ম্যাজিক বয় থেকে ট্র্যাজিক বয়: নেইমারের জীবনের যত ইঞ্জুরি

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে

পুরো বিশ্ব ব্রাজিল টিমের যে একজন প্লেয়ারের দিকে এখন তাকিয়ে আছে, সে হলো নেইমার। কিন্তু নেইমার যেন ফুটবলের দুঃখী রাজপুত্র। খুব অল্প সময়ে ম্যাজিকাল সব পারফরমেন্স দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন ব্রাজিলের চোখের মনি। কিন্তু দারুণ সম্ভাবনাময় এই খেলোয়াড়ের জীবনে হঠাতই নেমে আসে ইনজুরির কালো ছায়া। সেই ছায়া যেন কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না এই ফুটবলারের। মাঠে নেমে গড়াগড়ি- অভিনয় না ব্যথায় আর্তনাদ তা ক্যামেরার লেন্সে দেখে বোঝাটা খুব কঠিন। তবে সেটা খানিকটা বুঝতে যেন পারেন এজন্য নেইমারের ইনজুরিগুলোর খবর একটু নিয়ে আসলাম। পড়ে আপনারাই বিবেচনা করবেন।

১. মেরুদণ্ডের ইনজুরি (২০১৪ বিশ্বকাপ)

ব্রাজিল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার সেই মারাত্মক ট্যাকলটি কোনো ফুটবলপ্রেমী ভুলতে পারবেন না। নেইমারের কশেরুকা (Fractured Vertebra) ভেঙে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, আঘাতটি আর মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার এদিক-ওদিক হলে পেলের উত্তরসূরিকে হয়তো সারা জীবনের মতো প্যারালাইজড হতে হতো। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগেই ছিটকে যান নেইমার, আর ব্রাজিল ডুবেছিল ১-৭ গোলের ট্র্যাজেডিতে।

২. ডান পায়ের সেই অভিশপ্ত মেটাটারসাল (২০১৮ ও ২০১৯)
পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায় তার ডান পায়ের পাতার পঞ্চম মেটাটারসাল হাড়।
১ম মেজর অপারেশন (মার্চ ২০১৮): ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবার পায়ের পাতার হাড়টি ভেঙে যায়। ব্রাজিলের বেলো অরিজন্তে-তে তার পায়ে একটি স্ক্রু (Screw) বসানোর জন্য প্রথম বড় অস্ত্রোপচার করা হয়। বিশ্বকাপের ঠিক ৩ মাস আগে বিছানায় কাটানো সেই দিনগুলো ছিল চরম অনিশ্চয়তার। রাশিয়া বিশ্বকাপে খেললেও তিনি সম্পূর্ণ ফিট ছিলেন না।

আবার ট্রমা (২০১৯): ২০১৯ সালে একই জায়গায় আবার ফ্র্যাকচার হয়। তবে সেবার ডাক্তাররা নতুন করে অপারেশন না করে ইনজেকশন ও কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্টের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা মিস করেন তিনি।

৩. গোড়ালির লিগামেন্ট ও দোহার অপারেশন (২০২৩)
নেইমারের খেলার স্টাইলটাই এমন যে ডিফেন্ডাররা তাকে ফাউল করতে বাধ্য হন। ফলে বারবার আঘাত এসেছে তার গোড়ালিতে। ২০২১ সালে বাম গোড়ালি মারাত্মক মচকে যাওয়ার পর, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিলের বিপক্ষে ম্যাচে ডান গোড়ালির লিগামেন্ট পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়।

২য় মেজর অপারেশন (মার্চ ২০২৩): গোড়ালির হাড় বারবার আলগা হয়ে যাওয়ার স্থায়ী সমাধানের জন্য দোহার বিখ্যাত অ্যাস্পেটার (Aspetar) হাসপাতালে তার গোড়ালির লিগামেন্ট পুনর্গঠনের জন্য মেজর সার্জারি করা হয়। এই অপারেশনের পর প্রায় ৪ মাস তাকে ক্রাচে ভর দিয়ে কাটাতে হয়েছিল।

৪. ক্যারিয়ারের দীর্ঘতম অন্ধকার: এসিএল ও মিনিসকাস টিয়ার (২০২৩-২০২৪)
সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে যোগ দেওয়ার পরপরই ২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ভয়াবহ চোটে পড়েন নেইমার। তার বাম হাঁটুর এসিএল (ACL) এবং মিনিসকাস ছিঁড়ে যায়।
৩য় মেজর অপারেশন (নভেম্বর ২০২৩): বেলো অরিজন্তে-তেই ব্রাজিল দলের চিকিৎসক রদ্রিগো লাসমার তার হাঁটুতে অত্যন্ত জটিল একটি অপারেশন করেন। এটি ছিল নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়। অপারেশন পরবর্তী রিহ্যাবের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে দেখা যায় ফিজিওথেরাপিস্ট যখন তার হাঁটু জোর করে সোজা করার চেষ্টা করছেন, নেইমার তখন যন্ত্রণায় শিশুর মতো চিৎকার করে কাঁদছেন। প্রায় এক বছর তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে, যা একজন ফুটবলারের জন্য নরকবাসের মতো।

৫. থাই ও হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি (বারবার পেশির টান)
নেইমারের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় বিরক্তির কারণ ছিল তার থাইয়ের পেশি এবং হ্যামস্ট্রিং স্ট্রেইন। বিশেষ করে পিএসজিতে থাকাকালীন (২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে) তিনি বারবার ২ থেকে ৪ সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে গেছেন। সামান্য পেশির টানের কারণেও তাকে প্রতি মৌসুমে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করতে হয়েছে।

৬. পাঁজরের ইনজুরি (Rib Injury - ২০২০)
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মঁপেলিয়ের বিপক্ষে একটি ম্যাচে পিএসজির হয়ে খেলার সময় পাঁজরের তরুণাস্থি (Rib Cartilage) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই চোটের কারণে তীব্র ব্যথায় তিনি প্রায় ৩ সপ্তাহ মাঠের বাইরে ছিলেন এবং ক্লাবের হয়ে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মিস করেন।

৭. অ্যাডাক্টর ইনজুরি (Adductor Pain - ২০২১)
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রেঞ্চ কাপের একটি ম্যাচে কঁ-এর বিপক্ষে খেলার সময় তিনি অ্যাডাক্টর পেশিতে গুরুতর চোট পান। এই ইনজুরির কারণে প্রায় এক মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল এবং বার্সেলোনার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বহুল প্রতীক্ষিত হাইভোল্টেজ নকআউট ম্যাচটি তিনি খেলতে পারেননি।

৮. বার্সেলোনা আমলের প্রারম্ভিক চোট (২০১৪)
বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার শুরুর দিকে, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে গেটাফের বিপক্ষে কোপা দেল রের ম্যাচে ডান গোড়ালির টেন্ডন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটি ছিল ইউরোপিয়ান ফুটবলে তার প্রথম বড় চোট, যার জন্য তাকে প্রায় ৩২ দিন মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছিল।

অনেকেই মনে করেন, লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর ফুটবলের সিংহাসন যার পাওয়ার কথা ছিল, এই ঘনঘন ইনজুরি ও অপারেশনের ধকলই তার সেই 'ব্যালন ডি'অর' জয়ের স্বপ্নকে অপূর্ণ রেখে দিল। তবুও, প্রতিবার এই তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে, প্রতিটা অপারেশন থিয়েটার থেকে নতুন করে নেইমারের ফিরে আসার লড়াই কোটি ফুটবল ভক্তকে অনুপ্রাণিত করে।

তথ্যসূত্র: FIFA medical report

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top