৪ আগস্ট সকালবেলা। আমরা প্রেসক্লাব থেকে একটা ছোট মিছিলের সাথে শাহবাগে আসলাম। ওইদিনই ছাত্রলীগের ৭ মিনিটে মাঠ খালি করার আল্টিমেটাম দেয়া ছিল। আমরা ডরেই ছিলাম কিঞ্চিৎ। কিন্তু পরে জমায়েতের পরিমাণ দেখে ভয়ের কারণ কমলো। মনে হলো না তারা এইদিকে বেশিকিছু করতে পারবে। আরো কয়েকজন বন্ধু আসলো পরে ক্যাম্পাসে একটু ঘোরাফেরা করতে শুরু করলাম, বন্ধুরা দেয়ালে গ্রাফিতি করলো। ফেসবুকে আশপাশের খবর নিচ্ছিলাম। শুনলাম সাইন্সল্যাবের দিকে গুলি চলেছে। ঢাকার বাইরেও কিছু জায়গায় একই অবস্থায়। কিন্তু আস্তে আস্তে নেটের গতি কমে যাচ্ছিল। ক্রমে আপডেট কম পেতে থাকলাম। আমাদের যাদের বাসা একটু দূরে, তারা বিকালের আগে আগে বাসায় রওনা দিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে নেট পুরাপুরি বন্ধ। কোনদিক দিয়ে যাওয়া নিরাপদ হবে তার কোনো খবরই পাচ্ছিলাম না। বাংলামটোরের মোড় পর্যন্ত গিয়ে শুনি সামনে সমানে গুলি চলছে। আবার ফেরত আসি ঢাবিতে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর আরো অনেক হামলার মুখে কোনোরকম জান নিয়ে ঘরে ফিরি সেদিন।
এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় আমাদের এই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকাটা কেমন ছিল। অনেকেই নানান কারণে আন্দোলনে প্রতিদিন রাস্তায় থাকতে পারেনি। কিন্তু সবারই মন পড়ে ছিল সেইখানেই। যে-যার মত করে অবদান রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। যারা ঘরে ছিল তারা আন্দোলনকারীদের জন্য একটু পরপর আপডেট পোস্ট করছিল, কোনখানে ঝামেলা হচ্ছে বা কোনখান অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আছে। অনেকেই নিজের বাসা বা পরিচিত কারো বাসার ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছিল, যাতে কোনো ঝামেলা হলে তাদের বাসায় গিয়ে আন্দোলনকারীরা আশ্রয় নিতে পারে। আবার বিভিন্ন এলাকার বাসার লোকজন ওয়াইফাই উন্মুক্ত করে দিয়েছিল আন্দোলনকারীদের সুবিধার জন্য। তাছাড়াও, সোশ্যাল মিডিয়ার নিজস্ব অ্যালগোরিদমের কারণেই আপনার সামনে আসতে থাকবে আপনার সমমনাদের প্রোফাইল। যারা আপনারই মত সোচ্চার এই সংগ্রামে। ফলে নিজেদের মধ্যে একটা আলাদা কমিউনিটি তৈরিতেও সোশ্যাল মিডিয়া ভূমিকা রেখেছিল। আমি নিজেই ডজনখানেক ম্যাসেঞ্জার গ্রুপচ্যাটের সদস্য ছিলাম, এবং এই প্রত্যেকটা গ্রুপ কোনো-না-কোনোভাবে আন্দোলনে বহুমুখী অবদান রাখছিল। এই ধরণের সঙ্ঘবদ্ধতা ত্রাসের সময়ে মনের মধ্যেও জোর আনে।
যদিও বিভিন্ন সময়ে এ ধরণের অনলাইন তৎপরতাকে 'কি-বোর্ড যোদ্ধা' কিংবা 'অলস অ্যাক্টিভিস্ট' (Slacktivist) জাতীয় শব্দবন্ধ দিয়ে অগুরুত্বপূর্ণ ও হাস্যকর প্রতিপন্ন করার চল রয়েছে। কিন্তু আমাদের এইদিককার বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। ২০১৮ সালের ডিএসএ আইন পাশ হওয়ার পর থেকে একটা ফেসবুক পোস্ট দিতে গেলেও যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে দিতে হয়। সামান্য একটা ফেসবুক পোস্টের জন্য ছাত্রলীগের গুন্ডাদের হামলায় প্রাণ হারান শহিদ আবরার ফাহাদ। অনলাইন তৎপরতার ফলে জেলখানায় খুন হন শহিদ মুশতাক আহমেদ। আরো অসংখ্য মানুষ নানানভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে। সুতরাং, আমাদের প্রাক্তন সর্বাত্মকবাদী সরকার অনলাইন তৎপরতাকে ভালোই গুরুত্ব দিত বলে মনে হয়। এর কারণও আছে।
