১
১৯৫৮ সালের ২৯শে আগস্ট। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি নামের একটা ছোট্ট শহরে আমার জন্ম। চারপাশটা ছিল বড্ড ধূসর, লোহা আর কয়লার ধোঁয়ায় ঢাকা। তখনকার আমেরিকার অবস্থা কিন্তু এখনকার মতো ছিল না। দেশে তখন বর্ণবাদের তীব্র বিষ। কৃষ্ণাঙ্গদের সমান অধিকারের জন্য চারদিকে সিভিল রাইটস মুভমেন্ট বা নাগরিক অধিকারের আন্দোলন চলছে। কৃষ্ণাঙ্গ একটা সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়ে এই বৈরী পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লড়াইটা কেমন হতে পারে, তা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারেন।
আমাদের পরিবারটা ছিল অনেক বড়। বাবা জোসেফ জ্যাকসন আর মা ক্যাথরিন জ্যাকসন। ছোট্ট একটা দু-কামরার ঘরে আমরা গাদাগাদি করে নয়-দশজন ভাইবোন থাকতাম। বাবা লোহা গলানোর কারখানায় ক্রেন অপারেটরের কাজ করতেন। দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অবস্থা, অভাব ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
আমার বেড়ে ওঠাটা আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না। খুব ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতরের সুরটাকে মা টের পেয়েছিলেন। আমাদের ঘরে একটা ভাঙা গিটার আর পুরোনো পিয়ানো ছিল। মা একা একা ক্ল্যারিনেট আর পিয়ানো বাজাতেন, আর আমাদের গুনগুন করে গান শোনাতেন। বাবার একটা ব্যান্ড দল ছিল, কিন্তু সেটা চলেনি। একদিন বড় ভাইরা বাবার লুকিয়ে রাখা সেই গিটারটা বের করে বাজাচ্ছিল, বাবা দেখে ফেললেন। রেগে গেলেও তিনি বুঝতে পারলেন, ছেলেদের মধ্যে সুরের একটা দারুণ ক্ষমতা আছে। ব্যস, ভাইদের নিয়ে তৈরি হলো ‘জ্যাকসন ব্রাদার্স’ ব্যান্ড।
তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ কি ছয়। একদিন মা বাবাকে ডেকে বললেন, ছোট ছেলেটার গলাটা একবার শুনে দেখো।
আমি যখন মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে গাইলাম, বাবার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই ছোট ছেলেটার গলায় এক অদ্ভুত জাদু আছে। আমাকে সোজা বানিয়ে দেওয়া হলো ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার, আর ব্যান্ডের নাম বদলে রাখা হলো জ্যাকসন ৫।
কিন্তু এই মিউজিকের দুনিয়ায় পা রাখাটা কোনো রূপকথা ছিল না। সেটা ছিল একটা কঠিন খাঁচা।
অন্য ছেলেরা যখন স্কুল শেষে মাঠে ধুলো মাখত, ঘুড়ি ওড়াত, লুকোচুরি খেলত, আমি তখন একটা বদ্ধ ঘরে বন্দি। বাবা ঘরের এক কোণায় একটা চামড়ার বেল্ট বা চাবুক হাতে নিয়ে বসে থাকতেন। আমাদের একটাই কাজ ছিল; টানা কয়েক ঘণ্টা গান গাওয়া আর নাচের নিখুঁত স্টেপ মেলানো। একটু ভুল হয়েছে কি বাবার হাতের সেই চাবুক সপাটে এসে পড়ত পিঠে। ভয়ে আমার বুক কাঁপত, কোনো কোনো দিন মারের চোটে আমি বমি করে ফেলতাম, কিন্তু রিহার্সাল থামানোর কোনো উপায় ছিলনা। আমার শৈশবটা ওই চার দেয়ালে, বাবার মারের ভয়ে আর কান্নার ভেতরেই হারিয়ে গেল।
