দুখু নামের ছেলেটা

পঠিত ... ৮ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে

 

আসলে মানুষের জীবনটা সহজ কোনো অঙ্ক নয়। কেউ চায় রাজপুত্র হতে, আর ঈশ্বর তাকে পাঠিয়ে দেন ধুলোবালি মাখা এক অনিশ্চিত পথে। চুরুলিয়া গ্রামটা ছিল ঠিক তেমনই, রুক্ষ মাটির ঘ্রাণ আর অভাবের এক অদ্ভুত মিশেল। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের সেই জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে যখন আমি জন্মালাম, তখনো কেউ জানত না এই ছেলেটা একদিন ঝড়ের বেগে কলম চালাবে।

বাবা কাজী ফকির আহমেদ মানুষটা ছিলেন বড় শান্ত প্রকৃতির। মসজিদের ইমামতি আর মাজারের দেখাশোনা করেই তার দিন কাটত। কিন্তু আমার জন্মের কয়েক বছরের মাথায় তিনি যখন চলে গেলেন, চারপাশের পৃথিবীটা এক নিমেষে বদলে গেল। নয় বছরের একটা বাচ্চার কাঁধে যখন সংসারের বোঝা চাপে, তখন তার শৈশবটা আর থাকে না। আমি হলাম মসজিদের মুয়াজ্জিন। ভোরে যখন আমার কণ্ঠে আজান ভেসে যেত, আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, ঈশ্বর কি আমার এই ডাক শুনতে পান? নাকি তিনিও আমার মতো এই দারিদ্র্যের মাঝে কোথাও হারিয়ে গেছেন?

মক্তবের পড়া আর ধর্মীয় দর্শনের বইগুলো আমাকে এক বিশাল জগতের খবর দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পেটের ক্ষুধা বড় বালাই। সেই ক্ষুধাই আমাকে টেনে নিয়ে গেল লেটো দলে। লোকে বলত আমি নাকি অদ্ভুত গান বাঁধতে পারি। আমি কবিতা লিখতাম, সুর দিতাম, আবার সঙ সেজে মঞ্চে নাচতামও। আসানসোলের এক চায়ের দোকানে যখন আমি কাপ-পিরিচ পরিষ্কার করতাম, তখন দোকানের ধোঁয়ার মাঝে আমি দেখতাম হাজারটা চরিত্র। রেলের গার্ড সাহেবের বাসায় যখন রুটি বেলতাম, আগুনের হলকায় নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পেতাম।

লোকে আমার নাম রেখেছিল দুখু। বড় সার্থক সেই নাম! যে ছেলেটার শৈশব কাটে লেটো দলের ছন্নছাড়া জীবনে, যার পকেটে পয়সা থাকে না কিন্তু মাথায় থাকে সুরের মেলা, তার চেয়ে দুঃখী আর কে আছে? তবে ওই যে বললাম, অভাব মানুষকে ভেতর থেকে ধারালো করে দেয়। আমি বুঝছিলাম, আমার ভেতরে একটা অস্থির সমুদ্র টালমাটাল করছে। আমি স্রেফ একজন ইমামের ছেলে হয়ে বা চায়ের দোকানের কর্মচারী হয়ে মরে যেতে আসিনি। আমার ভেতরে একটা 'বিদ্রোহী' জন্ম নিচ্ছিল, যে একদিন পৃথিবীর সব শিকল ভেঙে ফেলার ডাক দেবে।

দুই

কলকাতা শহরটার একটা নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। সেই ঘ্রাণে কেমন যেন একটা নেশা থাকে। ১৯২১-২২ সালের দিকে যখন আমি এই শহরে পুরোদমে লিখতে শুরু করলাম, তখন চারপাশের মানুষগুলো আমার দিকে এমনভাবে তাকাত, যেন আমি ভিনগ্রহের কোনো জীব। আসলে আমার লেখাগুলো তো পরিশীলিত ড্রয়িংরুমের নরম আলোয় বসে লেখা কোনো কবিতা ছিল না; ওগুলো ছিল বুক চিরে আসা একেকটা চিৎকার।

আমি যখন লিখতে বসতাম, আমার মনে হতো ঘরের দেয়ালগুলো সব হা হয়ে গেছে। কলমটা চলত ঝড়ের গতিতে। 'বিদ্রোহী' কবিতাটা যখন শেষ করলাম, সারা শরীর কেমন যেন কাঁপছিল। ওই যে লাইনে লিখেছিলাম না, আমি চির-বিদ্রোহী বীর, আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির! ওটা আসলে কোনো অহংকার ছিল না, ওটা ছিল এই ঘুণে ধরা সমাজের গালে একটা প্রচণ্ড চড়। ব্রিটিশ সরকার আমার ওপর খেপে গেল। ধূমকেতু পত্রিকায় লেখার অপরাধে ওরা আমাকে রাজদ্রোহী বানিয়ে জেলের খাঁচায় পুরল। কিন্তু ওরা জানত না, লোহার শিক দিয়ে শরীর আটকানো যায়, ভেতরের আগুনকে নয়। হুগলি জেলে যখন ৪০ দিন অনশনে ছিলাম, মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল, অথচ বুকের ভেতরের গানগুলো তখনো গুনগুন করত।

