মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল যেন।
কেউ যদি বলেন, শহীদুল জহির একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক; তাঁর গল্প বলার নিজস্ব ঢং আছে; জাদুবাস্তব বর্ণনায় চেনাজগতকে রহস্যময় করে তোলার মুন্সিয়ানা তাঁকে অন্যান্য গল্পবলিয়ে থেকে আলাদা করেছে; তাহলে ওই আলোচনা কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুটিয়ে যাবে।
কিন্তু কেউ যদি ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বলে থাকেন, শহীদুল জহির তৃতীয় শ্রেণির লেখক; তাহলে ওই মন্তব্যের অভিঘাতে দুই বছর পরে সেই মন্তব্য খুঁজে বের করে ২৪ ঘণ্টা ধরে জহির-বন্দনা ও ওই মন্তব্যকারীর ব্যাশিং করা যায়।
দুই বছর আগে করা সলিমুল্লাহ খানের মন্তব্য গতকাল কেন ব্যাশিংয়ের বিষয় হলো?
কারণ, দুই বছর আগে জুলাই বিপ্লবের সময় সলিমুল্লাহ খান ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। ফলে তাঁকে তো ব্যাশিং করতেই হবে।
তারও আগে প্রায় দেড় দশক ধরে দিল্লি হিস্ট্রি বুক বোর্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের সিলেবাস প্রণয়ন করেছিল। ওই সিলেবাস অনুযায়ী ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আর ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আলোচনা করা যেত। ৫২-এর আগেও যাওয়া যাবে না, ৭১-এর পরেও আসা যাবে না, হিস্ট্রি গুরুরা এভাবেই ঠিক করে দিয়েছিলেন।
সলিমুল্লাহ খান ওই সিলেবাসের বাইরের বিষয় পড়াতে শুরু করেছিলেন। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের বাধা, এভাবে বেঙ্গল রেনেসাঁর হেজিমনিগুলো স্পষ্ট হয় অধ্যাপক খানের আলোচনা থেকে। হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার ও শোষণের মুখে কৃষক বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে কীভাবে সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা জারিত হলো পূর্ববঙ্গের জনমানুষের মাঝে, তা নতুন প্রজন্ম জানতে পেরেছে সলিমুল্লাহ খানের নানা বক্তৃতা থেকে। ইউটিউবে এই ইতিহাসের ক্লাস সত্যানুসন্ধানী নতুন প্রজন্মকে তাদের অস্তিত্বের শেকড়ে পৌঁছে দিয়েছে। ফলে জুলাই বিপ্লবীদের বিপ্লব-প্রস্তুতি পর্বে সলিমুল্লাহ খানের ইতিহাসচর্চা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে বলে আমার ধারণা।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান সব সময় ইতিহাসের সঠিক দিকে অবস্থান করেছেন। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায়বিচার চেয়েছেন। পরে ওই বিচার যে কেবলই আওয়ামী লীগের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কৌশলে পরিণত হয়েছিল, তা টের পেয়ে আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী অপরাধেরও সমালোচনা করেছেন। ফলে একাত্তর ও চব্বিশের দুটি মানবতাবিরোধী অপরাধের সমর্থক, এই বিপ্রতীপ দুই পক্ষই সুযোগ পেলে সলিমুল্লাহ খানকে ব্যাশিং করতে নেমে আসে।