তবে কঠোর এই অত্যাচার আমাদের রোবটের মতো নিখুঁত বানিয়ে দিয়েছিল। আমরা স্থানীয় ছোটখাটো ক্লাব, ট্যালেন্ট শো আর প্রতিযোগিতায় একের পর এক পুরস্কার জিততে লাগলাম। ১৯৬৭ সালের এক রাতে নিউইয়র্কের বিখ্যাত অ্যাপোলো থিয়েটারে যখন আমরা পারফর্ম করলাম, পুরো হলরুম ফেটে পড়ল করতালিতে। বড় বড় রেকর্ড কোম্পানির নজর পড়ল আমাদের দিকে।
আর তার পরের বছরই, ১৯৬৮ সালে, আমাদের জীবনে এলো সেই বড় সুযোগ। মোটন রেকর্ডসের মালিক বেরি গর্ডি আমাদের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে চুক্তির কাগজে সই করালেন। গ্যারির সেই অন্ধকার, লোহার শহর ছেড়ে আমরা পা রাখলাম ক্যালিফোর্নিয়ার ঝলমলে আলোয়। জাদুকরী এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হলো, যার পেছনে জমে ছিল একটা পাঁচ বছরের শিশুর চোখের জল আর রক্ত।
২
ক্যালিফোর্নিয়ার আলোটা বড্ড বেশি ঝকঝকে ছিল। গ্যারির সেই কয়লা-ধোঁয়া আর লোহার গন্ধের পর এই নতুন শহরটাকে মনে হতো স্বপ্নের মতো। ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে মোটন রেকর্ডস থেকে আমাদের প্রথম গান বেরোলো, I Want You Back!
এক সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলাম, গানটা বিলবোর্ড চার্টের এক নম্বরে উঠে গেছে। রেডিও খুললেই আমার এগারো বছর বয়সের সেই অবুঝ গলাটা ভেসে আসত। এরপর একে একে ABC, The Love You Save, I'll Be There, পরপর চারটে গান আমেরিকার এক নম্বর সিংহাসনে বসল। খবরের কাগজগুলো হইচই শুরু করে দিল। তারা লিখল, মিউজিকের ইতিহাসে এর আগে কোনো ব্যান্ডের প্রথম চারটে গানই এভাবে এক নম্বরে বসেনি।
চারিদিকে তখন আমাদের বড় বড় আফ্রো চুল, রঙিন জমকালো পোশাক আর এনার্জেটিক নাচের তুমুল ক্রেজ। আমরা তখন যেখানেই যেতাম, হাজার হাজার মানুষ আমাদের একনজর দেখার জন্য পাগল হয়ে যেত। এড সুলিভান শোর মতো বড় বড় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমরা পারফর্ম করছি। মানুষ ভাবত, এই ছোট ছেলেটা কত সুখী, কত রঙিন তার জীবন!
can you imagine? সেই আকাশছোঁয়া সাফল্যের মাঝেও ভেতরের গল্পটা তো অন্যরকম ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় এসেও বাবার সেই কড়া শাসন আর নিয়মের বেড়াজাল একটুও কমেনি। আমরা তখনো রোবটের মতোই খাটতাম। হোটেলের বিলাসবহুল ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি যখন নিচে সমবয়সী ছেলেদের দেখতাম রাস্তায় সাধারণ একটা বল নিয়ে খেলছে, আমার বুকটা কেমন যেন হাহাকার করে ultralight গতিতে কেঁপে উঠত। আমি চাইলেও নিচে নেমে ওদের সাথে যোগ দিতে পারতাম না। আমার কোনো বন্ধু ছিল না, ছিল না কোনো নিজস্ব আকাশ।
এই করতে করতে আশির দশকের মাঝামাঝি চলে এলো। আমার বয়স তখন সতেরো-আঠারো। ব্যান্ডের ওই চেনা সুর আর আমাদের মধ্যকার বাঁধনটা কেমন যেন আলগা হতে শুরু করল। মোটাউন রেকর্ডসের সাথে কিছু বিষয়ে বনিবনা হচ্ছিল না, তাই আমরা চুক্তি বদলে চলে এলাম এপিক রেকর্ডসে। ব্যান্ডের নাম বদলে রাখা হলো The Jacksons। জারমেইন মোটাউনেই থেকে গেল, তার জায়গায় আমাদের সাথে যোগ দিল ছোট ভাই র্যান্ডি।
