চুঁচুড়ার গঙ্গার ঘাটের এক জমাটি জোছনা রাত। ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৮৭৫ সাল। ভারতবর্ষে চলছে ইংরেজ শাসনামল। গঙ্গারধারের একটা বাড়িতে বসে আছেন ইংরেজদেরই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। জন্ম যাঁর বঙ্গে কিন্তু কর্ম ইংরেজাধীন!
বাইরে ফুরফুরে হাওয়া, গঙ্গার বুকে চাঁদের আলো ঝিলমিল করছে- চারিদিকে এক ফাটাফাটি পরিবেশ! কিন্তু বঙ্কিমবাবুর মেজাজ তখন গঙ্গার জলের মতো ঠান্ডা ছিল না, বরং ফুটন্ত তেলের মতো টগবগ করছিল।
কারণটা অবশ্য কিছুটা সিরিয়াসই বলা চলে, দিনকয়েক আগে ট্রেনে এক দেমাগী ইংরেজ সাহেব তাঁকে 'নেটিভ' মানে ভারতের 'কালা আদমি' বলে চরম অপমান করার চেষ্টা করেছিল। বাবু আমাদের আইনের লোক! আইনি চালে সাহেবকে টাইট দিলেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরের ঝালটা মেটেনি। তিনি ভাবছিলেন,
: এই নীলদাড়াছাড়া বাঙালিগুলোকে সোজা করার কোনো উপোয় নেই? একেবারেই কি এমন ন্যালাভুলোই পার হবে জীবন?
গরম মেজাজ মোটে ঠিক হচ্ছে না। তখন হঠাৎ চোখ গেল জানালার বাইরে। একটু যেন বেশিই মনোযোগ দিয়ে দেখে ফেললেন বাংলার ওই মাতাল রূপ। ভেতরের কবিটা যেন দেখতে দেখতে জেগে উঠল। চাঙ্গা হয়ে। খাতা-কলম টেনে নিয়ে লিখতে শুরু করলেন।
'সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম, শস্যশ্যামলাং মাতরম্...'।
ব্যস, বলা নেই, কওয়া নেই জন্ম হয়ে গেল 'বন্দে মাতরম্' নামের এক ছন্দের মশালের!
গান ভেবেই লিখলেন। এখন,লেখা তো হলো, কিন্তু সুর দেবে কে? বিড়ালের গলায় ঘন্টি, কে বাঁধবে গো?
বঙ্কিমবাবু ওনার আড্ডার ইয়ার-দোস্ত, সেকালের হেভিওয়েট গায়ক যদু ভট্টকে ডেকে পাঠালেন। যদু ভট্ট খাতায় চোখ বুলিয়েই চোখ কপালে তুলে বললেন,
: আরে বঙ্কিম! করেছ কী? এ তো সাধারণ গান নয় হে, এ তো পুরো আগুন!
ব্যস, তক্ষুনি তিনি বসে গেলেন সুর বাঁধতে! মল্লার রাগে বেঁধে এমন এক তান ছাড়লেন যে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চোখ দিয়ে একেবারে জল বেরিয়ে এলো!
আসল তামাশা তো শুরু হলো পরদিন, যখন বঙ্কিমবাবু গানটা ওনার নিজের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রেসে পাঠালেন ছাপার জন্য।
সেখানে তাঁর মেয়েজামাই আর প্রেসের কম্পোজিটর ছোকরারা প্রুফ কপিটা পড়ে খুব একচোট মুখ বাঁকাল।
জামাইবাবু নাক কুঁচকে বললেন,
: বাবা, এ যে ল্যাজে-গোবরে খিচুড়ি হয়েছে! অর্ধেক সংস্কৃত, অর্ধেক বাংলা! বড্ড খটমটে আর কাঁচা লেখা হয়েছে। এটা পত্রিকায় না রাখাই বোধহয় ভালো হয়।
প্রেসের এক ছোকরা কর্মচারী আবার এক কাঠি ওপরে। ফটাফট ফোঁড়ন কাটল,
: আজ্ঞে বাবু, পত্রিকার নিচের দিকে ওই সামান্য একটু জায়গা খালি আছে বলে যা তা একটা কাঁচা গান গুঁজে দেবেন না। লোকে হাসাহাসি করবে যে!
ব্যস, আর যায় কোথা! মূহুর্তে ইংরেজদের দাপুটে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমবাবু বেরিয়ে এলেন! ধড়াম করে টেবিল চাপড়ে, চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠলেন,
: চুপ করো! এটা কাঁচা না পাকা, তা দেখার জন্য আমি হয়তো বেঁচে থাকব না। কিন্তু লিখে রাখো তোমরা, আজ থেকে বিশ-ত্রিশ বছর পর এই একটা গানই পুরো ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে দেবে। বিপ্লবীরা এই গান গাইতে গাইতে ফাঁসির দড়ি গলায় পরবে, হাসিমুখে!
নামে তিনি বঙ্কিম, মেজাজেও কিছু ছিলেন বটে! বাবুর ওই চণ্ডী রূপ দেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্রেসের কর্মচারীরা তক্ষুনি গানটা ছেপে দিল।
তবে বঙ্কিমবাবুও চালাক ছিলেন, গানটা ছাপলেও ওটার আসল মহিমা দেখানোর জন্য সাত সাতটি বছর গানটিকে ড্রয়ার-বন্দি করে রেখেছিলেন।
ফাইনালি এলো ১৮৮২ সাল। যখন তিনি তাঁর আরেক মাস্টারপিস ওল্ড-ইজ-গোল্ড উপন্যাস 'আনন্দমঠ' লিখলেন, তখন সন্ন্যাসী বিপ্লবীদের থিম সং হিসেবে এই গানটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন।
ব্যস! বঙ্কিমবাবুর সেই ভবিষ্যৎবাণী একেবারে হান্ড্রেডে-হান্ড্রেড সত্যি হলো। গানটা রিলিজ হওয়া মাত্রই চারদিকে এমন দাবানল ছড়িয়ে পড়ল যে, ব্রিটিশ সাহেবদের রাতের ঘুম, লাঞ্চ, ডিনার সব উড়ে গেল! পরে তো স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানে সুর দিয়ে কংগ্রেসের স্টেজে দাঁড়িয়ে নিজেই গানটি গেয়ে একেবারে ফাটিয়ে দিলেন।
কেমন অবাক করা ব্যাপার-স্যাপার বলুন- যে গানটাকে বঙ্কিমবাবুর জামাই আর প্রেসের ছোকরারা 'ফালতু, কাঁচা, খটমটে' বলে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে চেয়েছিল, সেটাই শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তাসের ঘর কাঁপিয়ে দেবার সুপারহিট স্লোগান হয়ে গেল!
আর ভবিষ্যতদ্রষ্টা বঙ্কিমবাবু? সেই ইংরেজদের দাপুটে, ঘোড়েল ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আর সাহিত্যের আড্ডায় ভোজনরসিক হাসিমুখ মানুষটি- তিনি আরও একবার নিজের অন্যান্য কর্মের মত এই গানটি লিখেও মানুষের হৃদয়ে আজীবনের জন্য রয়ে গেলেন।
আজকের এই জন্মদিবসে বাংলা গদ্য সাহিত্যের নব্যযুগের এই কান্ডারিকে সালাম!



পাঠকের মন্তব্য