ফ্ল্যাটের সামনে আপনার মেয়ের একটি জুতো পড়ে আছে। অপরটি নেই। আপনার কলিজায় অশুভ এক আশঙ্কা কামড় বসাল। আপনি পাগলের মতো ছুটতে শুরু করলেন। বিল্ডিংয়ের প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন মেয়ের খোঁজে।
সব ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও আপনার ফ্লোরের পাশের ফ্ল্যাটটির দরজা বন্ধ। কেউ খুলছে না। ততক্ষণে সবাই জড়ো হয়ে গেছে। ৯৯৯-এ ফোন করা হলো। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ফেলল।
ভেতরে পাওয়া গেল আপনার মেয়ের নিথর দেহ। এক মুহূর্তে ভেঙে গেল আপনার সব স্বপ্ন, সব আশা।
যে মুখটিতে জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত এঁকেছিলেন অসংখ্য চুমু, যে চুলে ময়লা লাগলে যত্ন করে ধুয়ে দিতেন, তেল দিতেন, শখ করে ঝুঁটি কিংবা বেণী করে দিতেন, সেই আদরের সন্তান আজ আর নেই।
মেয়েকে শিক্ষিত করে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে স্বপ্ন দেখতেন, সেই স্বপ্নটাও শেষ হয়ে গেল এক নির্মম বাস্তবতায়।
আপনি মা। আপনি বাবা। এমন শোক কীভাবে সহ্য করবেন?
দরজা ভাঙার পর লাশের পাশ থেকে ঘাতক সোহেল রানার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। তবে ঘাতক অনেক আগেই তিনতলার জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
শিশু লামিসা। বয়স মাত্র ৭–৮ বছর। আজ সকালে মিরপুরের এই ঘটনায় আবারও ভয়াবহ বর্বরতার সাক্ষী হলো বাংলাদেশ।
পুলিশের ধারণা, বিকৃত মানসিকতা ও শিশুর প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ থেকেই এই নৃশংসতা চালিয়েছে সোহেল। সোহেলের স্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার স্বামী একজন বিকৃত মানসিকতার মানুষ এবং তাকেও নির্যাতন করত। পুলিশ জানিয়েছে, বাকি বিষয়গুলো ময়নাতদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, লামিসাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে এল না কেন?
মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় বাংলাদেশ যেন বারবার ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। নইলে একের পর এক এমন ঘটনা কেন দেখতে হবে আমাদের?
আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায়, সুষ্ঠু বিচার যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে অভিভাবকেরা আর কতটা নিশ্চিন্তে বাঁচবেন?
২
সেদিন একটি ভিডিও দেখে ভীষণ আঁতকে উঠেছিলাম। পাঁচটি ছোট ছেলে, বয়স ৯–১০ বছর হবে। গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন সিগারেট ধরিয়েছে, বাকিরা পাহারা দিচ্ছে। অনেকের কাছে হয়তো বিষয়টি দুষ্টুমি মনে হতে পারে, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর দৃশ্যটি ভয়াবহ হয়ে উঠল।
প্রশ্ন হলো, এই বয়সের শিশুরা এমন আচরণ কোথা থেকে শিখছে? তারা কীভাবে এমন কিছু অনুকরণ করছে, যার গভীরতা বা পরিণতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই থাকার কথা নয়?
এই শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
এরাই হয়তো বড় হওয়ার আগেই ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনার ভুক্তভোগী হবে, কিংবা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে। তখন বাবা-মায়ের আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
৩
বাবা-মায়েদের বুঝতে হবে, সন্তান কোনো রাস্তার প্রাণী নয় যে জন্ম দিলাম আর এদিক-ওদিক ঘুরে নিজে নিজেই বড় হয়ে যাবে।
সন্তান সৃষ্টিকর্তার দেওয়া জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। সেই যুগ আর নেই, যখন অসতর্ক থেকেও সন্তান বড় করে ফেলা যেত।
সপ্তাহ খানেক আগের ঘটনা। ফুটফুটে শিশু ফাহিমা। প্রতিবেশী এক ব্যক্তি তাকে সিগারেট আনতে পাঠায়। পরে সুযোগ পেয়ে তাকে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। শিশুটি অচেতন হয়ে গেলে তাকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাটি গোপন করার চেষ্টা করা হয়।
ফাহিমার বাবা-মায়ের নিশ্চয়ই আফসোস হয়। হয়তো মনে হয়, আল্লাহ, যদি একবার মেয়েটিকে ফেরত পেতাম, তাহলে আর চোখের আড়াল হতে দিতাম না। কিন্তু সময় তো আর ফিরে আসে না।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে অনেক অভিভাবক এখন সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে ভয় পান। বিশেষ করে মেয়ে সন্তানদের ক্ষেত্রে এই ভয় আরও বেশি।
আপনার সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কার সঙ্গে খেলছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, এসব বিষয়ে নজর রাখা জরুরি।
আপনি এমন এক বাস্তবতায় বাস করছেন, যেখানে পরিবার-স্বজন, প্রতিবেশী, বাড়িওয়ালা, কাজের মানুষ, দারোয়ান, শিক্ষক কিংবা দোকানদার, কাউকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই।
কিডন্যাপিং, শত্রুতা আর বিকৃত মানসিকতার শিকার হচ্ছে আমাদের নিষ্পাপ শিশুরা।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, বড় বড় অপরাধের পরও বিচার নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়।
তাই ভয় নিয়ে নয়, সতর্কতা নিয়ে বাঁচতে হবে।
সন্তানের নিরাপত্তার জন্য সচেতন থাকতে হবে। শিশুদের সেফটি স্কিল শেখাতে হবে, গুড টাচ, ব্যাড টাচ সম্পর্কে জানাতে হবে। তাদের এমনভাবে বড় করতে হবে, যেন তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে।
পৃথিবীর যত ভয়ঙ্কর ঘটনাই ঘটুক, আপনার সন্তান যেন সবার আগে আপনাকেই সব বলতে পারে, সেই সম্পর্ক, সেই বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে।
ধরে নিন, আপনার ঘরে থাকা সন্তানটিই ফাহিমা কিংবা লামিসা। তারা এখনও নিরাপদ আছে। তাদের শক্ত করে জড়িয়ে ধরুন। শপথ করুন, অসতর্ক হবেন না, চোখের আড়াল হতে দেবেন না।
লামিসার মতো ফুটফুটে একটি মেয়ে আজ প্রাণ হারিয়েছে। লাশের সারি বাড়ছেই। অসংখ্য ঘটনা আমরা পেরিয়ে এসেছি, তবুও থামাতে পারিনি এই নির্মমতা।
আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায়, সুষ্ঠু বিচার যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে অন্তত এই প্রশ্নের উত্তর দিন— একজন অভিভাবক কতটা ভয় নিয়ে বাঁচবে?



পাঠকের মন্তব্য