২০১১ সালে রাষ্ট্রপতি মুবারাকের বিরুদ্ধে মিশরীয় জনগণের আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার সেই আন্দোলনকে অনেকটাই প্রভাবিত করেছিল। এটাই সম্ভবত প্রথম আন্দোলন যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রায়শই একে 'ফেসবুক বিপ্লব' বা কখনো কখনো 'টুইটার বিপ্লব' নামে আখ্যায়িত করা হয়। ২০১০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মিশরে যখন একটা ক্যাফের সামনে খালেদ সাঈদ নামক এক তরুণ ব্যবসায়ীকে পুলিশ নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন সেই হত্যাকান্ডের ছবি ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মত। ফেসবুকে 'আমরা সবাই খালেদ সাঈদ' নামে একটা পেজ খোলা হয়, যাতে সেই সময়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাড়ে তিন লাখ ফলোয়ার জুটে যায়। এই ঘটনা আন্দোলনকে তুমুলভাবে বেগবান করে। আমাদের আন্দোলনেও একজন সাঈদের হত্যার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মত ছড়িয়ে যায়। আমাদের আবু সাঈদ, পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া আবু সাঈদ। মানুষ হতভম্ব হয়ে যায় সরকারের হুকুম তামিলকারী পুলিশের নৃশংসতায়। মানুষ সাহসীও হয়ে ওঠে। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের ভাষায়, "তারপর থেকে কোনো যুবকই আর হার মানে নাই।"
সোশ্যাল মিডিয়ার এই ভূমিকাটা মজার। সাধারণত রাষ্ট্র আমাদের সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখে। কিন্তু প্রত্যেকের হাতে মোবাইল ও ইন্টারনেট থাকায়, উলটা রাষ্ট্রই সার্বক্ষণিক সার্ভেইলেন্সের মুখে পড়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রথাগত সকল গণমাধ্যম নানান কারণে বাধ্য হয় সরকারের পছন্দসই বয়ানই হাজির করতে। যখন পুরো দেশ আগুনে জ্বলছিল, তখন বিটিভিতে চলছিল একি রণ বাজাবাজি ও বাতাবিলেবুর বাম্পারফলন। বিটিভির কার্যালয়ের ধ্বংস হওয়ার পর কেন তারা জনগণের বিন্দুমাত্র সহানুভূতিও পায়নি তার কারণ বোঝা কঠিন না। ফলে জনগণের নিজেরই এক বিকল্প গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করতে হয়। এই ধরণের বিকেন্দ্রীভূত গণমাধ্যমকে বলা হয় নাগরিক সাংবাদিকতা, যেখানে নাগরিক নিজেই প্রাথমিক সূত্রে তথ্য ও খবর পেশ করেন সহ-নাগরিকদের সামনে। আরব বসন্তের সময়ই মূলত এই নাগরিক সাংবাদিকতার ধারণার উদ্ভব হয়। বাংলাদেশেও আমরা এই ঘটনাই ঘটতে দেখলাম। যখন রাষ্ট্রের সকল নৃশংসতার প্রমাণ ভিডিও-ফুটেজ সহ প্রকাশ পেতে থাকলো, ও আন্তর্জাতিক মহলেও পৌঁছে যেতে লাগলো, তখন সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলো (অথবা দুর্বৃত্তরা ডেটা সেন্টারে আগুন দিয়েছিল, বা স্যাটেলাইটে পানি, বা ইন্টারনেট নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেছিল।) ১৮ আগস্ট ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার পর আমাদের সবার ফোন-ক্যামেরা ছিল প্রস্তুত। ফলে নেট ফেরত আসার পরপরই ওই এক সপ্তাহে হাসিনার লেঠেলবাহিনীর নির্মমতার প্রমাণ আবারও ভেসে উঠতে থাকে নানান দিক দিয়ে।
এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্ঘবদ্ধ করার ক্ষমতা অভাবনীয়। প্রাথমিকভাবে ৬ আগস্টে লংমার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি পালন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৪ আগস্টেও যখন হাসিনা-সরকার হামলা চলমান রাখে ও ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেয়, তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় পরদিনই লংমার্চের ঘোষণা দেয়া হয়। এই একদিনের নোটিসেই পরদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকার রাস্তা দখল নিয়ে নেয়। সোশ্যাল মিডিয়ার আগের যুগে তা ছিল অভাবনীয়। ১৯৬৩ সালে চাকরি ও স্বাধীনতার দাবিতে ওয়াশিংটনে যে মিছিল হয়, তার ব্যবস্থা করতে লেগেছিল ৬ মাসের বেশি সময়, এবং তাতে উপস্থিত হন আড়াই লক্ষ মানুষ।
তবে সোশ্যাল মিডিয়ার সবটাই যে ভালো তাও না। অনেক গুজব ছড়াতে দেখেছি এর মাধ্যমেই। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আন্দোলন হাইজ্যাকের প্রচেষ্টাও দেখেছি। এবং আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সোশ্যাল মিডিয়া মূলত ব্যবহার করে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বর্গের কিশোর-তরুণরা। আমাদের এই আন্দোলনের চিহ্নিত মুখ হয়ে উঠতে যাদের দেখেছি তারাও এই বর্গের। যেমন, শহিদ ফাইয়াজ, কিংবা শহিদ মুগ্ধ। তাতে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু যাত্রাবাড়ির যে শ্রমিক কিংবা রিক্সাচালক ফেসবুক প্রোফাইলে কোনো স্মরণীয় কোটেশন রেখে যান নাই, তার মৃত্যুকে রোম্যান্টিসাইজ করা আমাদের জন্য কঠিন, তার জীবন নিয়ে চর্চার সুযোগও কম। ফলে হয়তো তাদের ত্যাগ যথাযথ মূল্যায়ন পাবে না। এই আন্দোলনকে নির্দিষ্ট এক শ্রেণিগোষ্ঠীর সংগ্রাম বলে ভ্রম হবে। এই সমস্যাকে মোকাবেলা করার পথও খোঁজা দরকার।
সোজা কথায়, এই যুদ্ধ দুই ফ্রন্টিয়ারে চলমান ছিল। অনলাইন ও অফলাইন, দুইখানেই। আওয়ামী লীগ ছিল এক চূড়ান্তভাবে কেন্দ্রীভূত দল। প্রশাসন, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুর গোড়াই ছিল এক জায়গায়। উল্টোদিকে, আমাদের আন্দোলনের স্বভাব ছিল কেন্দ্রহীন। ফলে, ছয় সমন্বয়ককে আটক করে জোরপূর্বক বিবৃতি দিয়েও কোনো লাভ হয় নাই। কারণ তারা এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল না, এই আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রবিন্দুই ছিল না। ইন্টারনেটের স্বভাবও কিছুটা এইরকম, এর কোনো একক কেন্দ্র নাই। ফলে এই আন্দোলনকে আমি দেখি একটা চূড়ান্ত সর্বাত্মকবাদী কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামোকে টেনে আবার জনমুখী করার সংগ্রাম হিসেবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের যাত্রা চলমান থাকুক, আমাদের যাবতীয় অসন্তোষ ও তা প্রকাশের অধিকার আর কোনোদিন খর্বিত না হোক।



পাঠকের মন্তব্য