এরই মধ্যে প্রমীলা এলো আমার জীবনে। আশালতা সেনগুপ্ত। এক চিলতে রোদ যেন মেঘলা আকাশে উঁকি দিল। সমাজ যথারীতি আঙুল তুলল, ফিসফিসানি শুরু হলো, এ তো হিন্দু মেয়ে, আর ছেলেটা তো মুসলিম! আমি মনে মনে হাসতাম। মানুষের তৈরি এই ভাঙা দেয়াল দিয়ে কি ভালোবাসাকে মাপা যায়? ১৯২৪-এর ২৪ এপ্রিল আমরা যখন বিয়েটা করলাম, আমি জানতাম একটা নতুন যুদ্ধ শুরু হলো।

ঈশ্বর আমাদের ঘরে সন্তান পাঠালেন। কিন্তু ওই যে, আমার জীবনের নামের সাথে দুখু শব্দটা এমনি এমনি জুড়েনি। আমাদের প্রথম ছেলে বুলবুল যখন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ছটফট করতে করতে আমার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, আমার মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব আলো এক নিমিষে নিভে গেছে। আমি এত গান লিখি, এত সুর তুলি, অথচ নিজের সন্তানকে বাঁচানোর কোনো সুর আমি জানতাম না। পরে সব্যসাচী, অনিরুদ্ধ আর কৃষ্ণ মোহাম্মদ যখন এলো, আমি ওদের নামের মাঝেই আমার জীবনের মূল দর্শনটা বুনে দিয়েছিলাম, সেখানে হিন্দু আর মুসলিমের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। কারণ আমি তো সবসময়ই একটা কথা বিশ্বাস করেছি, ধর্মের চেয়ে, জাতের চেয়ে মানুষের ওই ভেতরের সত্যটা অনেক বড়।

তিন

১৯৪১ সালের সেই দিনটার কথা মনে হলে আজও বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন। যে মানুষটাকে আমি দূর থেকে গুরু মেনেছি, যাঁর বসন্ত নাটক উৎসর্গ করার আনন্দ আমি কোনোদিন ভুলাতে পারিনি, সেই হিমালয়টা হুট করে ধসে পড়ল। আমি লিখলাম রবিহারা। কিন্তু তখন কে জানত, রবির সাথে সাথে আমার জীবনের আলোটাও নিভে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে।

তার পরের বছর, ১৯৪২ সাল। জীবনটা এক অদ্ভুত ধাঁধায় মোড় নিল। হুট করেই আমার চারপাশের শব্দগুলো হারিয়ে যেতে লাগল। আমি কথা বলতে চাইতাম, কিন্তু ঠোঁট দুটো অবাধ্য হয়ে রইল। ডাক্তাররা এটাকে পিক্স ডিজিজ বা অন্য কোনো কঠিন নামে ডাকল, কিন্তু আমার কাছে মনে হতো ঈশ্বর বুঝি আমার ৪০০০ গানের হিসাব মেলাতে গিয়ে আমার বাকশক্তিটাই কেড়ে নিলেন।

দীর্ঘ ৩৪টা বছর! ভাবা যায়? একটা মানুষ, যার একটা ডাকে হাজারটা তরুণ রাজপথে নেমে আসত, ব্রিটিশদের সিংহাসন কেঁপে উঠত, সেই মানুষটা একটা ঘরের কোণে সম্পূর্ণ নীরব, নিথর হয়ে বসে আছে। আমি কথা বলতে পারতাম না, কিন্তু সব দেখতাম, সব বুঝতাম। প্রমীলা যখন ১৯৬২ সালে আমাকে একা ফেলে চলে গেল, আমার চোখের কোণ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে পড়েছিল, একটা শান্ত্বনার শব্দও মুখ দিয়ে বের হয়নি। লোকে ভাবত দুখু মিয়া বুঝি এখন কিছুই টের পায় না। কিন্তু আমার ভেতরে তখনো বিদ্রোহীর সেই ঝড়টা চলত, শুধু বাইরে কোনো শব্দ হতো না।

অবশেষে ১৯৭২ সাল এলো। স্বাধীন এক বাংলার মাটিতে আমাকে নিয়ে আসা হলো। চারপাশের লাখো মানুষের চিৎকার, জয়ধ্বনি আর ভালোবাসা যখন আমার কানে আসত, আমার বুকটা অভিমানে ভরে উঠত। আমি চিৎকার করে বলতে চাইতাম, আমি তোমাদেরই দুখু মিয়া, আমি তো মরিনি! কিন্তু চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাওয়া সেই কণ্ঠ আর সাড়া দেয়নি। ১৯৭৬-এর ২৯ আগস্ট এই নীরবতার মহাকাব্যের শেষ পাতাটা উল্টে গেল।

আজ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছি। ভোরের আলো ফুটলে এখান থেকে আজানের পবিত্র ধ্বনি ভেসে আসে, আবার হয়তো বাতাস পেরিয়ে দূর থেকে কোনো মন্দিরের সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনিও ছুঁয়ে যায় আমাকে। জীবনভর যে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের গান গেয়েছি, মৃত্যুর পর আমার এই শেষ ঠিকানাটাও যেন সেই সমন্বয়ের এক পরম আশ্রয় হয়ে রইল। চুরুলিয়া থেকে ঢাকা, এই দীর্ঘ পথটা আসলে কোনো পরাজয়ের গল্প নয়, এ এক চিরকালের তীব্র ভালোবাসার জয়গান।

পঠিত ... ৮ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে

আরও eআরকি

 

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top