এখানে এসে আমরা নিজেদের মতো করে মিউজিক তৈরি করার কিছুটা স্বাধীনতা পেলাম। Shake Your Body-র মতো কিছু হিট গানও দিলাম। কিন্তু আমার ভেতরের তৃষ্ণাটা শুধু একটা ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার হয়ে থাকায় মিটছিল না। আমি বুঝতে পারছিলাম, দল বেঁধে অনেক দূর যাওয়া যায়, কিন্তু নিজের ডানার পুরো শক্তিটা চেনা যায় না। আমার মাথার ভেতর তখন অন্যরকম কিছু সুর খেলা করত, যা ভাইদের সাউন্ডের সাথে মিলত না।
ঠিক তখনই, ১৯৭৮ সালে The Wiz সিনেমার সেটে আমার দেখা হলো কুইন্সি জোন্সের সাথে। তিনি আমার ভেতরের সেই ছটফটানিটা ধরতে পেরেছিলেন। আমি তাকে বললাম, আমি একটা সোলো অ্যালবাম করতে চাই, এমন কিছু যা মানুষকে স্তব্ধ করে দেবে।
তিনি হাসলেন এবং বললেন, চলো, শুরু করা যাক।
১৯৭৯ সালে কুইন্সির প্রযোজনায় বেরোলো আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথম সোলো অ্যালবাম, Off the Wall।
Don’t Stop ,Til You Get Enough আর Rock with You গানগুলো দিয়ে পুরো দুনিয়া প্রথম দেখল দলছুট এক যুবকের ভেতরের আসল আগুনটা। একা একাই আমি চারটে গান টপ-টেনে নিয়ে এলাম।
কিন্তু আমার ভেতরের সেই একাকী বালকটি তখনো জানত না, এই সোলো ক্যারিয়ারের হাত ধরেই সে এমন এক ইতিহাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা তাকে যেমন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজা বানাবে, ঠিক তেমনি কেড়ে নেবে তার শেষ শান্তিটুকুও।
৩
Off the Wall দিয়ে দুনিয়া আমাকে চিনেছিল ঠিকই, কিন্তু আমার ভেতরের জেদটা ছিল আরও উঁচুতে। আমি এমন একটা কিছু করতে চাইছিলাম, যা এই পৃথিবীর সুর আর দৃশ্যের পুরো মানচিত্রটাই চিরকালের জন্য ওলটপালট করে দেবে। দিন-রাত এক করে আমরা স্টুডিওতে পড়ে থাকলাম। সুর, তাল আর ছন্দের এমন এক রসায়ন তৈরি হচ্ছিল, যা কখনো কখনো আমাদের নিজেদেরই শিহরিত করত।
১৯৮২ সালের শেষের দিকে বাজারে এলো সেই অধ্যায়, Thriller।
বাকিটা একটা ইতিহাস, যা আজও জীবন্ত। Billie Jean, Beat It, কিংবা Thriller গানগুলো যখন রেডিও-টেলিভিশনে বাজতে শুরু করল, পুরো পৃথিবীটা যেন একটা ঘোরলাগা জাদুতে স্তব্ধ হয়ে গেল। আমি শুধু গান গাইতে চাইনি, আমি মিউজিক ভিডিওর ধারণাকে বদলে দিয়ে বানালাম এক একটা শর্ট ফিল্ম। চৌদ্দ মিনিটের সেই জম্বিদের নাচ আর কুয়াশাঘেরা রাস্তার দৃশ্য দেখে মানুষ টিভির পর্দার সামনে থেকে নড়তে পারত না। আমেরিকার টেলিভিশন চ্যানেলগুলো, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের গান সহজে চালানো হতো না, তারা বাধ্য হলো আমার জন্য তাদের দরজা খুলে দিতে। এক রাতে আট-আটটা গ্র্যামি পুরস্কার যখন আমার হাতে, চারদিকে হাজার হাজার মানুষের করতালি। আমি হাসছিলাম, কিন্তু সেই smiles-এর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অন্তহীন একাকীত্ব।
