একজন আধুনিক মানুষ হবার পূর্ব শর্ত হচ্ছে সাম্যচিন্তা। উপনিবেশ পরবর্তী সময়ে পশ্চিমের দেশগুলো সভ্যতার কেন্দ্রে রয়েছে অতীতের ভুল ভ্রান্তি থেকে শিক্ষালাভ করে সাম্যচিন্তাকে সবার ওপরে জায়গা দিতে পারার কারণে। সম্পদের সাম্য সম্ভব না হলেও মানসিক সাম্য অর্জনই সভ্যতার সূচক।আজকের দক্ষিণ এশিয়া হিন্দু ধর্মীয় কাস্ট সিস্টেম-এর অস্থিধারণ করে বেড়ে ওঠায় সমাজ মননে উচ্চ বর্গ হবার আকাংক্ষায় বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান সমাজ আজও বড্ড সেকেলে সমাজ হয়ে রয়ে গেছে।
জুলাই বিপ্লবের আকাংক্ষা ছিলো বৈষম্যমুক্ত সমাজ। সেখান থেকে প্রত্যাশা করা গিয়েছিলো; সম্পদের সাম্য অর্জন করতে সময় লাগলেও মানসিক সাম্যটি হয়তো আমরা অর্জন করতে পারব। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী সময়ে আবারও সেই বর্গ ভাগ করে বনেদি সাজার দৌড় শুরু হয়।
বিশ্বসাহিত্যে স্কুলিং হওয়ায়; বাংলাদেশের প্রগতিশীল বর্গ ও ধর্মীয় বর্গ বিকাশের ছবিটি নৈর্ব্যক্তিকভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রগতিশীল বর্গটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। আর ধর্মীয় বর্গটি সৌদি আরবের আশরাফিয়া থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। ফলে প্রগতিশীল বর্গের জীবন চর্যা ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ আর ধর্মীয় বর্গের জীবন চর্যা সৌদি ইসলামপন্থা থেকে কালচার শেখার চেষ্টা করেছে। ইংরেজি শিক্ষার দুর্বলতার কারণে গ্লোবাল কালচার সম্পর্কে তাদের জানাশোনা অত্যন্ত সীমিত।
বাংলাদেশ আয়তনে ক্ষুদ্র একটি দেশ। ফলে এখানে বেশিরভাগ মানুষকে চেনা জানার সুযোগ রয়েছে। জীবন একটাই; সেটাকে উপভোগ না করে; বনেদি হবার ইঁদুর দৌড়ে অর্থহীন জীবন যাপন করতে দেখেছি অনেককে।
শামসুর রাহমানের 'ঐকান্তিক শ্রেণীহীন' কবিতাটি খুব অল্পবয়সে প্রভাবিত করায় আর বিশ্বসাহিত্যে 'সাম্যচিন্তা'-র সমাজের খোঁজ পাওয়ায়; বাঙ্গালিয়ানার এই বনেদিয়ানার কষ্টকল্পিত দৌড়টি বুঝতে বেশ কষ্ট হয়েছে। তবে ইংরেজি সাহিত্যে শিল্প বিপ্লবোত্তর নতুন ধনী বা ফিলিস্টাইন্সদের আচার আচরণ দেখে; বাংলাদেশের দুর্নীতি বসন্তে নতুন ধনীদের আচার আচরণ বুঝতে খুব সহজ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আর্থিক অসচ্ছলতার মাঝে হিমশিম খাওয়া ছেলে-মেয়েরা জীবনে একটু প্রতিষ্ঠা পেয়েই কালক্রমে ফেসবুকের বনেদি প্রগতিশীলতার শিক্ষক হয়ে ওঠে।
ইউরোপের সমাজের ছেলেমেয়েরা ছাত্রজীবনে কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালায়। কিন্তু এই স্ট্রাগলকে তারা উপভোগ করে। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর তাদের মধ্যে বনেদি সাজার চেষ্টা দেখা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে ছাত্রজীবনে স্টাগল করা ছেলেমেয়েরা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য করে তোলে বনেদিয়ানাকে।
