সেদিন বিকেলবেলা আকাশটা ভারী চমৎকার ছিল। মেঘগুলো তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল। ঠিক এমন একটা বিকেলে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির করিডোরে এক তরুণী এসে দাঁড়াল। তার পরনে একটা ঢিলেঢালা পোশাক, মাথায় খুব সুন্দর করে জড়ানো একটা হিজাব। তীর্থস্থান থেকে ফিরে এসে মেয়েটি তার বিশ্বাসের চাদরে নিজেকে জড়িয়েছে।
কিন্তু মানুষের জীবনের গল্পগুলো বড় অদ্ভুত হয়। মেয়েটির এক হাতে দুটো সরু কাঠের কাঠি। সে যখন একটা চামড়ার বাক্সের সামনে গিয়ে বসল এবং কাঠি দুটো বাতাসে ঘুরিয়ে প্রথম আঘাতটা করল। অমনি চারপাশের বাতাস যেন থমকে গেল। ড্রামের গুরুগুরু আওয়াজে ক্যাম্পাস কেঁপে উঠল। রক আর ফিউশনের এক অদ্ভুত রিদম তৈরি হলো বাতাসে। মেয়েটির নাম নাজিয়া সামান্থা।
ভিডিওটা যখন মুঠোফোনের দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল, আমাদের চেনা সমাজটা যেন এক মস্ত বড় ধাঁধায় পড়ে গেল। বাঙালির চিরকালের স্বভাব হলো চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে অন্যের ব্যক্তিগত ডায়রির পাতা ওল্টানো। চায়ের দোকানে বসে একদল মানুষ বলতে লাগল, আহা, মাথায় কাপড় দিয়ে এমন শোরগোল করা কি সাজে?
তারচেয়েও বড় ট্র্যাজেডি ঘটল পরদিন। মেয়েটির বাবা এসে অপরাধীর মতো হাতজোড় করে বললেন, আমার মেয়েকে আপনারা গালি দেবেন না, পারলে ভালোবেসে তার এই শখটা ছুটিয়ে দিন।
দৃশ্যটা দেখে মনের ভেতর কেমন যেন একটা খচখচানি তৈরি হয়। এই রূপালী জোছনার দেশে একটা মানুষের সামান্য আনন্দের জন্য তার বাবাকে সমাজপতির দরবারে ক্ষমা চাইতে হয়! কী আশ্চর্য!
অথচ চোখটা একটু বড় করে এই বিশাল পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকালে এক অলৌকিক আর অদ্ভুত সত্য চেনা যায়। চলুন, একটু দূর দেশে ঘুরে আসা যাক।
দূর ইন্দোনেশিয়ার এক শান্ত, সবুজ গ্রামে ঠিক এভাবেই তিনটি কিশোরী মেয়ে বড় হতে হতে একদিন একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। তাদের নাম ফিরদা, উইদি আর সিত্থি। তারা তিনজনই খুব নিয়ম করে মাথায় ধর্মীয় পোশাক হিজাব জড়াত। কিন্তু তাদের মনের ভেতর বাস করত এক অদ্ভুত সুর। থ্র্যাশ মেটাল! যে মিউজিক শুনলে আমাদের দেশের নীতিপুলিশদের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় হতো, সেই মেটালের তালে তারা গিটার আর ড্রাম পেটাতে শুরু করল।
ব্যান্ডের নাম দিল ভয়েস অফ বাসেপ্রোট।
গ্রামের মানুষ প্রথমে চোখ কপালে তুললেও, মেয়েগুলো কারো কথার তোয়াক্কা করেনি। তারা খুব সহজ একটা দর্শন জানত। ঈশ্বর মানুষের মন দেখেন, হাতের কাঠি আর মাথার চাদরের সাইজ মাপার জন্য তিনি বসে নেই। দেখতে দেখতে সেই হিজাবী মেয়েরা গ্লাস্টনবেরি ফেস্টিভ্যালের মতো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠে গেল। তাদের ড্রামার সিত্থি যখন মাথায় হিজাব বেঁধে বিদ্যুৎগতিতে ড্রামের কাঠি ঘোরায়, তখন সারা পৃথিবীর মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে। তারা কেউ ফতোয়া দিতে যায় না, তারা দেখে এক মুক্ত পাখির ডানার ঝাপটানি।
আমাদের নাজিয়া হয়তো এই সুদূর ইন্দোনেশিয়ার গল্পটা জানত। তাই সে-ও দুনিয়ার সমস্ত প্যারা আর ভার্চুয়াল গালিগালাজকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে মৃদু হেসেছে। নাচ সে ছেড়েছে বিশ্বাসের টানে, কিন্তু মনের ভেতরের সুরটাকে তো আর গলা টিপে মারা যায় না।
আসলে, জীবনটা বড় ছোট। এখানে কে মাথায় কাপড় দিল আর কে ড্রাম বাজাল, তা নিয়ে আদালত বসানোর কোনো মানেই হয় না। যার যার জীবন, সে তার মতো করেই সাজাক। ওপরওয়ালা তো আমাদের মতো সংকীর্ণ মনের নন, তিনি অনেক বড় হৃদয়ের হিসাবরক্ষক।
বাইরে এখন হালকা হাওয়া দিচ্ছে। চলুন, এই সুন্দর সন্ধ্যায় তর্কের খাতা বন্ধ করে আমরা বরং দূর আকাশের নক্ষত্রগুলোর দিকে তাকাই। তারা কোনো নিয়ম ছাড়াই কেমন চমৎকার জ্বলছে!