ঠিক সেই সময়েই, ১৯৮৩ সালের এক লাইভ অনুষ্ঠানে দুনিয়া প্রথম দেখল আমার পায়ের সেই অদ্ভুত জাদু।
Billie Jean গানের মাঝপথে আমি মাথায় কালো হ্যাটটা চেপে ধরলাম। তারপর হঠাৎ করেই সামনের দিকে না হেঁটে পেছনের দিকে পিছলে যেতে লাগলাম। শরীরটা সামনে ঝুঁকছে, অথচ পা দুটো মাটির ওপর দিয়ে মসৃণভাবে পেছনের দিকে ভেসে যাচ্ছে—ঠিক যেন বরফের ওপর দিয়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো হলের মানুষ চিৎকার করে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকে ওটার নাম দিল মুনওয়াক। কিন্তু তারা তো জানত না, এই মসৃণ পিছলে যাওয়ার পেছনে লুকিয়ে ছিল আমার শৈশবের সেই চাবুকের দাগ আর পায়ের পাতার তীব্র যন্ত্রণা। মঞ্চে আমি যখন ওটা করতাম, মনে হতো আমি এই পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো এক গ্রহে চলে গেছি।
এর পরপরই শুরু হলো আমার ফ্যাশনের এক অদ্ভুত সুনামি। আমার ডিজাইনারদের ডেকে বলেছিলাম, এমন প্যান্ট বানাও, যা নাচের সময় পায়ে আটকে থাকবে না, অথচ আমার ফুটওয়ার্ক যেন স্পষ্ট দেখা যায়।
তারা আমার জন্য তৈরি করল গোড়ালির একটু ওপর পর্যন্ত কাটা বিশেষ কালো টেপার্ড প্যান্ট। সাথে ঝকঝকে সাদা মোজা আর কালো লোফার জুতো। যখনই আমি মঞ্চের আলোর নিচে এসে প্যান্টের দুই পাশ আলতো করে টেনে ধরতাম, দর্শকদের চোখ সরাসরি চলে যেত আমার পায়ের জাদুকরি কাজের দিকে। আমার সেই প্লিটেড প্যান্ট, জিপার আর বাকল লাগানো লেদার জ্যাকেট আর এক হাতের সেই রুপোলি গ্লাভস তখন দুনিয়ার কোটি কোটি তরুণের গায়ের পোশাক হয়ে উঠল।
সুদূর এশিয়ার কোনো এক দেশের গলির ছেলেরাও তখন আমার মতো করে সেই ক্রপড প্যান্ট আর সাদা মোজা গলিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করত। তারা প্যান্টটা সামান্য উঁচু করে ধরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুনওয়াক শেখার চেষ্টা করত।
বাইরে তখন আমার নামের জয়ধ্বনি, কোটি কোটি মানুষের উন্মাদনা। কিন্তু ঠিক এই আলোর ঝলকানির সমান্তরালেই আমার শরীরের ভেতর এক নীরব অন্ধকার দানা বাঁধছিল। আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখতাম, আমার চেনা শ্যামল চামড়ার ওপর কে যেন জোর করে সাদা রঙের ছোপ ছোপ দাগ বসিয়ে দিচ্ছে। এক অদ্ভুত রোগ, যার নাম ভিটিলিগো। মানুষ যখন আমার ফ্যাশন আর নাচ নিয়ে মাতোয়ারা, আমি তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বদলে যাওয়া রূপ দেখে আঁতকে উঠছিলাম।
৪
মানুষ ভাঙা কাচ জোড়া লাগাতে পারে, কিন্তু ভাঙা শৈশব কিংবা শরীরের ভেতরের যুদ্ধটা সহজে জোড়া লাগে না।