ইউরোপের ছেলেমেয়েরা রেনেসাঁ ও এনলাইটেনমেন্টের সময়ের কত লেখকের বই পড়ে; কত পেইন্টিং ও ভাস্কর্য দেখে, কত সংগীত ও চলচ্চিত্র উপভোগ করে। কিন্তু এই অর্জিত জ্ঞানের কোনো অহংকার তৈরি হয় না তাদের মাঝে। তারা নিজেদের কখনো লিবেরেল দাবি করে না; অন্যদের এটা-সেটা বলে তকমা দেয় না। অথচ বাংলাদেশে দুটি বই, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র, সংগীত উপভোগ করে লোকজন গম্ভীর বনেদি হয়ে পড়ে। অন্যকে তুচ্ছ করে।
ইউরোপের একটা ছেলে বেতোফেন শুনে নিজেকে বেতোফেন পরিবারের লোক ভাবে না। কিন্তু বাংলাদেশে একটা ছেলে রবীন্দ্র সংগীত শুনে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সদস্য হয়ে পড়ে। খ্রিস্টোফার নোলানের মুভি দেখে ছবি যাই বুঝুক; ফেসবুকে নোলান নোলান জপ করে নিজেকে ডিফরেন্ট বা অন্যদের চেয়ে আলাদা প্রমাণের চেষ্টা করে।
আধুনিক সমাজে সবার মাঝে একজন বা অন্যতম হয়ে বাঁচার যে চর্চা বাংলাদেশে তা পাওয়া যায় না। এখানে প্রথম আলো, সফল যারা কেমন তারা ফিচার করে সাফল্যের ইঁদুর দৌড় লাগিয়ে দেয়া হয়। প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাতা অত্যন্ত স্ট্রাগল করে মিডিয়া হাউজটিকে 'জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি'-র আদলে গড়ে তোলায়; সে বেঙ্গল রেনেসাঁ টু পয়েন্ট ও'-র ডিরোজিও হয়ে উঠতে শুরু করে।
জুলাই বিপ্লবের পরে প্রথম আলো জুলাই বিপ্লবীদের মধ্যে বিশুদ্ধ বাঙ্গালিয়ানা খুঁজে কিছু চরিত্রকে বনেদি হিসেবে তৈরি করার ভাস্কর্য শিল্পী হয়ে ওঠে। স্কুলে কোন গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এলে প্রধান শিক্ষক যেরকম অপেক্ষাকৃত ফর্সা শিশু বের করে তাকে দিয়ে ফুল দেওয়ায়; প্রথম আলোর জুলাই বিপ্লবী সিলেকশন অনেকটা সেরকম। যাদের গায়ের রঙ ফর্সা নয়; তাদের মুখের ভাষাতে কলকাতার বেঙ্গল রেনেসাঁর অভিধানের শব্দ থাকলে; তাদের আগামীর বিশিষ্ট ব্যক্তির মূর্তি করে গড়ে তোলা হয়।
সারা বাংলাদেশের সম্পন্ন মানুষেরা ভাগ্যান্বেষণে ঢাকা শহরে ভেসে আসেনি। অপেক্ষাকৃত স্ট্রাগলিং ক্লাসটি ঢাকা শহরে এসেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সূত্র ধরে বাড়ি ও জমি দখল করে একদল লোক 'বনেদি' সেজেছে। সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কালে বৃটিশের পিয়ন, অর্ডারলি, সেরেস্তাদার, মুন্সী যেমন রাতারাতি বনেদি জমিদার হয়ে ওঠে; পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে একই শ্রেণীর লোক ক্ষমতা কাঠামোর দালালি করে রাতারাতি বনেদি সেজে বসে।
প্রথম প্রজন্মটি বনেদিয়ানার অভিনয়টি পাকাপোক্তভাবে করতে পারে না বলে দ্বিতীয় প্রজন্মটি একটু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, ক-খানা ইংরেজি বই পড়ে, রবীন্দ্র সংগীত শুনে বিরাট বনেদি প্রগতিশীল হিসেবে শাহবাগ টু শহীদ মিনারে মার্চ পাস্ট করে ঘুরতে থাকে।
