কোরবানির ঈদ মানেই শুধু ধর্মীয় উৎসব না। এটা এক ধরনের জাতীয় লজিস্টিক অপারেশন।
এখানে গরু আসে, মানুষ আসে, আত্মীয় আসে, আর সবচেয়ে বেশি আসে বিশ্লেষক শ্রেণী। এক মিশ্র উৎসব!
পাড়ার নাম শান্তিনগর। যদিও এখানে শেষ কবে শান্তি ছিল, সেটা কেউ মনে করতে পারে না। ঈদের আগের রাত থেকেই পুরো এলাকায় উত্তেজনা। কারণ এবারের কোরবানিতে সবচেয়ে বড় গরু কিনেছেন নুরু কমিশনার। গরুর নাম কালা বাহাদুর। গরু এত বড় যে, সাত দিন ধরে শুধু মানুষ এসে দেখে গেছে আর বলেছে,
মাশাআল্লাহ… উন্নয়ন, উন্নয়ন!
তাছাড়া নুরু কমিশনার ঘোষণাও দিয়েছেন যে, এবার তিনি আরও তিনটা গরু কোরবানি দেবেন গরিব, দুঃখী আর দুস্থ মানুষের জন্য। সবাই খুব বাহবা দিয়েছে তাঁর ঘোষণায়। সকলে খুশি।
ঈদের সকাল।
মসজিদ থেকে ফিরে সবাই যখন কোলাকুলি করছে, তখনই খবর ছড়িয়ে পড়ল, নুরু কমিশনারের গরুর ওজন সাত মণ ছাড়িয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা। কারণ সামনে কমিশনার নির্বাচন।
কমিশনার বাড়ির সামনে মানুষের ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল, ঈদের গোশত বিতরণ না, নির্বাচনী জনসভা।
কোরবানি শেষ হওয়ার পর নুরু কমিশনার উঠানে প্লাস্টিকের চেয়ার বসিয়ে জরুরি বৈঠকে বসলেন। সামনে বিশাল মাংসের স্তূপ। পাশে পাঁচজন বিশ্বস্ত কর্মী। একজনের কাজ মাংস ওজন দেওয়া। একজনের কাজ নাম লেখা। আর বাকিদের কাজ, জি ভাই, ঠিক ভাই বলা।
নুরু কমিশনার গম্ভীর গলায় বললেন,
দেখো, এবারের বণ্টন যেন নিরপেক্ষ হয়।
এই কথা শুনে আশপাশে দাঁড়ানো সবাই এমনভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল, যেন কোনো বিল পাশ হচ্ছে। এরপর শুরু হলো ‘নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মাংস বণ্টন’।
ঠিক তখনই কমিশনারের স্ত্রী রান্নাঘর থেকে চিৎকার করলেন,
শুনছেন? আপার বাসায় ভালো মাংসটা আগে পাঠান। গতবার চর্বি গিয়েছিল, এখনো কথা শোনায়!
কমিশনার মাথা নিচু করে বললেন,
ওইটা কূটনৈতিক ইস্যু। আগে সমাধান করো। পরে গরিবদেরটা ভাগ করো।
কমিশনারের ছোট ভাই নবাব বলল,
গরিবদের অবশ্যই দিও। কিন্তু আমাদের লোকজনও তো আছে।
আমাদের লোকজন কথাটার মানে জানে না এমন কেউ তো আর এখনকার জমানায় নেই, তাই সবাই চুপ করে রইল। বছরজুড়ে নানা কাজে দরকার পড়ে এদের। এদের ছাড়া কিভাবে কী?
তালিকা পড়া শুরু হলো।
অমুক মিয়া।
এক কেজি।
তমুক ভাই।
দেড় কেজি।
সমুক দাদা।
দুই কেজি।
পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে বলল,
সমুক দাদা বেশি পাইতেছে ক্যান?
আরেকজন বলল,
গতবার নির্বাচনে তার গলাই সবচেয়ে উঁচা আছিল।
সঙ্গে সঙ্গে সবাই বুঝে গেল যা বোঝার!