নব্বইয়ের দশকে যখন নতুন নতুন অ্যালবামের জোয়ারে পুরো দুনিয়া কাঁপছে, ঠিক তখনই আমার শরীরের ভেতরের সেই রোগটা তীব্র হয়ে উঠল। আমার চেনা চামড়ার রঙটা প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছিল। মানুষ খবরের কাগজে বড় বড় অক্ষরে লিখল, আমি নাকি আমার অতীত আর জাতকে অস্বীকার করার জন্য ত্বক ব্লিচ করছি। বুক ফেটে কান্না আসত আমার। যে মানুষটা মনে-প্রাণে নিজের কৃষ্ণাঙ্গ অতীতকে ভালোবাসে, তাকেই কিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেকআপের নিচে সেই সাদা ছোপগুলো লুকাতে হতো, যাতে মঞ্চের তীব্র আলোয় তাকে দেখতে অদ্ভুত না লাগে! পরবর্তীতে আমার মৃত্যুর পর করা চিকিৎসকদের রিপোর্টেও এই ভিটিলিগো রোগের কথা প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু বেঁচে থাকতে দুনিয়া আমার কোনো কথাই বিশ্বাস করতে চায়নি।
আমি এক বিশাল বাড়ি বানিয়েছিলাম, নেভারল্যান্ড। যেখানে একটা আস্ত চিড়িয়াখানা ছিল, খেলনা ট্রেন ছিল। আমি আসলে টাকার জোরে সেই শৈশবটা কিনতে চেয়েছিলাম, যা আমার বাবা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন। যখনই কোনো পথশিশু সেখানে আসত, আমি তাদের সাথে অবুঝের মতো খেলতাম। কিন্তু দুনিয়া সেই সরলতাকেও বাঁকা চোখে দেখল। তারা আমার নিঃসঙ্গতাকে বানাল মুখরোচক গল্প, আর আমার একাকীত্বকে টেনে নিয়ে গেল আদালতের কাঠগড়ায়।
টাকার জোরে চারপাশের চাটুকাররা আমাকে ঘিরে রাখত ঠিকই, কিন্তু রাতে তীব্র ইনসোমনিয়ায় যখন আমি বিছানায় ছটফট করতাম, একটা হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। সুরের সেই জাদুকরী সিংহাসনটা আসলে একটা জ্বলন্ত কয়লার আসন, দূর থেকে যাকে শুধু সোনালী রঙের দেখাত। পিঠের পুরনো ব্যথা, ঘুম না হওয়া আর চারপাশের এই তীব্র মানসিক চাপ থেকে বাঁচতে আমি ওষুধের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম।
২০০৯ সালের জুন মাসের সেই শেষ দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। লন্ডনে আমার জীবনের শেষ ট্যুর This Is It-এর জন্য কঠোর রিহার্সাল করছিলাম। পঞ্চাশ বছর বয়সে এসেও আমি আমার দর্শকদের সেই পুরনো জাদুটাই ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার শরীর আর পারছিল না।
২৫শে জুনের সেই রাত। নিজের ঘরে আমি একটুখানি ঘুমের জন্য ছটফট করছিলাম। আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসক আমাকে শান্ত করার জন্য, একটুখানি ঘুম পাড়ানোর জন্য একটা কড়া সেডেটিভ ইনজেকশন দিলেন।
তারপর... চারপাশটা ধীরে ধীরে বড্ড নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ক্যামেরার সেই তীব্র ফ্ল্যাশ, হাজার হাজার মানুষের সেই অবিরাম চিৎকার, খবরের কাগজের সেই নির্মম হেডলাইন। সব কিছু কেমন যেন দূরে, বহু দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল। আমি জীবনে প্রথমবার এক পরম শান্তিতে চোখ বুজলাম।
দুনিয়া জানল, আমি আর নেই। কিন্তু আমার রেখে যাওয়া তিন সন্তান, আমার সেই জাদুকরি মুনওয়াক, আর কোটি কোটি তরুণের সেই উঁচু করে পরা কালো প্যান্ট আর সাদা মোজার ফ্যাশনটা কিন্তু রয়ে গেল। মানুষ আমাকে নিয়ে শত হাজার গল্প বানিয়েছে, কিন্তু দিনশেষে আমি ছিলাম গ্যারি শহরের সেই চার দেয়ালে বন্দি এক একলা বালক, যে কেবল একটুখানি বুকভরে বাঁচতে চেয়েছিল।



পাঠকের মন্তব্য