কিছু লোক সরকারি চাকরি জোগাড় করে। যারা ঘুষ খেতে পারে তারা সরকারি প্লট নিয়ে প্রাসাদ বানিয়ে জমিদার সেজে বসে পড়ে; আর যারা ছোট সরকারি কোয়ার্টারে থাকে; তাদের ছেলে-মেয়ে অহংকার প্রকাশ দিয়ে আর্থিক দৈন্য ঘুঁচাতে চেষ্টা করে। একটু ছায়ানটে গান শিখে, একটু সুবর্ণা মুস্তাফার মতো চোখ পাকিয়ে ছ-এর ওপর চাপ দিয়ে বাংলা বলে, গ্রাম থেকে আসা মেধাবী স্বামীটিকে আধুনিকতা শিক্ষা দেয়। আর ফেসবুকে দিনমান শেখাতে থাকে কিভাবে আধুনিক ও প্রগতিশীল হতে হবে।
এত কিছু করার পরেও যখন বনেদি হিসেবে অবস্থানটা পাকাপোক্ত হয় না; তখন তারা অন্যকে তকমা দিয়ে ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বনেদি হিসেবে গেঁড়ে বসতে চায়। অন্যকে তুচ্ছ করার ভাষাটা আগে ছিলো, ক্ষ্যাত। নিজেরা ভূমিহীন, ঢাকায় এসে এক টুকরো জমি বা এপার্টমেন্ট জুটেছে। ফলে ভূমিতে কৃষিকাজ করা মানুষকে তুচ্ছ করলেই তারা আধুনিক হয়ে ওঠে। এই ধারণাটি বৃটিশ উপনিবেশের। ইংল্যান্ডের বেকার হয়ে ঘোরা লোকজন কলোনিতে চাকরি নিয়ে গিয়ে, নেটিভদের কৃষক বলে গালি দিতো তারা।
নব্বুই দশকের শুরু থেকে ইন্ডিয়ার ছায়া উপনিবেশ 'আজকের কাগজ' ও অন্যান্য কথিত 'সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট'-এর মাধ্যমে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েদের বনেদি হবার ট্রেনিং দেয়। বনেদি হতে গেলে পুজো আর্চায় অংশ নিতে হবে, কিন্তু নামাজ পড়া যাবে না। সুতরাং 'অসাম্প্রদায়িক চেতনা'-র পালোয়ান হতে গেলে মুসলমানদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে হবে। চারুকলায় গিয়ে দীপাবলির রঙ মাখা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ব্লকে গিয়ে অসংখ্য পুজো মণ্ডপ সাজিয়ে আরতি দেয়া সেকুলার কালচার, কিন্তু কারো মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি থাকলে; সে জঙ্গি; এই ভারতীয় শিক্ষাটাই বাংলাদেশের বনেদি প্রগতিশীলতা।
ইন্ডিয়ান আর্মির প্রতিটি অনুশীলনে হিন্দু ধর্মের ব্যবহার; অপারেশন সিন্দুরে সে হেলিকপ্টার থেকে বালতি বালতি সিঁদুর ছিটিয়েছে, এমনকি মহাকাশ অভিযান শুরু হয় পুজো দিয়ে ও নারকেল ভেঙ্গে। আর বাংলাদেশে সেনা প্রধান হজ্জ্বের পর দাড়ি রাখায়; ইন্ডিয়ান মিডিয়ায় রব উঠলো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইসলামিক হয়ে গেলো গো।
বাংলাদেশে প্রগতিশীল বাম নেতা হিসেবে ফ্যাসিস্ট আমলে বাপ্পাদিত্য বসু; দেশের মানুষকে ধমক দিয়ে প্রগতিশীলতা শিখিয়ে; জুলাই বিপ্লবের পরে ভারতে পালিয়ে গিয়ে হিন্দুত্ববাদী বজরঙ্গি দলে যোগ দিয়ে ফেসবুকে গর্ব প্রকাশ করেছে। এরকম বক-প্রগতিশীলেরাই জুলাই বিপ্লবী তরুণীর রক্তাক্ত মুখমণ্ডলকে 'সস' লাগানো নাটক বলে প্রচার করে।