২
আমরা যখন এ দেশে বসে এখনো একটা ড্রামের কাঠি আর এক টুকরো কাপড়ের দৈর্ঘ্য মেপে যাচ্ছি, ঠিক তখনই এই মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তের মানুষগুলো কিন্তু সুরের এক মায়াবী আকাশ তৈরি করে ফেলেছে। সেখানে কোনো খাঁচা নেই, নেই কোনো অদৃশ্য দেওয়াল।
চলুন, চট করে সমুদ্রের ওপার থেকে ঘুরে আসা যাক।
আমেরিকার এক ঝলমলে স্টুডিওতে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথায় খুব সুন্দর করে জড়ানো হিজাব। মেয়েটির নাম নীলম হাকিম। সে যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আধুনিক হিপ-হপের কড়া বিটে নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করে, তখন খোদ আমেরিকার বড় বড় সংগীতের জাদুকরেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাততালি দেন। নীলম খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছে, মাথার কাপড়টা আমার বিশ্বাস, আর এই সুরটা আমার আত্মা। দুটোকে আলাদা করার ক্ষমতা কারোর নেই।
আবার ওদিকে সিরিয়ান-আমেরিকান মোনা হায়দার তো আরও এক কাঠি ওপরে। সে মাথায় হিজাব গলিয়েই গান বেঁধে ফেলল, যার নাম দিল Hijabi। পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষ যখন ইসলাম নিয়ে হাজারটা ভ্রান্তিতে ভুগছে, মোনা তখন তার র্যাপ মিউজিক দিয়ে এক অদ্ভুত প্রতিরোধ গড়ে তুলল। সে তার হিজাবটাকে বানাল নারী শক্তির প্রতীক।
কী আশ্চর্য, তাই না?
একটু পাশেই দুবাই শহরের রাজপথ দিয়ে একটা ভারী মোটরবাইক সাঁ করে চলে গেল। বাইকটা যে চালাচ্ছে, তার মাথায়ও কিন্তু হিজাব। মেয়েটির নাম ঘালিয়া চাকার। সে ঘরে ফিরে বাইকটা রেখে যখন গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়ায় আর নিজের লেখা গান গাইতে শুরু করে, তখন ইন্টারনেটে লক্ষাধিক মানুষের বুকটা এক অজানা শান্তিতে ভরে যায়। মালয়েশিয়ার মেয়ে বুঙ্গাও একই কাজ করছে। সে তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সাথে মাথাটা ঢেকেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুর্দান্ত গতিতে র্যাপ গেয়ে যায়।
এই মেয়েগুলো কেউ কিন্তু তাদের বিশ্বাসের চাদরটাকে ছুঁড়ে ফেলে আধুনিক সাজতে যায়নি। আবার সমাজের ভয়ে ঘরের কোণে অবলা হয়ে লুকিয়েও থাকেনি। তারা এক অদ্ভুত সুন্দর সত্য আবিষ্কার করেছে—জীবনটা তো একটা সাদা কাগজের মতো। সেখানে তুমি ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসাও এঁকে দিতে পারো, আবার নিজের প্রিয় সুরের স্বরলিপিও সাজিয়ে নিতে পারো। দুটো একই পাতায় ভারী চমৎকার মানিয়ে যায়।
অথচ আমাদের এই ছোট্ট চেনা জনপদের মানুষগুলোর মন কেন যেন বড় সংকীর্ণ। তারা মানুষকে একটা নির্দিষ্ট ছকে দেখতে পছন্দ করে। সেই ছকের বাইরে কেউ এক ইঞ্চি পা বাড়ালেই অমনি চারপাশ থেকে বিচারকেরা লাঠি নিয়ে তাড়া করে।
আসলে, এই বিশাল মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা এতই ক্ষুদ্র যে, কারোর ব্যক্তিগত পছন্দের কেবিনে উঁকি মেরে ফতোয়া জারী করার কোনো মানেই হয় না। ওপরওয়ালা মানুষের বাইরের পোশাক বা হাতের কাঠি গোনার জন্য বসে নেই, তিনি দেখেন মানুষের ভেতরের খাঁটি মনটা।
বাইরে আবার মেঘ ডাকছে। হয়তো আরেকটু পরেই ঝুম বৃষ্টি নামবে। এই বৃষ্টির জলের মতো করেই দুনিয়ার সমস্ত অবদমন আর ভার্চুয়াল ভণ্ডামি ধুয়েমুছে যাক। দূর গাঁয়ের কোনো এক তরুণী মাথায় কাপড় জড়িয়েই মহাকাশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখুক, আর আমাদের নাজিয়া তার কাঠের কাঠিতে জীবনের আনন্দ খুঁজে পাক।
আমরা বরং সব প্যারা ভুলে, তর্কের খাতা বন্ধ করে বারান্দায় এসে চুপচাপ বৃষ্টির শব্দ শুনি। এর চেয়ে মায়াবী আর কোনো সুর কি এই পৃথিবীতে আছে?







পাঠকের মন্তব্য