাজিরাই হোক—তাদের কাজই হলো একটা ফুটবল ম্যাচকে আস্ত একখানা প্রক্সি ওয়ার বানিয়ে টিআরপি-র দোকান চালানো। কিন্তু আমরা সাধারণ দর্শকরা যদি সেই সস্তা ন্যারেটিভের ফাঁদে পা দিয়ে ভাবি যে মাঠের ২২ জন খেলোয়াড় আসলে ভূ-রাজনীতির বন্দুক ঘাড়ে নিয়ে দৌড়াচ্ছে, তবে ফুটবলের আসল নির্যাসটাই তো উবে যায়!
আর্জেন্টিনা যদি কালকে জিতে যেত, তবে কি ধরে নিতে হতো যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য পক্ষ জয়ী হয়ে গেল? নাকি তখন যুক্তি পাল্টে গিয়ে বলা হতো—স্রষ্টা এবার জোচ্চুরিটা সয়ে নিলেন?
দুটোই সমান মানের গাঁজাখুরি যুক্তি! বল পোস্টে লেগে ফেরত আসলে সেটা ডিফেন্ডারের ভাগ্য বা স্ট্রাইকারের টিমিংয়ের ভুল, কোনো মহাশূন্যের ফতোয়া না।
স্পেনের জয়কে যদি রাজনৈতিক বিজয় বানাতে হয়, তবে বিশ্বজুড়ে চলা সমস্ত লিগ, সমস্ত অলিম্পিক, এমনকী পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচকেও রাজনীতি আর ধর্মের বিষাক্ত রসে চুবিয়ে পরিবেশন করতে হবে। তাতে খেলার মাঠে রাজনীতি ঢুকবে ঠিকই, কিন্তু মাঠের সেই নিখাদ আনন্দটা গ্যালারি থেকে চিরতরে ইস্তফা দিয়ে বেরিয়ে যাবে। খেলাটা মাঠেই শেষ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তাকে জোর করে ড্রয়িং রুমের রাজনৈতিক তরজা আর ধর্মীয় ফ্যালাসির প্রক্সি বানিয়ে আমরা যে আনন্দ পাচ্ছি, তা আর যাই হোক—যুক্তিপূর্ণ নয়।



পাঠকের মন্তব্য