সলিমুল্লাহ খানকে বাংলাদেশের গড়পড়তা বুদ্ধিজীবীদের ছাঁচে ফেলতে না পেরেই মিডিওকার কালচারাল উইং তাঁর শত্রু হয়ে গেছে। ফেসবুকে তাঁর পোস্টের নিচের মন্তব্যে আওয়ামী লীগ ও হিন্দুত্ববাদী সমর্থকদের তিক্ত উপস্থিতি মি. খানের প্রতি তাদের এই জাত-ক্রোধ স্পষ্ট করে। মাঝে মাঝে ইসলামপন্থীরাও থাকে সেখানে।
জুলাই বিপ্লবে যে বুদ্ধিজীবী হাসিনার ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, তাঁকে সুযোগ পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাশিং করবে গেরুয়া প্রগতিশীলেরা, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
সলিমুল্লাহ খান চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে শুরু করার পর থেকেই, ১৯৫৩ সালে জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটার পর যে জমিদারেরা কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের কর্মচারীদের ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে জমিদারি কালচারের প্রতিভূ হয়ে বিরাজ করছে, তারা বড্ড চটে যায় মি. খানের ওপর। তারাই নকশি পাঞ্জাবি ও নকশি শাড়ি কুঁচি দিয়ে পরে; শিল্প-সাহিত্য-দর্শন ঘষামাজা করে সমাজের দুই ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের ফিতায় পরিণত হয়েছে। তাদের একমাত্র কাজ দুই ইঞ্চি চিন্তার গজফিতা দিয়ে মেপে সার্টিফিকেট দেওয়া, কে প্রগতিশীল, কে অপ্রগতিশীল। এই ফোঁপর দালালিটা 'অখণ্ড ভারত'-এর স্বপ্নের সারথি খুঁজতে খুব কাজে দেয়।
ইউরোপের লিটারারি ক্যাফেগুলোতে ধ্রুপদি লেখকদের নাকচ করে দিয়ে নানা সাহিত্য-আড্ডা হয়। কিন্তু শেক্সপিয়ারকে নাকচ করে দিলে, তাঁর খাদেম না থাকায়, ওই আলোচনা আর বেশি দূর এগোয় না। বোদলেয়ারকে 'বদ' বললে হাসি-ঠাট্টাতেই তার অবসান ঘটে। অন্তত তিনটি প্রজন্ম শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় ধর্মীয় আঙ্গিকে কোনো সাহিত্যিককে দেবতা বানিয়ে পূজা দেওয়ার চল সেখানে নেই। আমাদের ঢাকা আর ওপাড়ার কলকাতা ছাড়া এই 'লেখক' অনুভূতি (সেন্টিমেন্ট) পৃথিবীর আর কোনো সমাজেই দৃশ্যমান নয়। শত চেষ্টাতেও মেট্রোপলিটন মন গড়ে না ওঠায়, যাত্রাপালার নট-নটীর মতো মেলোড্রামাটিক রয়ে যাওয়া হয়তো আমাদের নিয়তি।
যে কোনো লেখকের একমাত্র শক্তির জায়গা তাঁর কনটেন্ট ও টেক্সট। শক্তিশালী কনটেন্ট ও টেক্সট যার, তাঁর লেখা ধ্রুপদি হবেই। সাহিত্যে সিন্ডিকেট করে, বন্ধু লেখকদের সৃজনশীল ও মননশীল লেখকের উত্তরীয় পরিয়ে পরিচিত ছোট্ট বৃত্তটিতে কয়েক দিন পিঠ চুলকানির আসর করা যায়। কিন্তু নতুন প্রজন্মের পাঠক এইসব সিন্ডিকেটের বিজ্ঞাপন দেখে অপাঠ্য সাহিত্যের এক প্যারাই পড়ে বুঝে যায়, সদরঘাটের মাজন বিক্রেতা হেকিমি মাজনের নামে কয়লার গুঁড়া গছিয়ে দিয়েছে।
যে শহীদুল জহির বিস্মৃতির বুকশেলফে ঘুমিয়েছিলেন, সলিমুল্লাহ খানের ঠোঁটকাটা সমালোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন পাঠক সেই জহিরকে ঘুম থেকে তুলে তাঁর গল্প শুনতে শুরু করেছে। জন্ম বা মৃত্যুদিবসে সাহিত্য পাতায় সাহিত্যের কবিরাজদের ক্যানভাস শুনে এত পাঠক শহীদুল জহিরের কাছে আসত না, এতটুকু বলাই বাহুল্য।



পাঠকের মন্তব্য