হ্যাপি বার্থডে টু দ্য ডন!

৪১ পঠিত ... ১৯:১৭, জুলাই ১৯, ২০২৬

ফোন হাতে নিয়া বইসা আছি। ডেইলি ব্যস্ত থাকি নানা কাজ- নানা ঝামেলায়। আইজ একটু ফ্রি আছি। তাই কি করি বুইঝা উঠতে পারতেসি না। এর মইধ্যে সেভেনে পড়া ভাগিনা হাতে একশো বছর পুরানা (মানে দেইখা মনে হইতেছে আর কি) একটা আধা বাদামি ঝুরঝুরা হয়ে আসা আধ-মরা বই আইনা আমারে দেখায়ে বলতেছে,

: উপস, মামা! দেখো কি একটা বেরিয়েছে আমার খাটের নিচ থেকে। মা আজ খাট সরিয়েছে তো ময়লা সাফ করার জন্য! সি? হাউ অ'ফুল! মাই হ্যান্ডস বি লাইক: ও গড! হাউ কুড আই সারভাইভ দিস?

আমি গভীর মনোযোগে ভাইগ্নার হাতের দিকে চাইয়া রইলাম কিছুক্ষন। জিনিসটা আমার এইরম চেনাচেনা লাগে ক্যান? আরেহ! এইটা তো….

খাবলা দিয়া নিয়া গেলাম বইটা ওর হাত থেইকা। মনে চাইলো পাড়ার লালুর মত একটা রাম-দাঁতখিঁচানি দিয়া দিতে। হালার বজ্জাত! আমার কইলজায় হাত দিছে! 

ভাইগ্না আমার চেহারা দেইখা একটু মনে হয় ডরাইয়া গেল। সে সবসময় আমার ‘পইজড’ চেহারা দেইখা অভ্যস্ত। কিন্তু আমি করি কি? আমার ‘মাসুদ রানার- অগ্নিপুরুষ’ এই পোলার হাতে! এইযে, পিছনের  মলাটে আমার নিজের হাতের লেখা- ‘'পড়ার মুল্য পাঁচ টাকা'! কতবছর আগে হারায়া গেসিলো বইটা আমার কাছ থেইকা। তখন আমি নিজেই পড়ি ক্লাস নাইনে।

‘৯৪ সালের স্কুলের গরমের ছুটির টাইম চলে। এস.এস.সি মানে সবাই যেইডারে কইত ম্যাট্রিক- সেই পরীক্ষা আসতেছে। সো, চারিদিকে কঠিন বেড়া। মাঠে যাওয়ার সুযোগ সপ্তাহে দুইদিন। বাকি টাইম পড়াশুনা। আব্বা যতক্ষন বাসায় থাকত-ততক্ষন আব্বাই পাহারাদার। আব্বা না থাকলে আম্মা! একদিন বিকালবেলা। দ্বিতীয় গ্রেডের পাহারাদার আম্মার কড়া নির্দেশ- আজকে ভূগোলের 'ঝড়-বৃষ্টি ও জলবায়ু' অধ্যায় মুখস্থ না করে টেবিল থেকে ওঠা যাইব না। আম্মা নিজের কাম করে আর একটু পর পর হুঙ্কার দেয়, কান দুইডারে বাদুড়ের মত খাড়া কইরা রাখে। পোলায় ফাঁকি দেয় না তো আবার?

আমিও বাধ্য ছেলের মতো টেবিলে বসা। সামনে ভূগোলের বই খোলা। লগে কিছু খাতা-পত্র। আঁকাআঁকির জিনিসপাতি। ভুগোলে চিত্র আঁকা লাগে। কিন্তু টুইস্টটা ছিল অন্য জায়গায়। সেই ভূগোল বইয়ের আর তার লগের এইসব জিনিসপাতির পেটের মইধ্যে  লুকায়া রাখা নীল মলাটের এক চিমটি নিষিদ্ধ সুখ- কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা: অগ্নিপুরুষ’।

গতকাইল মাঠে খেলতে গেছিলাম। এক মাস ধইরা টিফিনের টাকা আর টুকটাক কয়েকটা জমানো টাকা মিলায়া লুকায়া গিয়া কিনা আনছিলাম এই বইটা! নতুন আসছে! আহা! সুবাস!

পুরা সপ্তাহ আর বাইরে বাইর হইতে পারব না। সারাদিন মানুষ পড়ার বই পড়ে কেম্নে? আর কাজিদার বইয়ে যে মজা- তাই কি আর আছে কোথাও? তাই বইটা এখন আমার ‘'ভেন্টিলেটর মেশিন'! এইডা ছাড়া উপায় নাই। 

একদিকে আম্মা ভাবতেছে ছেলে তার জলবায়ুর উপাদান মুখস্থ করতেছে, আর অন্যদিকে আমি তখন রানার সাথে লুবনা হত্যার প্রতিশোধ নিতে ব্যস্ত। চিন্তা করলেই গায়ের মইধ্যে কেমন শিরশির করে! কঠিন ক্লাইম্যাক্স চলতাছে বইয়ে, তখনই দরজার বাইরে আম্মার চটি স্যান্ডেলের আওয়াজ!

