ঘটনাটা শুরু হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, ফ্রান্সের ফ্রঁসোয়া বিনে নামের এক ভদ্রলোকের হাত ধরে। ফরাসি সরকার ওনাকে বলল, স্কুলে কোন বাচ্চাগুলো পড়াশোনায় একটু পিছিয়ে পড়ছে, তাদের একটা তালিকা করে দিন তো।
বিনে সাহেব একটা টেস্ট তৈরি করলেন। কিন্তু উনি স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়েছিলেন; এটা কিন্তু মানুষের চিরস্থায়ী বুদ্ধিমত্তা মাপার কোনো স্কেল নয়!
সাদা চামড়ার কিছু মানুষ এই টেস্টটা হাতে পেয়ে ভাবলো, এবার এটা দিয়ে প্রমাণ করে দেওয়া যাবে যে আমরা কতটা সুপিরিয়র, আর গায়ের রঙ যাদের একটু ময়লা, তারা কতটা ইনফিরিয়র!
আমেরিকায় যখন বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসীরা জাহাজে করে আসতে শুরু করল, তাদের বিমানবন্দরে দাঁড় করিয়ে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো আইকিউ টেস্ট। একটা মানুষ ইতালীয় কিংবা হাঙ্গেরিয়ান ভাষা বলে, সে ইংরেজি জানে না, আমেরিকান সংস্কৃতি চেনে না; তার হাতে ইংরেজি ভাষার ধাঁধা ধরিয়ে দিয়ে বলা হতো, তোমার আইকিউ কম, তুমি এই দেশে ঢুকতে পারবে না!
এরপর এলেন রিচার্ড লিন নামের এক ব্রিটিশ মহাশয়। উনি উনার বন্ধুকালীন গবেষণাগারে বসে পৃথিবীর ২০০টা দেশের মানুষের আইকিউ-এর একটা তালিকা বানালেন। উনি কী করলেন জানেন? যে দেশগুলোতে কোনোদিন আইকিউ টেস্টই নেওয়া হয়ননাই। যেমন ধরুন আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ। সেখানকার মানুষের স্কোর উনি অনুমান করে বসিয়ে দিলেন! অর্থাৎ, ঘরের কোণে বসে চা খেতে খেতে উনি সিদ্ধান্ত নিলেন কার মগজে কতটুকু ঘিলু আছে। এই রিচার্ড লিনেরই বানানো সেই অবাস্তব, বর্ণবাদী তালিকারই কাট-কপি-পেস্ট ভার্সন হলো আজকের ওই 'ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ'-এর ডাটাবেস!
আসল মজাটা কিন্তু এখানে না। বিজ্ঞান কী বলে শোনেন। মনস্তত্ত্বে একটা বিখ্যাত তত্ত্ব আছে, ফ্লিন ইফেক্ট।
নিয়মটা খুব সোজা: একটা বাচ্চা যদি ছোটবেলায় পুষ্টিকর খাবার পায়, ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়, আর তাকে যদি এই ধাঁচের পরীক্ষার সঙ্গে অভ্যস্ত করানো হয়; তাহলে তার আইকিউ হুহু করে বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, আইকিউ আপনার মগজের সাইজ বা ক্ষমতার প্রমাণ নয়, ওটা স্রেফ আপনি কতটা ভালো সুযোগ-সুবিধা আর শিক্ষা পেয়েছেন, তার একটা রিপোর্ট কার্ড!
সোজা বাংলায়, একটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ আর বার্গার খাওয়া সুযোগ-সুবিধা পাওয়া বাচ্চার সাথে যদি অপুষ্টিতে ভোগা বা ঠিকঠাক স্কুলে না যেতে পাওয়া একটা বাচ্চার আইকিউ দিয়ে তুলনা করেন; তাহলে আপনি আসলে তাদের 'বুদ্ধি' মাপছেন না, মাপছেন তাদের 'দারিদ্র্য'।
তাই কোনো ওয়েবসাইটে একটা দেশের আইকিউ র্যাঙ্কিং দেখে এই দেশের মানুষ কম বুদ্ধিমান বা ওই দেশের মানুষ বেশি বুদ্ধিমান—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ঠিক না। বিষয়টা এত সহজ নয়, আর বিজ্ঞানও এমন সরল ব্যাখ্যা দেয় না।



পাঠকের মন্তব্য