এরপর এলো স্থানীয় প্রভাবশালীদের তালিকা। চলতে লাগল বণ্টন।
এদিকে পাড়ার বিরোধী গ্রুপ বসে বিশ্লেষণ করছে। সিদ্দিক মেম্বার চা খেতে খেতে বলল,
দেখছো? সবই নিজের লোকরে দিতেছে।
পাশ থেকে হাবিব বলল,
এই জন্যই মেম্বারসাব, দেশে গণতন্ত্র নাই।
তখনই তার ছেলে বলল,
আব্বা, আমাদের বাসায়ও তো দুই ব্যাগ আসছে।
হাবিব গলা নামিয়ে বলল,
ওটা ভিন্ন বিষয়। ওটা কূটনৈতিক সম্পর্ক।
এদিকে এলাকার গরিব মানুষেরা সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের হাতে ছোট ছোট ব্যাগ। চোখে আশার আলো।
এই সমস্ত ঝামেলা যখন চলছে, তখন কমিশনার সাহেবের ভাগ্নে রনি এসে বলল,
মামা, সাংবাদিক আইছে।
সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ বদলে গেল। কমিশনার সাহেব দ্রুত একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে এক বৃদ্ধার সামনে দাঁড়ালেন।
ফটোগ্রাফার বলল,
স্যার, একটু হাসেন।
কমিশনার এমনভাবে দাঁত বের করে হাসলেন, যেন তিনি নিজ হাতে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করছেন। ছবি তোলা শেষ। ব্যাগটাও হাওয়া। কারণ ছবি তোলার পরপরই ব্যাগটা আবার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বৃদ্ধা হতভম্ব।
তিনি বললেন,
বাবা, আমার মাংস?
রনি কানে কানে বলল,
খালা, আপনার ছবি উঠছে। এটাই বড় বিষয়। আর একটু ধৈর্য ধরেন। আপনারাও পাইবেন। এইসব কামে ধৈর্য তো লাগেই।
তখন খবর এল, বিরোধী পক্ষের নেতা রফিক মাস্টার ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন,
মাংস বণ্টনে চরম অনিয়ম। জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন।
সঙ্গে সঙ্গে কমিশনারের উঠানে উত্তেজনা।
এক কর্মী বলল,
ভাই, উনার বাসায় তো দুই ব্যাগ পাঠাইছি!
কমিশনার ঠান্ডা গলায় বললেন,
রাজনীতিতে মাংস খাইতে সমস্যা নাই। সমস্যা হলো স্বীকার করতে।
এই সময় এক কিশোর লাইভ শুরু করল।
বন্ধুরা, আপনারা নিজের চোখে দেখে নিন। এখানে সাধারণ মানুষ হাড় পাচ্ছে, আর বিশেষ গোষ্ঠী গোশত পাচ্ছে!
লাইভে কমেন্ট আসতে লাগল,
ভাই সত্য কথা বলছে।
শেয়ার দিলাম।
এই হাড়ের বিচার চাই।
এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, কমিশনারকে প্রেস ব্রিফিং করতে হলো। তিনি চেয়ার টেনে বসলেন।
গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
আমরা সবসময় সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য মাংস বণ্টনে বিশ্বাসী।
এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল,
তাহলে নানা ধরনের ব্যাগ, কম-বেশি, এমন কথা শোনা যাচ্ছে কেন?
কমিশনার একটু থেমে বললেন,
শোনা কথায় কান দিতে নেই। এটা অপপ্রচার।
আরেকজন বলল,
কিন্তু ভিডিও আছে।
কমিশনার শান্ত গলায় বললেন,
ভাই, ভিডিও যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ভিডিও এডিটও করা যায়।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলো। কারণ নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে,
যাদের অভিযোগ আছে, তাদের অতিরিক্ত কিছু দেওয়া হবে।
পাড়ার মানুষ খুশি। কারণ এখানে মানুষ সবসময় বিচার চায় না। অনেক সময় শুধু চায়, তার ব্যাগটাও যেন একেবারে খালি না থাকে।
রাতে কমিশনার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফ্রিজের দিকে তাকালেন।
তার মুখে রহস্যময় হাসি।
পরিস্থিতি আন্ডার কন্ট্রোল!



পাঠকের মন্তব্য