বাংলাদেশি অ্যানিমেল ফার্ম পশুপ্রেম

৭৫ পঠিত ... ১৩:৩১, মে ২৩, ২০২৬

2 (1

 

 

শহরের বাইরে এক পুরোনো খামার ছিল। নাম সোনার বাংলা ক্যাটল ফার্ম। সেখানে অনেক গরু, ছাগল আর ভেড়া থাকত। বছরের বেশিরভাগ সময় খামারটা শান্ত থাকলেও কোরবানির ঈদ সামনে এলেই শুরু হতো অদ্ভুত ব্যস্ততা।

খামারের মালিক রহমান মিয়া তখন হঠাৎ খুব ধার্মিক আর আবেগপ্রবণ হয়ে যেতেন। প্রতিদিন সকালে এসে পশুদের গায়ে হাত বোলাতেন আর বলতেন,

তোরা শুধু গরু, ছাগল না… তোরা আমার কলিজা।

তারপর পাশের দালালকে আস্তে করে বলতেন,

কালোটার দাম তিন লাখের নিচে ছাড়া যাবে না।

খামারের সবচেয়ে বয়স্ক গরুর নাম ছিল হাজী সাহেব। বিশাল শরীর, ধীর গলা, আর চোখে অদ্ভুত জ্ঞানীর ভাব। সে বহু ঈদ দেখেছে। বহু ট্রাক যেতে দেখেছে। বহু গরু যেতে দেখেছে কিন্তু...আর কখনো ফিরতে দেখেনি। এত ঈদ দেখার ফলে তার চোখে সবসময় এক ধরনের ক্লান্তি দেখা যেত। সে খুব কম কথা বলত। কিন্তু যখন বলত, সবাই চুপ হয়ে শুনত।

এক বর্ষার রাতে হাজী সাহেব সব গরুকে ডাকল। খামারের বাতি তখন আধো অন্ধকারে জ্বলছে। দূরে কোথাও একজন ইউটিউবার 'বিশাল গরু দেখতে চলে আসুন' বলে ভিডিও করছে। হাটের মাইকিং চলছে দূরে। হাজী সাহেব ধীরে বলল,

ভাইসকল… আমরা জন্ম থেকে শুধু মোটা হচ্ছি। কিন্তু নিজেদের জন্য না।

সব গরু চুপ হয়ে গেল।

সারাবছর আমাদের খবর থাকে না। কিন্তু ঈদ আসলেই সবাই এসে দাঁত দেখে, পা টিপে, ছবি তুলে… তারপর বলে- এটা কয় মণ হবে? মানুষ আমাদের আদর করে না। মানুষ আমাদের দাম করে।

এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ গরু রাঙ্গা রেগে বলল,

আমরা কি শুধু মণের হিসাব?

হাজী সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

মানুষ সবকিছুর দাম দেয়। কিন্তু কোনো কিছুর সম্মান দেয় না।

সেই রাতেই খামারের প্রাণীদের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠল।

কয়েকদিন পর সুযোগ এসে গেল। রহমান মিয়া শহরে গিয়েছিল গরুর নতুন ব্যানার বানাতে-

এবারের সেরা জায়ান্ট গরু!

সেই সুযোগে গরুরা গেট ভেঙে পুরো খামারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। ছাগলরা আনন্দে লাফাতে লাগল। ভেড়ারা বুঝতে না পেরে বাকিদের দেখাদেখি দৌড়াতে লাগল।
খামারের নতুন নাম দেওয়া হলো-

পশু প্রজাতন্ত্র

দেয়ালে বড় বড় করে পশু প্রজাতন্ত্রের সাতটি নিয়ম লেখা হলো-

* সকল পশু সমান।
* কোনো পশু মানুষের কথা বিশ্বাস করবে না।
* সেলফি হারাম।
* ওজন মাপা নিষিদ্ধ।
* ট্রাকে ওঠা নিষিদ্ধ।
* কোনো পশু অন্য পশুর দালালি করবে না।
* সকল পশু স্বাধীন।

প্রথম কয়েকদিন যেন স্বপ্ন। কেউ আর কারও দাঁত দেখে না। কেউ আর 'কয় লাখ?'বলে না। সব পশু মিলে ঘাস খায়। একসাথে ঘুমায়। একসাথে বাঁচে। ছোট ছাগলগুলো মাঠে দৌড়াত। ভেড়ারা নিশ্চিন্তে ঘাস খেত।

সবচেয়ে বেশি কাজ করত রাঙ্গা। সে সবসময় বলত,

আমাদের খামার আমরা বদলাব।

সবাই তাকে ভালোবাসত। ধীরে ধীরে রাঙ্গা সবার নেতা হয়ে উঠল। প্রথমে সে খুব সাধারণ ছিল। সবার সাথে মাঠে ঘুমাত। একই খাবার খেত। কিন্তু কিছুদিন পর বদল শুরু হলো।

একদিন দেখা গেল রাঙ্গা আলাদা শেডে থাকে। তার জন্য বিশেষ খাবার আসে। আর তার আশেপাশে সবসময় কয়েকটা বিশাল ষাঁড় পাহারা দেয়। রাঙ্গা বলল,

নেতৃত্ব সহজ নয়।

একদিন দেখা গেল দেয়ালের নিয়ম বদলে গেছে। আগে ছিল,

সেলফি হারাম।

এখন লেখা,

অফিশিয়াল প্রচারণার জন্য সেলফি জায়েজ।

আগে ছিল,

কোনো পশু অন্য পশুর দালালি করবে না।

এখন লেখা,

রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সীমিত দালালি করা যাবে।

ভেড়াগুলো কিছুই বুঝত না। তারা শুধু সারাদিন এক কথা বলত,

রাঙ্গা ঠিকই বলে! রাঙ্গা ঠিকই বলে!

এরপর খামারে আবার মানুষ আসা শুরু হলো। তবে এবার তারা অতিথি হয়ে আসত। রাতে রাঙ্গা মানুষদের সাথে বসে হিসাব করত-
কে কোন হাটে যাবে, কার লাইভ হবে, কার দাম কত উঠবে।

সাধারণ গরুগুলো দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। তারা বুঝতে পারছিল বিদ্রোহ হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু লাভ কার হয়েছে, সেটা আর পরিষ্কার না।

ঈদের আগের রাতে বৃদ্ধ হাজী সাহেব দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। শেষ নিয়মটা বদলে গেছে। আগে লেখা ছিল-

সকল পশু সমান।

এখন লেখা,

সকল পশু সমান, তবে কিছু পশুর বাজারমূল্য বেশি।

সাধারন পশুরা বুঝতে পারছিল- সবকিছু বদলেছে। কিন্তু কিছুই বদলায়নি।

সেই রাতে সাধারণ পশুরা জানালার ফাঁকে দাঁড়িয়ে দেখল-

মানুষ আর নেতাপশুরা একসাথে বসে খাচ্ছে। হাসছে। লাইভ করছে। দাম ঠিক করছে।
তখন আর বোঝা যাচ্ছিল না-

কে মানুষ, আর কে গরু।


(জর্জ অরওয়েল এর 'অ্যানিমেল ফার্ম' এর অনুকরণে)

৭৫ পঠিত ... ১৩:৩১, মে ২৩, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top