এই যে হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীলতার বনেদিয়ানা; এর প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে ইসলামপন্থার বনেদিয়ানা শিক্ষার আসর। এরা খিলাফতের অটোমান সেজে ঘুরছে। সৌদি শেখের মতো সেজে দিনমান ইসলামি চেতনা শিক্ষা দিচ্ছে ফেসবুকে। যার বাবা একজন ধর্মপ্রাণ শান্তি প্রিয় মানুষ ছিলেন; তার ছেলেটি ইসলামের ম্যানেজার হিসেবে নব্বুই শতাংশ মুসলমানের দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে। সে নারীদের পোশাক পুলিশ হিসেবে ফেসবুকের পোস্টে পোস্টে জ্ঞান দিয়ে বেড়াচ্ছে। ইরানের ওপর এমেরিকা ও ইজরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে ইরানকে সমর্থন করলে তাদের 'অমুসলিম' ঘোষণা করছে।
যে মেয়েটির মা শাড়ি কিংবা সালোয়ার কামিজ পরতেন; সে সেসব পোশাককে ইসলাম সম্মত নয় ঘোষণা করে; প্রাচীনকালের ইহুদি নারীদের বসন হিজাব পরে; জাতীয় পরিচয় পত্রের জন্য ছবি তুলতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আরব বিশ্বে বিশেষত সৌদি আরবে নারীর পোশাক চয়নের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষা, চাকুরি, গাড়ি চালনা, চলচ্চিত্র নির্মাণ এমনকি মহাশূন্য অভিযানে সৌদি নারীরা সাফল্য প্রদর্শন করছে। ইরানে 'নারীর পোশাক' নিয়ে রাষ্ট্রীয় পুলিশিতে নারী মৃত্যুর পরে পোশাক চয়নের স্বাধীনতা ফিরে এসেছে। আর বাংলাদেশে সৌদি আরব ও ইরানের চেয়ে বড় বড় সব পোশাক পুলিশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীলতা আর ইসলামপন্থী ধর্মশীলতার অন্যকে তুচ্ছ করার ভঙ্গিটি দেখলে আপনি ঠিকই বুঝতে পারবেন; এরা আসলে আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগা লোকজন। হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীলেরা কাউকে হত্যাযোগ্য করে তুলতে তাকে স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গি তকমা দিয়ে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিতে চায়। আর ইসলামপন্থী ধর্মশীলতা কাউকে হত্যাযোগ্য করে তুলতে তাকে নাস্তিক তকমা দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দিতে চায়। এই উভয় সামাজিক গোষ্ঠী ভূমিহীন ছিলো। নানান ধান্দা করে এক টুকরো জমি ও এপার্টমেন্টের মালিক হয়ে নিজেকে দেশের মালিক ঠাউরাচ্ছে।বনেদি হবার ও প্রাধান্য বিস্তারের চেষ্টা না করে; এই লোকগুলোর সবার মাঝে অন্যতম হয়ে জীবন যাপন করা শেখা জরুরি। ভেতরের ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স ঝেড়ে ফেললেই সুপিরিয়র সাজার কৌতুকপ্রদ ইচ্ছাগুলো আর জাগবে না। বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়টিই যথেষ্ট। এখানে হিন্দু-মুসলমান, ডান-বাম, বনেদি-অবনেদি এসব খেলনা বিভাজন করে লাভ নেই।



পাঠকের মন্তব্য