আমার কইলজা লাফায়া গলায় উঠছে কিন্তু  নাইনটিজ কিডস বইলা কথা! আমাগো যে রিফ্লেক্স অ্যাকশন আছিলো- মিলি-সেকেন্ডের মধ্যে স্পাইডারম্যানের চেয়েও দ্রুত গতিতে ডান হাত দিয়ে 'অগ্নিপুরুষ’ চালান হইয়া গেলো আমার চেয়ারে-তারওপর বইসা পড়লাম আমি। আর বাঁ হাত দিয়ে ভূগোল বইটা মুখের সামনে আইনা ধুমায়া পড়া শুরু- ‘বারিপাত প্রধানত চার প্রকার, যথা-'

আম্মা ঘরে ঢুইকা  এক পলক চোখ ছোট ছোট করে তাকায়া ‘জোরে পড়, গলায় জোর নাই? বাইরে থেকে শুনি না ক্যান?’ বইলা একটু রিলাক্সেই  চইলা  গেল। যাক, ফাঁকি দিতেছে না! 

আম্মা যাইতে না যাইতেই  রানা আবার বাইর হলো। সেই আমল থেইকাই তো আমরা নিজেরাই জেমস বন্ড বা মাসুদ রানার চেয়ে কোন অংশে কম আছিলাম না।

বইটা আবার শরীফ চাইছে পরশুদিন। এই মইধ্যে পড়া শেষ করা লাগব! বইয়ের পিছনে বড় যত্ন কইরা লিখলাম- পড়ার মুল্য পাঁচ টাকা। এতো সাধের বই- ফ্রি-তে পড়তে দিব আর হজম কইরা ফেলবে এটা আমার হজম হবে না। আর ঐ টাকাটা পাইলে আস্তে আস্তে পরের বইগুলো কেনার টাকাও জমবে। আর যদি টাকা না-ও জমে, তাইলে যে টাকা দিতে পারবে না তার কোন একটা বই দিবে পড়তে! লাভ হবেই এমনই ব্যবস্থা! 

সন্ধ্যা হইয়া গেছে। আম্মা নাশতা করতে ডাকতেছে। বইটারে একগাদা পড়ার বইয়ের মাঝখানে ভালোমত গাইড়া রাইখা টেবিল থেইকা উঠছি আর কারেন্টটা  চইলা গেল। কি আর করা- গেলাম, নাশতা সারলাম, মোমবাতি নিয়ে ফিরা আসছি খুশিমনে- মোমবাতির আলোয় রানা পড়ার যে থ্রিল- এইডা কি আর বাপ-মায়ে বুঝবো! কিন্তু….!

আমার বইটা তো নাই এখানে! এইখানে ক্যান, কোনখানেই তো দেখতাছি না! সব জায়গায় খুজলাম কোথাও পাইলাম না। নিলো কে? ঠাডা পড়ব তার ওপর যদি কেউ নিয়া থাকে! সেই যে বইটা হারাইলো, না আর তা খুইজা পাইলাম আর না পড়া শেষ করতে পারলাম!

পরের কয়দিন কি যে আতঙ্কে গেল আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। একদিকে বইটা হারায় গেছে সেই মনে কষ্ট আরেকদিকে বইটা কোত্থেকে কার হাতে বাইর হয়ে আব্বা-আম্মার হাতে পড়ে- আল্লাহ মালুম! তাইলে আর বেত একটাও আস্ত থাকব না, আর না আমার পিঠ! আর আম্মার খুন্তি- ঝাড়ু- স্যান্ডেল তো আছেই! আল্লাগো রহম কর। এই ভয়ে বই হারানোর দুঃখটা জোর দিয়া গায়েও লাগাইতে পারতেছি না। কি কষ্ট! 

আইজ বাইশ বছর পর বুঝলাম আমার সেই বইটা চুরি করছিলো আমার সারাজীবনের শত্রু, আমার জীবনের বিষফোড়া, এই জেনজি পোলাটার মা, আমার বড় বোন! মনে চাইলো বাইশ বছর আগের প্রতিশোধটা রানার মত করে নিয়া নেই!

কিন্তু থাক, এখন আর সেই তাকত নাই শরীরে! তার চেয়ে আজ কাজিদার জন্মদিনে আমার সেই না পড়া বইটা বরং পইড়া ফেলি! আহা! আমার নিউজপ্রিন্ট কাগজের ঝুরঝুরা বই! তাতে কি? ভিতরের মাল-মশলা এখনো তরতাজা!

কাজীদা গো, আমাদেরকে চরম লেভেলের 'ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটি' আর নিখুঁত টাইমিংয়ে মিথ্যা বলা শিখাইছেন কিন্তু আপনি-ই। যে পরিমান মাইর খাইছি আপনার লেখা পড়তে গিয়া তার হিসাব নাই! কিন্তু,আমাদের পড়ার টেবিলগুলারে  একেকটা রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধক্ষেত্র বানায়ে তোলার জন্য আর আমাদের সাদা-কালো কৈশোরকে বড় সুন্দর রঙে  রাঙ্গানোর জন্য ধন্যবাদ। একটা আস্ত জেনারেশনকে বইয়ের পোকা বানাইছেন আপনি, কাজীদা। হ্যাটস অফ!

ওপারে ভালো থাকবেন, হ্যাপি বার্থডে টু দ্য ডন!

 

৪১ পঠিত ... ১৯:১৭, জুলাই ১৯, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top